শেষ বিশ্বকাপে লিওনেল মেসির রেকর্ড এখন ফুটবল বিশ্বের অন্যতম আলোচিত বিষয়। যুক্তরাষ্ট্র, মেক্সিকো ও কানাডায় অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া ২০২৬ বিশ্বকাপ শুধু আর্জেন্টিনার শিরোপা রক্ষার লড়াই নয়, বরং লিওনেল মেসির জন্যও হতে পারে ইতিহাস গড়ার শেষ বড় মঞ্চ। আর্জেন্টাইন অধিনায়কের বয়স তখন ৩৯ বছর হবে। তাই অনেকেই মনে করছেন, এটিই হতে পারে তার ক্যারিয়ারের শেষ বিশ্বকাপ। আর সেই আসরেই একাধিক অনন্য রেকর্ড নিজের নামে লেখানোর সুযোগ পাচ্ছেন বিশ্ব ফুটবলের এই মহাতারকা।
২০২২ সালে কাতারে বিশ্বকাপ জয়ের মাধ্যমে নিজের দীর্ঘদিনের স্বপ্ন পূরণ করেছিলেন মেসি। সেই অর্জনের পর আন্তর্জাতিক ফুটবল থেকে বিদায়ের সম্ভাবনা থাকলেও তিনি খেলা চালিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। এখন তার লক্ষ্য হতে পারে আরও কিছু ঐতিহাসিক মাইলফলক স্পর্শ করা, যা তাকে বিশ্বকাপ ইতিহাসের সবচেয়ে সফল খেলোয়াড়দের একজন হিসেবে আরও দৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠিত করবে। বিশ্বকাপের মঞ্চে সবচেয়ে বেশি আসরে অংশগ্রহণের রেকর্ড গড়ার সুযোগ রয়েছে মেসির সামনে। ২০০৬ সালে প্রথম বিশ্বকাপ খেলা শুরু করা এই ফরোয়ার্ড ২০১০, ২০১৪, ২০১৮ ও ২০২২ বিশ্বকাপেও খেলেছেন। ২০২৬ বিশ্বকাপে মাঠে নামতে পারলে তার অংশগ্রহণের সংখ্যা দাঁড়াবে ছয়ে।
এই কীর্তি অর্জন করলে তিনি বিশ্বকাপ ইতিহাসে সর্বোচ্চ সংখ্যক আসরে অংশ নেওয়া খেলোয়াড়দের তালিকায় শীর্ষস্থান ভাগাভাগি করবেন। পর্তুগালের ক্রিস্তিয়ানো রোনালদো এবং মেক্সিকোর গিয়ের্মো ওচোয়ারও ছয়টি বিশ্বকাপে অংশ নেওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। তবে ওচোয়া তার প্রথম দুটি বিশ্বকাপে মাঠে নামতে পারেননি, যা মেসির অর্জনকে আরও বিশেষ করে তুলবে। শেষ বিশ্বকাপে লিওনেল মেসির রেকর্ড আলোচনায় সবচেয়ে বেশি জায়গা পাচ্ছে সর্বকালের সর্বোচ্চ গোলদাতা হওয়ার সম্ভাবনা। বর্তমানে বিশ্বকাপ ইতিহাসে সর্বোচ্চ গোলদাতা জার্মানির মিরোস্লাভ ক্লোসা, যার গোল সংখ্যা ১৬। দ্বিতীয় স্থানে থাকা ব্রাজিলের রোনালদোর গোল ১৫টি এবং তৃতীয় স্থানে থাকা গার্ড মুলারের গোল ১৪টি।
মেসি বর্তমানে ১৩ গোল নিয়ে চতুর্থ স্থানে অবস্থান করছেন। ২০২৬ বিশ্বকাপে চারটি গোল করতে পারলে তিনি এককভাবে ক্লোসাকে ছাড়িয়ে নতুন ইতিহাস গড়তে পারবেন। আর্জেন্টিনার হয়ে তার বিশ্বকাপ গোলগুলো এসেছে চারটি ভিন্ন আসরে, যা তার ধারাবাহিকতারও প্রমাণ বহন করে। তবে এই দৌড়ে মেসির একমাত্র প্রতিদ্বন্দ্বী হতে পারেন ফ্রান্সের কিলিয়ান এমবাপ্পে। তারও বিশ্বকাপ গোল সংখ্যা ১৩। বয়স কম হওয়ায় ভবিষ্যতে এই রেকর্ড নিজের করে নেওয়ার সুযোগ এমবাপ্পের সামনে আরও বেশি। ফলে বিশ্বকাপের সর্বোচ্চ গোলদাতার লড়াইটি হতে পারে অত্যন্ত আকর্ষণীয়।
গোলের পাশাপাশি অ্যাসিস্টের রেকর্ডেও নজর থাকবে মেসির। বিশ্বকাপে এখন পর্যন্ত তিনি আটটি অ্যাসিস্ট করেছেন। এই তালিকার শীর্ষে রয়েছেন ব্রাজিলের কিংবদন্তি পেলে, যার অ্যাসিস্ট সংখ্যা ১০। আগামী বিশ্বকাপে তিনটি অ্যাসিস্ট করতে পারলেই মেসি বিশ্বকাপ ইতিহাসের সর্বোচ্চ অ্যাসিস্টদাতা হিসেবে নিজের নাম লেখাতে পারবেন। একজন গোলদাতা এবং সৃষ্টিশীল খেলোয়াড় হিসেবে একই সঙ্গে শীর্ষে ওঠার সুযোগ তার সামনে রয়েছে, যা বিশ্ব ফুটবলে বিরল অর্জন হিসেবে বিবেচিত হবে।
বিশ্বকাপ ফাইনাল খেলার সংখ্যাতেও নতুন রেকর্ডের হাতছানি রয়েছে। মেসি ইতোমধ্যে ২০১৪ ও ২০২২ সালে দুটি বিশ্বকাপ ফাইনাল খেলেছেন। ২০২৬ সালে আর্জেন্টিনা আবারও ফাইনালে উঠতে পারলে তিনি তৃতীয়বারের মতো বিশ্বকাপ ফাইনাল খেলবেন। এতে তিনি ব্রাজিলের পেলে, কাফু ও রোনালদো, জার্মানির লোথার ম্যাথিউস এবং পিয়েরে লিটবার্সকির মতো কিংবদন্তিদের পাশে জায়গা করে নেবেন। বিশ্বকাপ ফাইনালে বারবার উপস্থিত হওয়া একজন খেলোয়াড়ের ধারাবাহিকতা ও সাফল্যের বড় প্রমাণ হিসেবে বিবেচিত হয়।
বিশ্বকাপে সবচেয়ে বেশি ম্যাচ খেলার রেকর্ড ইতোমধ্যেই মেসির দখলে রয়েছে। এখন পর্যন্ত তিনি ২৬টি ম্যাচ খেলেছেন। তার পেছনে রয়েছেন লোথার ম্যাথিউস, যার ম্যাচ সংখ্যা ২৫। নতুন বিশ্বকাপ কাঠামো অনুযায়ী একটি দল সর্বোচ্চ আটটি ম্যাচ খেলতে পারবে। আর্জেন্টিনা যদি শেষ পর্যন্ত যেতে পারে, তাহলে মেসি নিজের ম্যাচ খেলার রেকর্ড আরও অনেক দূর এগিয়ে নিয়ে যেতে পারবেন। এই রেকর্ড ভবিষ্যতে অন্য কারও জন্য ভাঙা কঠিন হয়ে উঠতে পারে।
মাঠে কাটানো সময়ের দিক থেকেও সবার ওপরে রয়েছেন আর্জেন্টাইন অধিনায়ক। বিশ্বকাপে এখন পর্যন্ত তার খেলার সময় ২ হাজার ৩০০ মিনিটের বেশি। এটি বিশ্বকাপ ইতিহাসের সর্বোচ্চ সময় মাঠে থাকার রেকর্ড। ২০২৬ বিশ্বকাপে অংশ নিলেই এই পরিসংখ্যান আরও সমৃদ্ধ হবে। দীর্ঘ সময় ধরে সর্বোচ্চ পর্যায়ে পারফর্ম করার সামর্থ্যই মেসিকে অন্যদের থেকে আলাদা করেছে। তার অভিজ্ঞতা, নেতৃত্ব এবং ম্যাচে প্রভাব বিস্তারের ক্ষমতা এখনও আর্জেন্টিনার সবচেয়ে বড় শক্তি।
সব মিলিয়ে ২০২৬ বিশ্বকাপ শুধু একটি ফুটবল প্রতিযোগিতা নয়, বরং লিওনেল মেসির জন্য হতে পারে ইতিহাসের পাতায় নিজের নাম আরও উজ্জ্বল করে লেখার শেষ সুযোগ। যদি এটি সত্যিই তার শেষ বিশ্বকাপ হয়, তাহলে বিশ্বজুড়ে কোটি কোটি সমর্থকের চোখ থাকবে তার প্রতিটি ম্যাচ, প্রতিটি গোল এবং প্রতিটি রেকর্ডের দিকে। আর সেই যাত্রা সফল হলে বিশ্বকাপ ইতিহাসে মেসির অবস্থান আরও অনন্য উচ্চতায় পৌঁছে যাবে।


মন্তব্য
এখনও কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যটি আপনিই করুন।
একটি মন্তব্য লিখুন