নারায়ণগঞ্জে আগুনে মৃত্যু ঘটনায় নেমে এসেছে গভীর শোক। মদনপুর এলাকার একটি বাসায় ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে দগ্ধ হওয়া একই পরিবারের চার সদস্য শেষ পর্যন্ত মৃত্যুর কাছে হার মানলেন। কয়েক দিনের ব্যবধানে পরিবারের প্রায় সবাইকে হারিয়ে স্বজনরা এখন শোকে স্তব্ধ। হৃদয়বিদারক এই ঘটনা শুধু নারায়ণগঞ্জেই নয়, দেশজুড়ে আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
গত ১১ জুন ভোররাতে নারায়ণগঞ্জের মদনপুর এলাকায় একটি আবাসিক ভবনের একটি কক্ষে আগুন লাগে। মুহূর্তের মধ্যেই আগুন ছড়িয়ে পড়ে ঘরের বিভিন্ন অংশে। ঘুমন্ত অবস্থায় থাকা পরিবারের সদস্যরা আগুনে আটকা পড়ে দগ্ধ হন। স্থানীয় বাসিন্দারা দ্রুত উদ্ধারকাজে এগিয়ে এলেও আগুনের তীব্রতায় কয়েকজন গুরুতর আহত হন।
অগ্নিকাণ্ডের পরপরই দগ্ধদের উদ্ধার করে জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটে ভর্তি করা হয়। সেখানে চিকিৎসকরা তাদের জীবন বাঁচাতে সর্বোচ্চ চেষ্টা চালান। তবে শরীরের বড় অংশ পুড়ে যাওয়ায় তাদের অবস্থা শুরু থেকেই সংকটাপন্ন ছিল।
দগ্ধদের মধ্যে ছিলেন পরিবারের কর্তা আলী আহমেদ মান্নান (৫০), তার স্ত্রী সুলতানা (৩৫), ছেলে মো. সায়েম (১৯) এবং মেয়ে মিম (১৩)। এছাড়া হযরত আলী নামে আরও এক শিশু দগ্ধ হলেও তাকে প্রাথমিক চিকিৎসা দিয়ে হাসপাতাল থেকে ছেড়ে দেওয়া হয়। চিকিৎসকদের নিবিড় পর্যবেক্ষণে থাকা চারজনের অবস্থাই ছিল আশঙ্কাজনক।
ঘটনার একদিন পর, ১২ জুন চিকিৎসাধীন অবস্থায় প্রথমে মারা যান সুলতানা। তার শরীরের প্রায় ৯০ শতাংশ দগ্ধ হয়েছিল বলে হাসপাতাল সূত্রে জানা যায়। চিকিৎসকরা জানান, এত বেশি পরিমাণে দগ্ধ রোগীর বেঁচে থাকার সম্ভাবনা খুবই কম থাকে। মৃত্যুর আগে কয়েক ঘণ্টা তাকে নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে রাখা হয়েছিল।
সুলতানার মৃত্যুর শোক কাটিয়ে ওঠার আগেই পরিবারটির ওপর নেমে আসে আরও বড় ট্র্যাজেডি। সোমবার ভোরে মারা যান আলী আহমেদ মান্নান। এরপর সকাল পৌনে ১০টার দিকে মৃত্যুবরণ করেন তার ছেলে সায়েম। একই দিন রাত পৌনে ১১টার দিকে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করে পরিবারের কনিষ্ঠ সদস্য মিম। একদিনে তিনজনের মৃত্যু স্বজনদের কান্নায় ভাসিয়ে দেয়।
হাসপাতাল সূত্র জানায়, আলী আহমেদ মান্নানের শরীরের ৩৫ শতাংশ, সায়েমের ৭৭ শতাংশ এবং মিমের ৪১ শতাংশ অংশ দগ্ধ হয়েছিল। দগ্ধের মাত্রা এবং শ্বাসনালিতে আগুনের প্রভাব তাদের অবস্থাকে আরও জটিল করে তোলে। চিকিৎসকরা সর্বাধুনিক চিকিৎসা প্রদান করলেও শেষ পর্যন্ত কাউকেই বাঁচানো সম্ভব হয়নি।
জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটের আবাসিক সার্জন শাওন বিন রহমান জানান, আগুনে দগ্ধ হয়ে ভর্তি হওয়া চারজনের অবস্থা শুরু থেকেই অত্যন্ত সংকটাপন্ন ছিল। নিবিড় পরিচর্যা ও উন্নত চিকিৎসা সত্ত্বেও তাদের শারীরিক অবস্থার অবনতি ঘটতে থাকে। পরবর্তীতে একে একে সবাই মৃত্যুবরণ করেন।
নিহতদের গ্রামের বাড়ি নেত্রকোনার পূর্বধলা উপজেলায়। পরিবারের চার সদস্যের মৃত্যুর খবর সেখানে পৌঁছালে পুরো এলাকায় শোকের ছায়া নেমে আসে। প্রতিবেশী, আত্মীয়-স্বজন এবং স্থানীয় বাসিন্দারা এই ঘটনাকে অত্যন্ত মর্মান্তিক বলে উল্লেখ করেছেন। অনেকেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শোক প্রকাশ করেছেন এবং পরিবারের জন্য দোয়া চেয়েছেন।
স্থানীয়দের ভাষ্যমতে, পরিবারটি অত্যন্ত শান্ত ও ভদ্র স্বভাবের ছিল। তাদের সঙ্গে এলাকার মানুষের সুসম্পর্ক ছিল। একসঙ্গে পরিবারের চার সদস্যের মৃত্যু মেনে নিতে পারছেন না কেউই। বিশেষ করে অল্প বয়সী মিম ও তরুণ সায়েমের মৃত্যু সবাইকে ব্যথিত করেছে।
এদিকে অগ্নিকাণ্ডের প্রকৃত কারণ এখনো নিশ্চিত হওয়া যায়নি। প্রাথমিকভাবে বৈদ্যুতিক শর্টসার্কিট অথবা গ্যাস-সংক্রান্ত কোনো দুর্ঘটনা থেকে আগুনের সূত্রপাত হয়ে থাকতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। তবে তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত কোনো নির্দিষ্ট কারণ নিশ্চিত করে বলতে রাজি নয় সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ।
ফায়ার সার্ভিস ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছেন। আগুন লাগার কারণ, ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ এবং নিরাপত্তা ব্যবস্থার কোনো ত্রুটি ছিল কি না তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। তদন্ত প্রতিবেদন প্রকাশের পর অগ্নিকাণ্ডের প্রকৃত কারণ জানা যাবে বলে আশা করা হচ্ছে।
নারায়ণগঞ্জে আগুনে মৃত্যু ঘটনাটি আবারও আবাসিক ভবনে অগ্নিনিরাপত্তার গুরুত্ব সামনে নিয়ে এসেছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ঘরে বৈদ্যুতিক সংযোগ নিয়মিত পরীক্ষা করা, গ্যাস লাইনের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং জরুরি পরিস্থিতিতে দ্রুত বের হওয়ার ব্যবস্থা রাখা অত্যন্ত জরুরি। সামান্য অসতর্কতাও কখনো কখনো ভয়াবহ বিপর্যয়ের কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে।
একটি পরিবারের চার সদস্যের এমন করুণ মৃত্যু শুধু তাদের স্বজনদের নয়, পুরো সমাজকেই নাড়া দিয়েছে। মদনপুরের এই মর্মান্তিক অগ্নিকাণ্ড দীর্ঘদিন মানুষের মনে বেদনার স্মৃতি হয়ে থাকবে।



























