সকালের এক কাপ কফি অনেকের দিনের শুরুটা সহজ করে। কেউ কফি পান করেন ঘুম কাটাতে, কেউ স্বাদ ও অভ্যাসের কারণে। কফিতে থাকা ক্যাফেইন শরীর ও মস্তিষ্কে উদ্দীপক হিসেবে কাজ করে, ফলে সাময়িকভাবে সতর্কতা ও মনোযোগ বাড়তে পারে। তবে কফি শুধু ঘুম তাড়ানোর জন্যই গুরুত্বপূর্ণ কি না, কিংবা দীর্ঘমেয়াদি স্বাস্থ্যের সঙ্গে এর কোনো সম্পর্ক আছে কি না এ নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই গবেষণা চলছে।
সাম্প্রতিক এক গবেষণায় কফি পানের সময় এবং দীর্ঘমেয়াদি মৃত্যুঝুঁকির মধ্যে একটি সম্পর্কের ইঙ্গিত পাওয়া গেছে। এনডিটিভির প্রতিবেদনে উল্লেখ করা গবেষণাটি ২০২৫ সালে ইউরোপিয়ান সোসাইটি অব কার্ডিওলজির একটি প্রকাশনার মাধ্যমে সামনে আসে। এতে যুক্তরাষ্ট্রের ৪০ হাজারের বেশি প্রাপ্তবয়স্কের খাদ্যাভ্যাস ও স্বাস্থ্যসংক্রান্ত তথ্য বিশ্লেষণ করা হয় এবং অংশগ্রহণকারীদের প্রায় ১০ বছর ধরে পর্যবেক্ষণ করা হয়।
গবেষণায় দেখা যায়, অংশগ্রহণকারীদের প্রায় ৫২ শতাংশ নিয়মিত কফি পান করতেন। তাদের মধ্যে প্রায় ৩৬ শতাংশ প্রধানত সকালে কফি পান করতেন এবং প্রায় ১৬ শতাংশ দিনের বিভিন্ন সময়ে কফি পান করতেন। গবেষকদের পর্যবেক্ষণে কফি পানের সময়ের সঙ্গে স্বাস্থ্যের ফলাফলে পার্থক্য দেখা যায়।
যারা ভোর ৪টা থেকে দুপুর ১২টার মধ্যে কফি পান করতেন, তাদের যেকোনো কারণে মৃত্যুর ঝুঁকি কফি না পান করা ব্যক্তিদের তুলনায় প্রায় ১৬ শতাংশ কম দেখা যায়। একইভাবে, সকালে কফি পানকারী এই দলের হৃদ্রোগজনিত মৃত্যুর ঝুঁকি প্রায় ৩১ শতাংশ কম ছিল। অন্যদিকে, যারা দিনের বিভিন্ন সময়ে কফি পান করতেন, তাদের ক্ষেত্রে একই ধরনের সম্পর্ক পাওয়া যায়নি।
গবেষকদের ধারণা, কফি পানের সময় শরীরের দৈনন্দিন জৈবিক ছন্দের সঙ্গে সম্পর্কিত হতে পারে। মানুষের শরীরে হরমোন, ঘুম-জাগরণের চক্র, রক্তচাপ এবং বিপাকীয় কার্যক্রম দিনের বিভিন্ন সময়ে পরিবর্তিত হয়। তাই কফি কখন পান করা হচ্ছে, সেটিও কফির সম্ভাব্য প্রভাবের সঙ্গে সম্পর্কিত হতে পারে।
তবে এটি এখনো একটি গবেষণাভিত্তিক পর্যবেক্ষণ। সকালে কফি পান করার কারণেই মৃত্যুঝুঁকি কমেছে এমন সিদ্ধান্ত গবেষণাটি সরাসরি প্রমাণ করে না। অর্থাৎ গবেষণায় পাওয়া সম্পর্ককে সরাসরি কারণ হিসেবে ধরে নেওয়া যাবে না।
কফির সম্ভাব্য উপকারিতা নিয়ে আলোচনা হলেও অতিরিক্ত ক্যাফেইন গ্রহণের বিষয়টি আলাদা করে বিবেচনা করা প্রয়োজন। একজন মানুষের ক্যাফেইন সহনশীলতা, বয়স, ঘুমের ধরন এবং অন্যান্য স্বাস্থ্যগত বিষয় অনুযায়ী প্রতিক্রিয়া ভিন্ন হতে পারে।
বিশেষ করে দিনের শেষভাগে বেশি কফি পান করলে ঘুমের ওপর প্রভাব পড়তে পারে। পর্যাপ্ত ঘুম দীর্ঘমেয়াদি স্বাস্থ্যের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হওয়ায় কফি পান করার সময় নির্ধারণের ক্ষেত্রে ব্যক্তিগত ঘুমের অভ্যাসও বিবেচনা করা প্রয়োজন।
এখানেই গবেষণাটির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক রয়েছে। গবেষণাটি এমন কোনো প্রমাণ দেয়নি যে শুধু কফি পান করলেই একজন মানুষের স্বাস্থ্য ভালো থাকবে বা আয়ু বাড়বে। বরং নির্দিষ্ট সময়ে কফি পান করা এবং দীর্ঘমেয়াদি স্বাস্থ্যফলের মধ্যে একটি পরিসংখ্যানগত সম্পর্ক দেখা গেছে।
একই সঙ্গে কফি পানকারীদের জীবনযাপন, খাদ্যাভ্যাস, শারীরিক পরিশ্রম, ঘুম, ধূমপানসহ অন্যান্য বিষয়ও স্বাস্থ্যের ওপর প্রভাব ফেলতে পারে। গবেষণায় এসব বিষয় বিবেচনায় নেওয়া হলেও পর্যবেক্ষণভিত্তিক গবেষণায় সব ধরনের প্রভাব পুরোপুরি বাদ দেওয়া কঠিন।
কফিতে ক্যাফেইনের পাশাপাশি বিভিন্ন জৈব সক্রিয় উপাদান ও অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট রয়েছে। এ কারণে হৃদ্রোগ, বিপাকীয় স্বাস্থ্যসহ বিভিন্ন দীর্ঘমেয়াদি স্বাস্থ্যফলের সঙ্গে কফি পানের সম্পর্ক নিয়ে গবেষণা হয়েছে। তবে কোনো একটি গবেষণার ফলাফল দিয়ে কফিকে সবার জন্য স্বাস্থ্যকর বা অস্বাস্থ্যকর হিসেবে চিহ্নিত করা যায় না।
একজন ব্যক্তি কফি পান করবেন কি না, করলে কখন ও কতটা পান করবেন তা নির্ভর করতে পারে তার ব্যক্তিগত অভ্যাস, ঘুমের ধরন এবং সামগ্রিক স্বাস্থ্যের ওপর। বিশেষ কোনো স্বাস্থ্য সমস্যা থাকলে খাদ্যাভ্যাস পরিবর্তনের আগে চিকিৎসক বা যোগ্য স্বাস্থ্যপেশাজীবীর পরামর্শ নেওয়া উপযুক্ত।
সব মিলিয়ে, নতুন গবেষণাটি কফি পানের সময় নিয়ে একটি গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষণ সামনে এনেছে। বিশেষ করে সকালে কফি পানকারীদের মধ্যে মৃত্যুঝুঁকি কম থাকার সম্পর্ক দেখা গেলেও এটিকে কফির নিশ্চিত স্বাস্থ্য উপকারিতা হিসেবে ব্যাখ্যা করার সুযোগ নেই। দীর্ঘমেয়াদি স্বাস্থ্য অনেকগুলো বিষয় খাদ্যাভ্যাস, শারীরিক সক্রিয়তা, ঘুম, মানসিক চাপ এবং অন্যান্য জীবনযাপন এর সম্মিলিত প্রভাবে নির্ধারিত হয়।


মন্তব্য
এখনও কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যটি আপনিই করুন।
একটি মন্তব্য লিখুন