নরসিংদীর পলাশ উপজেলায় পায়ুপথে বাতাস দেওয়ার অভিযোগে রামিন নামে আট বছর বয়সী এক বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিশুর মৃত্যুর ঘটনায় হত্যা মামলা দায়ের করা হয়েছে। ঘটনাটি প্রকাশ্যে আসার পর এলাকায় তীব্র ক্ষোভ ও উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়েছে। স্থানীয় বাসিন্দারা অভিযুক্তদের দ্রুত গ্রেপ্তার ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছেন। বৃহস্পতিবার নিহত শিশুর বাবা রিপন মিয়া বাদী হয়ে পলাশ থানায় মামলাটি দায়ের করেন। মামলায় চারজনকে আসামি করা হয়েছে। তাদের বিরুদ্ধে শিশুটির পায়ুপথ ও মুখে যন্ত্রের সাহায্যে বাতাস দেওয়ার অভিযোগ আনা হয়েছে। এ ঘটনায় পুরো এলাকায় শোকের ছায়া নেমে এসেছে।

মামলার প্রধান আসামি করা হয়েছে গজারিয়া গ্রামের লোকমান মিয়ার ছেলে সবুজকে। এছাড়া গ্যারেজ মালিক শফিকুল মিয়ার ছেলে ফয়সাল, বাছেদ মিয়ার ছেলে বাবু এবং শিশির মিয়াকেও আসামি করা হয়েছে। পুলিশ জানিয়েছে, অভিযোগের ভিত্তিতে তদন্ত শুরু হয়েছে এবং অভিযুক্তদের ধরতে অভিযান চলছে। ময়নাতদন্ত শেষে রামিনের মরদেহ বাড়িতে আনা হলে এলাকায় শোকের পাশাপাশি ক্ষোভও ছড়িয়ে পড়ে। স্থানীয় শত শত মানুষ জড়ো হয়ে প্রতিবাদ মিছিল করেন। এ সময় তারা দ্রুত বিচার ও জড়িতদের কঠোর শাস্তির দাবি জানান। অনেকেই এ ঘটনাকে অমানবিক ও নৃশংস বলে অভিহিত করেছেন।

স্থানীয়রা জানান, রামিন ছিল বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিশু। তবে সে অত্যন্ত শান্ত ও ভদ্র স্বভাবের ছিল। নিয়মিত স্কুলে যেত এবং ধর্মীয় অনুশাসন মেনে চলত। তার এমন মর্মান্তিক মৃত্যু কেউ মেনে নিতে পারছেন না। স্থানীয় সাবেক ইউনিয়ন পরিষদ সদস্য আবুল কাশেম বলেন, রামিন এলাকার সবার পরিচিত একটি শিশু ছিল। বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন হলেও সে খুব নিরীহ ও শান্ত প্রকৃতির ছিল। এমন একটি শিশুর মৃত্যু এলাকাবাসীকে নাড়া দিয়েছে বলে জানান তিনি। তিনি আরও বলেন, একটি অসহায় শিশুর সঙ্গে এমন আচরণ কোনোভাবেই মানবিক হতে পারে না। তিনি দ্রুত তদন্ত শেষ করে জড়িতদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানান। একই সঙ্গে ভবিষ্যতে এ ধরনের ঘটনা ঠেকাতে প্রশাসনের আরও কঠোর ভূমিকা কামনা করেন।

স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, ঘটনার পর থেকেই এলাকায় উত্তেজনা বিরাজ করছে। অভিযুক্তদের গ্রেপ্তার না হওয়ায় অনেকের মধ্যে ক্ষোভ বাড়ছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও ঘটনাটি নিয়ে ব্যাপক আলোচনা ও নিন্দা চলছে। বিকেল সাড়ে ৫টার দিকে স্থানীয় গজারিয়া মদিনাতুল উলুম দাখিল মাদ্রাসা মাঠে রামিনের জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। জানাজায় বিপুলসংখ্যক মানুষ অংশ নেন। পরে পারিবারিক কবরস্থানে তাকে দাফন করা হয়। জানাজায় অংশ নেওয়া অনেকেই কান্নায় ভেঙে পড়েন। নিহত শিশুর পরিবার জানিয়েছে, তারা এই ঘটনার সুষ্ঠু বিচার চান। রামিনের বাবা রিপন মিয়া বলেন, তার সন্তান কারও কোনো ক্ষতি করেনি। অথচ তাকে নির্মমভাবে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দেওয়া হয়েছে। তিনি জড়িতদের সর্বোচ্চ শাস্তির দাবি জানান।

স্থানীয়দের অভিযোগ, অভিযুক্তরা প্রভাবশালী হওয়ায় এখনো কাউকে আটক করা সম্ভব হয়নি। তবে পুলিশ জানিয়েছে, আসামিদের গ্রেপ্তারে অভিযান অব্যাহত রয়েছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ঘটনাটিকে গুরুত্ব দিয়ে দেখছে বলেও দাবি করা হয়েছে। পলাশ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা শাহেদ আল মামুন বলেন, ঘটনার খবর পাওয়ার পরপরই পুলিশ ঘটনাস্থলে যায়। পরিবারের অভিযোগের ভিত্তিতে চারজনের নাম উল্লেখ করে মামলা নেওয়া হয়েছে। তদন্তের স্বার্থে বিভিন্ন তথ্য সংগ্রহ করা হচ্ছে বলেও জানান তিনি। তিনি আরও বলেন, এখন পর্যন্ত কাউকে আটক করা সম্ভব হয়নি। তবে আসামিদের ধরতে একাধিক দলে অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে। পুলিশ আশা করছে, দ্রুত সময়ের মধ্যেই অভিযুক্তদের আইনের আওতায় আনা সম্ভব হবে।

শিশু অধিকারকর্মীরা বলছেন, বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিশুদের নিরাপত্তা ও সুরক্ষা নিশ্চিত করতে পরিবার ও সমাজকে আরও সচেতন হতে হবে। একই সঙ্গে এ ধরনের ঘটনায় দ্রুত বিচার নিশ্চিত করা না গেলে সমাজে ভয়াবহ নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে বলেও মনে করছেন তারা। মানবাধিকারকর্মীদের মতে, শিশুদের প্রতি সহিংসতা ও নির্যাতনের ঘটনা উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে। বিশেষ করে অসহায় ও প্রতিবন্ধী শিশুরা বেশি ঝুঁকির মধ্যে থাকে। এজন্য সামাজিক সচেতনতা বাড়ানোর পাশাপাশি আইন প্রয়োগেও কঠোরতা প্রয়োজন বলে মত দিয়েছেন তারা।

রামিনের মৃত্যুর ঘটনায় পুরো পলাশ উপজেলায় শোকের আবহ বিরাজ করছে। স্থানীয়রা বলছেন, এ ঘটনার সঠিক বিচার না হলে মানুষের আস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হবে। তারা দ্রুত অভিযুক্তদের গ্রেপ্তার করে আদালতের মাধ্যমে সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন।