চালের জিলাপী একটি অত্যন্ত সুস্বাদু খাদ্য। সাধারণত শীত মৌসুমই হচ্ছে মজাদার এই চালের জিলাপী তৈরির ভর মৌসুম। একটু একটু শীতের আমেজ শুরু হলেই এ জাতীয় খাদ্য তৈরির ধুম পড়ে যায়।

শীতকালে চালের জিলাপীর প্রধান উপকরণ খামি সহজে নষ্ট হয় না। মোটা চাল মেশিনে গুঁড়া করে পানি ও লবণ দিয়ে মেখে এই খামি তৈরি করা হয়। অপেক্ষাকৃত গরম মৌসুমে জিলাপীর খামি দ্রুত নষ্ট হয়ে যায়। ফলে রুচিবান খাদ্যপিপাসুরা শীতকালেই এ জাতীয় খাবার খেতে বেশি পছন্দ করেন।

সাধারণত জিলাপী ময়দা দিয়ে তৈরি হয়। ময়দা দিয়ে তেলের মধ্যে ভেজে চিনির শিরার মধ্যে রেখে সাধারণ জিলাপী তৈরি করা হয়, যা সারা বছরই বিভিন্ন মিষ্টি উৎপাদনকারী কারখানায় পাওয়া যায়। কিন্তু চালের জিলাপী তৈরির বিষয়টি একটু ব্যতিক্রমী।

চালের খামি মেখে বড় আকারের জিলাপী তেলের মধ্যে ভেজে সামান্য মিষ্টির জন্য গুড়ের শিরার মধ্যে ভিজিয়ে এটি তৈরি করা হয়। তবে কবে থেকে চালের জিলাপী তৈরির কার্যক্রম শুরু হয়েছে, তার সঠিক ইতিহাস অনেকেই জানেন না।

হাটহাজারীর বয়স্কজনদের মতে, উপজেলার ঐতিহ্যবাহী স্বনামধন্য বাজার সরকারহাট থেকেই চালের জিলাপী উৎপাদনের বিষয়টি শুরু হয়েছে বলে অনেকেই মনে করেন।

সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, সরকারহাট বাজারে 'হোসেন ভাইয়ের জিলাপী' নামক এক ভাসমান দোকানদার সকাল থেকে শুরু করে রাত পযর্ন্ত এই জিলাপী তৈরি করছেন। তিনি প্রতি কেজি জিলাপী ১৪০ টাকা দরে বিক্রি করেন। জিলাপী তৈরি করেই তার সংসার খুব ভালোভাবে চলছে বলে জানান তিনি।

এই বাজারে একটি ঐতিহ্যবাহী মিষ্টির দোকান রয়েছে, যা 'ঘোষের দোকান' হিসেবে বেশি পরিচিত। বাজারের পশ্চিমপার্শ্বে ঘোষদের বসতি ছিল এবং তারা বংশানুক্রমে চা ও মিষ্টির দোকান করে পরিবার পরিচালনা করতেন। সেসময় আর্থিক সংকটের কারণে চা-নাস্তার প্রতি মানুষের এত বেশি আগ্রহ ছিল না।

তখন ঘোষের দোকানে চা-নাস্তা প্রত্যাশীদের আকৃষ্ট করতে তারা নিত্যনতুন নাস্তা তৈরি করতেন। সেই ধারাবাহিকতাতেই চালের জিলাপী তৈরির ব্যবস্থা শুরু হয়। কালক্রমে ওই দোকানে চালের জিলাপী তৈরি বন্ধ হয়ে গেলেও পরবর্তীতে তাদের দেখাদেখি বাজারের অনেকেই চালের জিলাপী তৈরি শুরু করেন।

অত্যন্ত সুস্বাদু খাবার হওয়ায় লোকজন শীত মৌসুমে চালের জিলাপীর প্রতি বেশি আকৃষ্ট হয়ে পড়েন। সরকারহাট বাজার থেকে দেখে পার্শ্ববর্তী অনেক হাটবাজার এমনকি উপজেলায়ও অনেকেই চালের জিলাপী তৈরির কার্যক্রম শুরু করেন।

অনেকেই অনেক স্থানে চালের জিলাপী তৈরি করলেও ঐতিহ্যগত কারণে সরকারহাট বাজারের চালের জিলাপীর স্বাদ একেবারেই ভিন্ন। তাই সরকারহাট বাজারের চালের জিলাপীর খ্যাতি এখন পুরো চট্টগ্রাম জেলা জুড়ে ছড়িয়ে পড়েছে। অতুলনীয় স্বাদের কারণে অনেকেই দূরদূরান্ত থেকে শীত মৌসুমে এই চালের জিলাপী ক্রয় করতে আসেন।

অনেকেই আবার তাদের প্রবাসী স্বজন ও আত্মীয়দের বাড়িতে যাওয়ার সময় এই বাজার থেকে জিলাপী কিনে নিয়ে যান। ব্যাপক চাহিদার কারণে বর্তমানে অনেকেই সরকারহাট বাজারে চালের জিলাপী তৈরির ব্যবসা শুরু করেছেন।

এতে করে মানুষের চাহিদা যেমন পূরণ হচ্ছে, তেমনি যারা জিলাপী তৈরি করেন তাদের পরিবারেও সচ্ছলতা ফিরে এসেছে। শীতকালে মুখরোচক এই খাবারটি দিন দিন সবার কাছে আরও বেশি জনপ্রিয় হয়ে উঠছে।