নরসিংদীর রায়পুরা, বেলাব, শিবপুর ও সদর উপজেলার বিভিন্ন বাগানে এখন পুরোদমে লটকন সংগ্রহ চলছে। ভোর থেকে শ্রমিকরা গাছ থেকে লটকন সংগ্রহ করে ঝুড়ি ও প্লাস্টিকের ক্রেটে ভরে স্থানীয় আড়তে নিয়ে যাচ্ছেন। পরে সেখান থেকে দেশের বিভিন্ন জেলায় পাইকারদের মাধ্যমে সরবরাহ করা হচ্ছে।
নরসিংদীর লটকনের চাহিদা রাজধানী ঢাকাসহ চট্টগ্রাম, সিলেট, খুলনা, রাজশাহী, কুমিল্লা, ময়মনসিংহ ও বরিশালসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে রয়েছে। মৌসুমজুড়ে প্রতিদিন ট্রাক ও পিকআপভ্যানে বিপুল পরিমাণ লটকন দেশের বিভিন্ন পাইকারি বাজারে পাঠানো হচ্ছে।
এ বছর অনুকূল আবহাওয়া, সময়মতো বৃষ্টি এবং রোগবালাই তুলনামূলক কম থাকায় লটকনের ফলন ভালো হয়েছে বলে জানিয়েছেন কৃষি সংশ্লিষ্টরা। বাজারে চাহিদা বেশি থাকায় দামও সন্তোষজনক। এতে উৎপাদন খরচ বাদ দিয়ে ভালো মুনাফার আশা করছেন বাগান মালিকরা।
লটকনের মৌসুমকে কেন্দ্র করে নরসিংদীতে কয়েক হাজার মানুষের অস্থায়ী কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়েছে। ফল সংগ্রহ, বাছাই, প্যাকেজিং, পরিবহন ও বাজারজাতকরণের সঙ্গে জড়িত শ্রমিক, পরিবহনকর্মী ও ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা মৌসুমি আয় করছেন। এতে স্থানীয় অর্থনীতিতেও ইতিবাচক প্রভাব পড়ছে।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা জানান, লটকনের আবাদ ও উৎপাদন প্রতিবছরই বাড়ছে। উন্নত পরিচর্যা, আধুনিক চাষাবাদ এবং কৃষকদের প্রশিক্ষণ অব্যাহত থাকলে ভবিষ্যতে নরসিংদীর লটকন দেশীয় চাহিদা পূরণের পাশাপাশি রপ্তানির ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
কৃষি সংশ্লিষ্টদের মতে, প্রায় ১৪৬ কোটি টাকার সম্ভাব্য বাণিজ্য শুধু চাষিদের নয়, বরং স্থানীয় ব্যবসায়ী, পরিবহন খাত এবং শ্রমবাজারেও ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে। ফলে মৌসুমজুড়ে জেলার গ্রামীণ অর্থনীতিতে অর্থের প্রবাহ বাড়বে এবং কৃষিভিত্তিক অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড আরও গতিশীল হবে।
এবার নরসিংদীর বিভিন্ন এলাকায় গাছে গাছে লটকনের থোকা ঝুলতে দেখা যাচ্ছে। ফলন ভালো হওয়ায় বাগানগুলোতে এখন উৎসবমুখর পরিবেশ বিরাজ করছে। প্রতিদিন শত শত শ্রমিক ফল সংগ্রহ, বাছাই ও পরিবহনের কাজে ব্যস্ত সময় পার করছেন।
মৌসুমের শুরু থেকেই নরসিংদীর বিভিন্ন আড়তে দেশের নানা প্রান্ত থেকে পাইকাররা ভিড় করছেন। সরাসরি বাগান থেকেই অনেক ব্যবসায়ী লটকন কিনে নিচ্ছেন। এতে কৃষকরা দ্রুত ন্যায্য মূল্য পাচ্ছেন এবং মধ্যস্বত্বভোগীর সংখ্যাও তুলনামূলক কমেছে।
প্রচলিত বাজারের পাশাপাশি এখন অনেক উদ্যোক্তা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও ই-কমার্স প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে লটকন বিক্রি করছেন। রাজধানীসহ বিভিন্ন শহরে অনলাইনে অর্ডার নিয়ে কুরিয়ার সার্ভিসের মাধ্যমে লটকন পৌঁছে দেওয়া হচ্ছে। এতে নতুন বাজার তৈরি হয়েছে এবং কৃষকরাও অতিরিক্ত লাভের সুযোগ পাচ্ছেন।
লটকন ভিটামিন–সি, ক্যালসিয়াম, আয়রন ও অ্যান্টিঅক্সিডেন্টে সমৃদ্ধ একটি মৌসুমি ফল। এটি রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়াতে সহায়ক এবং গরমের মৌসুমে শরীরকে সতেজ রাখতে সাহায্য করে। পুষ্টিগুণের কারণে প্রতিবছরই এর জনপ্রিয়তা বাড়ছে।
কৃষি বিশেষজ্ঞদের মতে, আধুনিক প্যাকেজিং, সংরক্ষণ ও আন্তর্জাতিক মানের ফাইটোস্যানিটারি ব্যবস্থা নিশ্চিত করা গেলে নরসিংদীর লটকন মধ্যপ্রাচ্য, ইউরোপ এবং প্রবাসী বাংলাদেশিদের বাজারে রপ্তানির সুযোগ তৈরি হতে পারে। এতে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের পাশাপাশি কৃষকরাও আরও বেশি লাভবান হবেন।
লটকন চাষিরা বলেন, ফলন ভালো হলেও সংরক্ষণের পর্যাপ্ত ব্যবস্থা না থাকায় দ্রুত বিক্রি করতে হয়। তারা সরকারি উদ্যোগে হিমাগার, সহজ শর্তে কৃষিঋণ, উন্নত পরিবহন ব্যবস্থা এবং রপ্তানি সহায়তা চান। এসব সুবিধা নিশ্চিত হলে আগামী বছরগুলোতে আরও বেশি জমিতে লটকনের আবাদ করা সম্ভব হবে।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর জানায়, উচ্চফলনশীল চারা বিতরণ, কৃষকদের প্রশিক্ষণ এবং আধুনিক বাগান ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে লটকনের উৎপাদন আরও বাড়ানোর পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি নিরাপদ ফল উৎপাদনে কৃষকদের উদ্বুদ্ধ করা হচ্ছে, যাতে দেশীয় বাজারের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক বাজারেও নরসিংদীর লটকনের সুনাম বৃদ্ধি পায়।




























