ইসলাম অহেতুক ঋণ গ্রহণকে উৎসাহিত করে না। তবে মানুষের জীবনে এমন অনেক পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে, যখন প্রয়োজনের কারণে ঋণ নেওয়া জরুরি হয়ে পড়ে। বৈধ ও প্রয়োজনীয় কাজে ঋণ গ্রহণ ইসলামে জায়েজ। ব্যবসা শুরু করা বা তা চালু রাখা, বাড়ি নির্মাণ, চিকিৎসার ব্যয় বহন, সন্তানের শিক্ষা কিংবা সাময়িক আর্থিক সংকট মোকাবিলার মতো নানা প্রয়োজনে মানুষ ঋণ নিতে পারে। তবে ঋণ গ্রহণের সঙ্গে সঙ্গে তা যথাসময়ে পরিশোধ করার দায়িত্বও তৈরি হয়। ইসলামে ঋণকে শুধু আর্থিক লেনদেন হিসেবে দেখা হয়নি; এর সঙ্গে বান্দার হক, আমানতদারিতা এবং দায়িত্বশীলতার বিষয়ও জড়িত।
পবিত্র কোরআনে ঋণের লেনদেন সঠিকভাবে সংরক্ষণ করার ব্যাপারে বিস্তারিত নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘হে মুমিনগণ, যখন তোমরা নির্দিষ্ট সময়ের জন্য পরস্পর ঋণের লেনদেন করবে, তখন তা লিখে রাখবে। আর তোমাদের মধ্যে একজন লেখক যেন ইনসাফের সঙ্গে লিখে রাখে এবং কোনো লেখক আল্লাহ তাকে যেরূপ শিক্ষা দিয়েছেন, তা লিখতে অস্বীকার করবে না। সুতরাং সে যেন লিখে রাখে এবং যার ওপর পাওনা সে (ঋণ গ্রহীতা) যেন তা লিখিয়ে রাখে।’ (সুরা : বাকারাহ, আয়াত : ২৮২)
ইসলামি বিধানের দৃষ্টিতে এই আয়াত ঋণের লেনদেনে স্বচ্ছতা ও শৃঙ্খলার গুরুত্ব তুলে ধরে। ঋণের পরিমাণ, শর্ত এবং পরিশোধের সময়সীমা স্পষ্টভাবে নির্ধারণ করা হলে পরবর্তী সময়ে ভুল বোঝাবুঝি ও বিরোধের সুযোগ কমে যায়। তাফসিরবিদদের মতে, ধার-কর্জের লেনদেন লিখিতভাবে সংরক্ষণ করা উচিত। এতে কোনো পক্ষের ভুল, অস্বীকৃতি কিংবা মতবিরোধ দেখা দিলে প্রমাণ হিসেবে তা কাজে আসে। একই সঙ্গে ঋণের মেয়াদও নির্দিষ্ট করা গুরুত্বপূর্ণ। অনির্দিষ্ট সময়ের জন্য ঋণের লেনদেন করলে ভবিষ্যতে কলহ-বিবাদের সুযোগ তৈরি হতে পারে।
ঋণ গ্রহণের ক্ষেত্রে একজন মুমিনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব হলো নির্ধারিত সময়ের মধ্যে পাওনা পরিশোধ করা। কারণ ঋণদাতা তার অর্থের ওপর অধিকার রাখেন। ঋণগ্রহীতা সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও যদি ইচ্ছাকৃতভাবে ঋণ পরিশোধে বিলম্ব করেন, তাহলে তিনি অন্যের অধিকারে হস্তক্ষেপ করছেন। এ কারণে রাসুলুল্লাহ (সা.) সামর্থ্যবান ব্যক্তির ঋণ পরিশোধে অযথা বিলম্ব করাকে কঠোরভাবে সতর্ক করেছেন।
রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘ধনী (সামর্থ্যবান) ব্যক্তির (ঋণ পরিশোধে) বিলম্ব করা জুলুম।’ (বুখারি, হাদিস : ২৪০০)
এই হাদিসে মূলত এমন ব্যক্তির ব্যাপারে সতর্ক করা হয়েছে, যিনি ঋণ পরিশোধ করার সামর্থ্য রাখেন, কিন্তু কোনো যৌক্তিক কারণ ছাড়াই তা বিলম্বিত করেন। অর্থাৎ হাতে অর্থ থাকা সত্ত্বেও পাওনাদারকে তার প্রাপ্য অর্থ বুঝিয়ে না দিয়ে সময়ক্ষেপণ করা ইসলামের দৃষ্টিতে গ্রহণযোগ্য আচরণ নয়। কারণ এতে ঋণদাতা তার নিজের সম্পদ ব্যবহারের সুযোগ থেকে বঞ্চিত হন।
ঋণ পরিশোধে বিলম্বের বিষয়টি শুধু অর্থনৈতিক সমস্যা সৃষ্টি করে না, বরং মানুষের পারস্পরিক সম্পর্কেও নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। একজন ব্যক্তি প্রয়োজনের সময় অন্যকে বিশ্বাস করে অর্থ ধার দিলেন। পরে সেই অর্থ ফেরত পাওয়ার কথা থাকলেও ঋণগ্রহীতা যদি বারবার সময়ক্ষেপণ করেন, তাহলে ঋণদাতার মধ্যে ক্ষোভ ও অসন্তোষ তৈরি হতে পারে। এতে আত্মীয়তা, বন্ধুত্ব কিংবা ব্যবসায়িক সম্পর্কেও দূরত্ব তৈরি হওয়ার আশঙ্কা থাকে। তাই ইসলাম ঋণের ক্ষেত্রে শুরু থেকেই পরিষ্কার চুক্তি এবং নির্ধারিত সময় মেনে চলার ওপর গুরুত্ব দিয়েছে।
অন্যদিকে, ঋণগ্রহীতার বাস্তব আর্থিক সংকট থাকলে বিষয়টি ভিন্ন। কেউ যদি সত্যিই ঋণ পরিশোধ করতে অক্ষম হয়ে পড়েন, তাহলে তাকে অবকাশ দেওয়ার ব্যাপারেও ইসলাম উৎসাহ দিয়েছে। পবিত্র কোরআনে আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘আর যদি সে অভাবগ্রস্ত হয়, তবে সচ্ছলতা আসা পর্যন্ত তাকে অবকাশ দেওয়া উচিত।’ (সুরা : বাকারাহ, আয়াত : ২৮০)
এই নির্দেশনা থেকে বোঝা যায়, ইসলামে ঋণদাতার অধিকার যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি প্রকৃত অসচ্ছল ঋণগ্রহীতার প্রতি সহানুভূতিশীল হওয়াকেও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। তাই সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও ইচ্ছাকৃতভাবে বিলম্ব করা এবং সত্যিকারের অসচ্ছলতার কারণে সময় নেওয়া দুটি বিষয়কে একভাবে দেখা যায় না।
ঋণ গ্রহণের আগে একজন মানুষের নিজের আর্থিক সক্ষমতা ও পরিশোধের সম্ভাবনা বিবেচনা করা উচিত। শুধু বর্তমান প্রয়োজন মেটানোর জন্য ঋণ নেওয়া নয়, ভবিষ্যতে কীভাবে সেই ঋণ পরিশোধ করা হবে, সেটিও পরিকল্পনা করা জরুরি। ঋণ নেওয়ার সময় নির্ধারিত সময়সীমা, কিস্তি বা পরিশোধের পদ্ধতি পরিষ্কারভাবে জেনে নেওয়া উচিত। একই সঙ্গে ঋণদাতার সঙ্গে স্বচ্ছ যোগাযোগ বজায় রাখাও গুরুত্বপূর্ণ।
ঋণের লেনদেনে লিখিত চুক্তি রাখার বিষয়টিও অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। অনেক সময় পরিচিত ব্যক্তি, বন্ধু কিংবা আত্মীয়ের কাছ থেকে ঋণ নেওয়ার সময় লিখিত কোনো দলিল রাখা হয় না। পারস্পরিক বিশ্বাসের কারণে বিষয়টি সহজভাবে নেওয়া হলেও পরবর্তীতে ঋণের পরিমাণ, সময়সীমা বা শর্ত নিয়ে মতবিরোধ দেখা দিতে পারে। কোরআনের নির্দেশনা অনুযায়ী, নির্দিষ্ট মেয়াদের ঋণ লিখে রাখা হলে উভয় পক্ষের অধিকার সুরক্ষিত থাকে।
এ ক্ষেত্রে ঋণদাতারও দায়িত্ব রয়েছে। ঋণ দেওয়ার সময় স্পষ্ট শর্ত নির্ধারণ করা এবং পরিশোধের সময়সীমা জানিয়ে দেওয়া উচিত। অন্যদিকে ঋণগ্রহীতার দায়িত্ব হলো সেই চুক্তি ও প্রতিশ্রুতি যথাযথভাবে পালন করা। কোনো কারণে নির্ধারিত সময়ে অর্থ পরিশোধ করা সম্ভব না হলে বিষয়টি গোপন না করে ঋণদাতার সঙ্গে যোগাযোগ করা উচিত। পরিস্থিতি ব্যাখ্যা করে সময় চাওয়া এবং নতুন সময়সীমা নির্ধারণ করা পারস্পরিক সম্পর্ক রক্ষায় সহায়ক হতে পারে।
ইসলামের দৃষ্টিতে মানুষের সম্পদের প্রতি সম্মান প্রদর্শন করা গুরুত্বপূর্ণ নৈতিক দায়িত্ব। কারও কাছ থেকে ঋণ নেওয়া মানে তার অর্থ সাময়িকভাবে নিজের ব্যবহারে নেওয়া। ফলে সেই অর্থ ফেরত দেওয়ার বিষয়টি দায়িত্বের সঙ্গে পালন করতে হয়। ঋণগ্রহীতা যদি শুরু থেকেই ঋণ পরিশোধের ব্যাপারে আন্তরিক থাকেন এবং সামর্থ্য অনুযায়ী পরিকল্পনা করেন, তাহলে অনেক জটিলতা এড়ানো সম্ভব।
বর্তমান সময়ে ব্যক্তিগত প্রয়োজন থেকে শুরু করে ব্যবসা-বাণিজ্য বিভিন্ন ক্ষেত্রে ঋণের ব্যবহার বেড়েছে। ব্যাংক, আর্থিক প্রতিষ্ঠান, আত্মীয়স্বজন কিংবা পরিচিতজনের কাছ থেকে মানুষ বিভিন্ন প্রয়োজনে অর্থ গ্রহণ করে থাকে। এ কারণে ঋণ নেওয়া ও পরিশোধের ক্ষেত্রে ইসলামের নীতিগুলো জানা আরও গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও পাওনা পরিশোধে অযথা বিলম্ব না করার ব্যাপারে মহানবী (সা.) এর সতর্কবার্তা মুসলমানদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা বহন করে।
ঋণ মানুষের সাময়িক প্রয়োজন পূরণ করতে পারে, কিন্তু এর সঙ্গে দায়িত্বও জড়িত। তাই প্রয়োজন ছাড়া ঋণ না নেওয়া, ঋণ নেওয়ার আগে পরিশোধের সক্ষমতা বিবেচনা করা, লেনদেন লিখিতভাবে সংরক্ষণ করা এবং নির্ধারিত সময়ে পাওনা পরিশোধ করা উচিত। আর প্রকৃত অসচ্ছলতার কারণে কেউ ঋণ পরিশোধ করতে না পারলে তাকে মানবিক দৃষ্টিতে সময় দেওয়াও ইসলামের শিক্ষার অংশ।
সুতরাং ঋণ গ্রহণের ক্ষেত্রে যেমন সতর্কতা প্রয়োজন, তেমনি ঋণ পরিশোধের ক্ষেত্রেও দায়িত্বশীলতা জরুরি। সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও অযথা ঋণ পরিশোধে বিলম্ব করা থেকে বিরত থাকা উচিত। মহানবী (সা.) এর সতর্কবাণী মুসলমানদের মনে করিয়ে দেয় অন্যের পাওনা যথাসময়ে আদায় করা শুধু আর্থিক দায়িত্ব নয়, বরং মানুষের অধিকারের প্রতিও সম্মান প্রদর্শনের বিষয়।


মন্তব্য
এখনও কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যটি আপনিই করুন।
একটি মন্তব্য লিখুন