রুই পিন্তো নামটি ফুটবলপ্রেমীদের কাছে হয়তো খুব পরিচিত নয়, কিন্তু তাঁর ফাঁস করা নথি ইউরোপীয় ফুটবলের অন্যতম শক্তিশালী ক্লাব ম্যানচেস্টার সিটিকে বড় আইনি ঝামেলায় ফেলেছে। ফুটবল মাঠের কোনো ঘটনা দিয়ে নয়, একটি হার্ডডিস্কে লুকিয়ে থাকা গোপন নথি থেকেই শুরু হয়েছিল এই গল্প। সেই নথিগুলো সামনে এনে ফুটবলের আর্থিক কর্মকাণ্ড নিয়ে তোলপাড় সৃষ্টি করেন পর্তুগিজ হ্যাকার, অ্যাকটিভিস্ট ও হুইসেলব্লোয়ার রুই পিন্তো। এখন নিজের জীবন নিয়েই শঙ্কায় আছেন তিনি।

২০১৫ সালে ‘ফুটবল লিকস’ ওয়েবসাইটের মাধ্যমে বিভিন্ন ক্লাব, খেলোয়াড় ও এজেন্টের গোপন ই-মেইল এবং নথি প্রকাশ করতে শুরু করেন পিন্তো। ফুটবলের ভেতরের আর্থিক লেনদেন, করসংক্রান্ত তথ্য ও নানা গোপন নথি প্রকাশের পর দ্রুতই আলোচনায় চলে আসেন তিনি। তবে তথ্য চুরি, হ্যাকিং ও চাঁদা দাবির অভিযোগও ওঠে তাঁর বিরুদ্ধে। ২০১৯ সালের জানুয়ারিতে হাঙ্গেরির বুদাপেস্ট থেকে গ্রেপ্তার হওয়ার পর তাঁকে পর্তুগালে ফেরত পাঠানো হয়। এরপর তাঁর বিরুদ্ধে একাধিক মামলা হয়।

পর্তুগিজ কর্তৃপক্ষের তদন্তে সহযোগিতা এবং বিপুলসংখ্যক নথিতে প্রবেশাধিকার দেওয়ার বিনিময়ে ২০২০ সালের আগস্ট থেকে সাক্ষী সুরক্ষা কর্মসূচির আওতায় ছিলেন পিন্তো। এত দিন রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তার মধ্যেই ছিলেন তিনি। কিন্তু সম্প্রতি পর্তুগিজ পুলিশ জানিয়েছে, তাঁর জীবনের ঝুঁকি আগের তুলনায় কম। এই কারণ দেখিয়ে ১০ অক্টোবর থেকে তাঁর রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা তুলে নেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছে। পিন্তো ও তাঁর আইনজীবীদের দাবি, বাস্তব পরিস্থিতি এর পুরোপুরি বিপরীত। তাঁদের ভাষ্য, তিনি এখনো নিয়মিত মৃত্যুর হুমকি পাচ্ছেন।

নিরাপত্তা হারানোর আশঙ্কায় নতুন করে নিজের ভবিষ্যৎ নিয়েও ভাবতে হচ্ছে পিন্তোকে। গত শুক্রবার থেকে তাঁর জন্য ক্রাউডফান্ডিং ক্যাম্পেইন শুরু হয়েছে। সেখানে নতুন জীবন শুরু করার জন্য অর্থ সংগ্রহ করা হচ্ছে। এরই মধ্যে ১৯ হাজার ইউরোর বেশি অর্থ জমা পড়েছে বলে জানা গেছে। একই সঙ্গে যুক্তরাজ্যের কর্তৃপক্ষের সঙ্গেও যোগাযোগের চেষ্টা করছেন পিন্তো। ম্যানচেস্টার সিটিকে ঘিরে চলমান আইনি প্রক্রিয়ায় আরও গোপন নথি দিয়ে সহযোগিতা করার বিনিময়ে তিনি যুক্তরাজ্যে নিরাপত্তা বা রাজনৈতিক আশ্রয় পাওয়ার সম্ভাবনা খুঁজছেন।

ম্যানচেস্টার সিটির বিরুদ্ধে প্রিমিয়ার লিগের দীর্ঘ তদন্তেও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছিল পিন্তোর ফাঁস করা নথি। সম্প্রতি মামলাটির রায়ও এসেছে। একটি স্বাধীন কমিশন সিটির বিরুদ্ধে আনা ১০০টির বেশি অভিযোগের মধ্যে বিভিন্ন অভিযোগে ক্লাবটিকে দোষী সাব্যস্ত করেছে। তদন্তে ‘ভুয়া’ চুক্তির মাধ্যমে প্রায় ৯০ কোটি পাউন্ড আয় কৃত্রিমভাবে বাড়ানোর তথ্যও উঠে এসেছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে ম্যানচেস্টার সিটি এসব সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে আপিল করেছে। মামলার নথিপত্র সম্পর্কে পিন্তোর জানাশোনা থাকায় তাঁর কাছ থেকে আরও তথ্য পাওয়ার সম্ভাবনাও রয়েছে।

পিন্তোর কাছে থাকা তথ্যের ব্যবহার শুধু ম্যানচেস্টার সিটি ইস্যুতেই সীমাবদ্ধ নাও থাকতে পারে। ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম গার্ডিয়ানের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ‘ফুটবল লিকস’ ও ‘লুয়ান্ডা লিকস’-এর মাধ্যমে সংগ্রহ করা বিপুল নথি বিভিন্ন দেশের তদন্ত সংস্থার মধ্যে ভাগাভাগি করা সম্ভব। এর আগে ফ্রান্স, জার্মানি ও বেলজিয়ামের কর্তৃপক্ষের সঙ্গেও কাজ করেছেন পিন্তো। এবার সেই তালিকায় যুক্তরাজ্যের নাম যুক্ত হতে পারে। তবে তার আগে পর্তুগালে তাঁর রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা প্রত্যাহারের সিদ্ধান্ত নিয়ে আইনি লড়াই চলছে। তাঁর আইনজীবীরা সিদ্ধান্তটির বিরুদ্ধে আপিল করে ঝুঁকি মূল্যায়নের প্রক্রিয়া জানতে চেয়েছেন। পিন্তো নিজেও পর্তুগাল ছেড়ে অজ্ঞাত কোনো নিরাপদ স্থানে যেতে চান। এখন প্রশ্ন, ফুটবলের গোপন নথি ফাঁস করে যে ব্যক্তি ইউরোপীয় ফুটবলকে নাড়িয়ে দিয়েছিলেন, তাঁর নিজের নিরাপত্তার ভবিষ্যৎ শেষ পর্যন্ত কোথায় গিয়ে দাঁড়ায়।