১ কোটি টাকার ওষুধে ৪ কোটি টাকার বিল—এমন গুরুতর অভিযোগকে কেন্দ্র করে চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে বান্দরবানে। অভিযোগ উঠেছে, বান্দরবানের সিভিল সার্জন ডা. মোহাম্মদ শাহীন হোসাইন চৌধুরী মাত্র এক কোটি টাকার ওষুধ ক্রয় করেও পার্বত্য জেলা পরিষদ থেকে চার কোটি টাকার বিল উত্তোলন করেছেন।
অভিযোগ অনুযায়ী, অর্থবছরের শেষ সময় বা জুন ক্লোজিংয়ের আগে দ্রুততার সঙ্গে এই বিপুল অঙ্কের বিল উত্তোলন করা হয়। বিষয়টি প্রকাশ্যে আসার পর স্বাস্থ্যখাতে ব্যাপক আলোচনা শুরু হয় এবং প্রশাসনের দৃষ্টি আকর্ষণ করে।
অভিযোগের সূত্রপাত:
স্থানীয় সূত্র ও সংশ্লিষ্টদের দাবি, বান্দরবান সদর হাসপাতালের জন্য যে পরিমাণ ওষুধ কেনা হয়েছে, তার প্রকৃত মূল্য প্রায় এক কোটি টাকা। কিন্তু সেই ক্রয়ের বিপরীতে চার কোটি টাকার বিল অনুমোদন ও উত্তোলন করা হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
সরকারি অর্থ ব্যবহারে এমন বড় ধরনের অসঙ্গতির অভিযোগ ওঠায় বিষয়টি দ্রুত পার্বত্য চট্টগ্রামবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের নজরে আসে।
তদন্তে নামল পার্বত্য মন্ত্রণালয়:
অভিযোগের গুরুত্ব বিবেচনায় পার্বত্য চট্টগ্রামবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের নির্দেশে পাঁচ সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে।
বুধবার (১ জুলাই) সকাল ১১টার দিকে তদন্ত কমিটির সদস্যরা বান্দরবান সদর হাসপাতালে গিয়ে সরেজমিন তদন্ত করেন। হাসপাতালের বিভিন্ন বিভাগ পরিদর্শনের পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট নথিপত্রও যাচাই-বাছাই করা হয়।
তদন্ত কমিটিতে কারা আছেন:
গঠিত তদন্ত কমিটির সদস্যরা হলেন—
- পার্বত্য জেলা পরিষদের মুখ্য নির্বাহী কর্মকর্তা মোহাম্মদ নজরুল ইসলাম
- জেলা পরিবার পরিকল্পনা বিভাগের উপপরিচালক ডা. লেনিন তালুকদার
- পার্বত্য জেলা পরিষদের পিএস টু চেয়ারম্যান আবুল মনসুর
- নির্বাহী প্রকৌশলী পরাক্রম চাকমা
- হিসাব ও নিরীক্ষণ কর্মকর্তা এম. মুহিব্বুল হাসান
কমিটির সদস্যরা অভিযোগের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য হাসপাতালের ক্রয়সংক্রান্ত নথি, বিল-ভাউচার, সরবরাহকৃত ওষুধের তালিকা এবং অর্থ ছাড়ের প্রক্রিয়া পর্যালোচনা করছেন।
কী বললেন তদন্ত কমিটির প্রধান:
পার্বত্য জেলা পরিষদের মুখ্য নির্বাহী কর্মকর্তা মোহাম্মদ নজরুল ইসলাম সাংবাদিকদের বলেন,
“বান্দরবান সদর হাসপাতালের জন্য এক কোটি টাকার ওষুধ কিনে চার কোটি টাকা উত্তোলনের অভিযোগ উঠেছে। বিষয়টি তদন্তের জন্য পার্বত্য মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী মীর মোহাম্মদ হেলাল উদ্দিন নির্দেশ দিয়েছেন। অভিযোগের সত্যতা যাচাই করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশও দেওয়া হয়েছে।”
তিনি আরও জানান, পার্বত্য জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান তদন্তের দায়িত্ব তাদের ওপর অর্পণ করেছেন এবং দ্রুত তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেওয়া হবে।
কী কী বিষয় খতিয়ে দেখা হচ্ছে:
তদন্ত কমিটি কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় যাচাই করছে। এর মধ্যে রয়েছে—
- প্রকৃত কত টাকার ওষুধ ক্রয় করা হয়েছে।
- ক্রয় প্রক্রিয়া সরকারি বিধিমালা অনুযায়ী হয়েছে কি না।
- চার কোটি টাকার বিল কীভাবে প্রস্তুত ও অনুমোদন হয়েছে।
- বিল উত্তোলনের সময় কোনো অনিয়ম বা জালিয়াতি হয়েছে কি না।
- সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের ভূমিকা কী ছিল।
জুন ক্লোজিংকে ঘিরে প্রশ্ন:
অভিযোগের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, অর্থবছরের শেষ সময়ে অর্থাৎ জুন ক্লোজিংয়ের আগে দ্রুততার সঙ্গে বিল উত্তোলন করা হয়েছে।
প্রশাসনিক বিশেষজ্ঞদের মতে, অর্থবছরের শেষ দিকে অনেক সরকারি দপ্তরে দ্রুত বাজেট ব্যয়ের প্রবণতা দেখা যায়। তবে সেই সুযোগে যদি প্রকৃত ব্যয়ের তুলনায় অতিরিক্ত বিল উত্তোলন করা হয়ে থাকে, তাহলে তা সরকারি অর্থ আত্মসাতের গুরুতর অভিযোগ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।
স্বাস্থ্যখাতে স্বচ্ছতা নিয়ে নতুন প্রশ্ন:
ঘটনাটি স্থানীয়ভাবে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে। স্বাস্থ্যসেবার জন্য বরাদ্দ সরকারি অর্থ যথাযথভাবে ব্যয় হচ্ছে কি না, সে প্রশ্নও সামনে এসেছে।
সুশাসন নিয়ে কাজ করা বিভিন্ন মহলের মতে, তদন্ত নিরপেক্ষভাবে সম্পন্ন হলে প্রকৃত তথ্য সামনে আসবে এবং দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব হবে।
তদন্ত কমিটি তথ্য-প্রমাণ সংগ্রহের কাজ শুরু করেছে। তদন্ত শেষে প্রতিবেদন পার্বত্য জেলা পরিষদ ও পার্বত্য চট্টগ্রামবিষয়ক মন্ত্রণালয়ে জমা দেওয়া হবে।
যদি অভিযোগের সত্যতা প্রমাণিত হয়, তাহলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা, প্রশাসনিক শাস্তি কিংবা দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) তদন্তসহ আইনি পদক্ষেপ নেওয়া হতে পারে।
১ কোটি টাকার ওষুধে ৪ কোটি টাকার বিল উত্তোলনের অভিযোগ সরকারি অর্থ ব্যবস্থাপনা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে। তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত অভিযোগের সত্যতা নিশ্চিতভাবে বলা না গেলেও বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে দেখছে সরকার। এখন সবার নজর তদন্ত প্রতিবেদনের দিকে, কারণ সেটিই নির্ধারণ করবে অভিযোগের বাস্তবতা এবং পরবর্তী প্রশাসনিক ও আইনি পদক্ষেপ।




























