ঢাকা ১১:০৫ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ০৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ২০ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম :

৬ মিলিয়ন ডলারের কলা, যে শিল্পকর্মে বিশ্বজুড়ে তোলপাড়

  • ডেস্ক নিউজ
  • Update Time : ০৮:৪৮:৩৪ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬
  • ৫১৫

দেয়ালে টেপ দিয়ে লাগানো সেই আলোচিত কলা | ছবি: সংগৃহীত

একটি কলা, দেয়াল এবং কয়েক টুকরো ডাক্ট টেপ। এই সাধারণ তিনটি জিনিস দিয়েই বিশ্বজুড়ে তুমুল আলোচনার জন্ম দিয়েছিলেন ইতালীয় শিল্পী মরিজিও ক্যাতেলান। তার তৈরি ‘কমেডিয়ান’ নামের শিল্পকর্মে একটি আসল কলা দেয়ালে রুপালি টেপ দিয়ে আটকে রাখা হয়েছিল। দেখতে একেবারে সাধারণ হলেও এই শিল্পকর্মের দাম এবং এর পেছনের ভাবনা শিল্পজগতে ব্যাপক বিতর্ক তৈরি করে। ২০১৯ সালে মিয়ামি বিচের আর্ট বাসেলে প্রথম প্রদর্শিত হওয়ার পর থেকেই এটি আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে চলে আসে।

‘কমেডিয়ান’ প্রদর্শনীর কয়েক দিনের মধ্যেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হয়ে যায়। দর্শনার্থীরা শিল্পকর্মটির ছবি তুলে অনলাইনে প্রকাশ করতে থাকেন। কেউ বিষয়টি নিয়ে হাসাহাসি করেছেন, কেউ বিস্ময় প্রকাশ করেছেন, আবার অনেকে প্রশ্ন তুলেছেন, একটি সাধারণ কলা কীভাবে শিল্পকর্ম হতে পারে। এর মধ্যেই শিল্পটির দুটি সংস্করণ ১ লাখ ২০ হাজার ডলার করে বিক্রি হয়। পরে তৃতীয় ও শেষ সংস্করণটি বিক্রি হয় ১ লাখ ৫০ হাজার ডলারে। ক্রেতাদের দেওয়া হয়েছিল সত্যায়ন সনদ এবং শিল্পকর্মটি প্রদর্শনের জন্য নির্দিষ্ট নির্দেশনা।

তবে ‘কমেডিয়ান’-এর উদ্দেশ্য শুধু দর্শকদের চমকে দেওয়া ছিল না। ক্যাতেলান মূলত শিল্পবাজার এবং বড় শিল্প প্রদর্শনীর সংস্কৃতিকে ব্যঙ্গ করতে চেয়েছিলেন। এর আগেও তিনি বিতর্ক তৈরি করা একাধিক শিল্পকর্ম তৈরি করেছেন। ১৯৯৯ সালের ‘এ পারফেক্ট ডে’ নামের কাজে তিনি তার শিল্প ব্যবসায়ী মাসিমো ডি কার্লোকে ডাক্ট টেপ দিয়ে দেয়ালে আটকে দিয়েছিলেন। সেখানে শিল্পকর্মের চেয়ে মানুষটিই প্রদর্শনীর মূল আকর্ষণে পরিণত হয়েছিল। প্রায় দুই দশক পর ‘কমেডিয়ান’-এ একই ধরনের টেপ ব্যবহার করে ক্যাতেলান আবারও তার ব্যঙ্গাত্মক শিল্পধারার পরিচয় দেন।

কেন কলাকে বেছে নেওয়া হলো, সেটিও এই শিল্পকর্মের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। শিল্পের ইতিহাসে কলা নতুন কোনো বিষয় নয়। জর্জিও দে কিরিকো, অ্যান্ডি ওয়ারহলসহ অনেক শিল্পী তাদের কাজে কলার ব্যবহার করেছেন। ফলমূল ও দৈনন্দিন বস্তুকে শিল্পে তুলে ধরার ঐতিহ্যও কয়েক শতাব্দী পুরোনো। বিশেষ করে স্টিল লাইফ চিত্রকলায় সাধারণ ফলমূলকে মানুষের জীবন, সময় এবং প্রকৃতির প্রতীক হিসেবে দেখানো হয়েছে। ফলে ক্যাতেলানের কলা ব্যবহার পুরোপুরি নতুন ধারণা নয়। বরং পরিচিত একটি বস্তুকে অপ্রত্যাশিতভাবে উপস্থাপন করেই তিনি মানুষের মনোযোগ কেড়েছেন।

এর সঙ্গে যুক্ত রয়েছে ‘রেডিমেড’ শিল্পের ধারণা। বাস্তব জীবনের তৈরি কোনো সাধারণ বস্তুকে শিল্পকর্ম হিসেবে উপস্থাপনের এই পদ্ধতি শত বছরেরও বেশি পুরোনো। ফরাসি শিল্পী মার্সেল দুশাঁ ১৯১০-এর দশকে বোতল রাখার স্ট্যান্ড, সাইকেলের চাকা এবং একটি প্রস্রাবের পাত্রের মতো সাধারণ জিনিসকে শিল্প হিসেবে উপস্থাপন করে প্রচলিত ধারণাকে প্রশ্নের মুখে ফেলেছিলেন। ক্যাতেলানের ‘কমেডিয়ান’-এও সেই চিন্তার প্রভাব রয়েছে। তবে এখানে ব্যবহৃত কলাটি আসল হওয়ায় এর একটি বিশেষ বৈশিষ্ট্য রয়েছে। কলাটি কয়েক দিনের মধ্যেই পচে যেতে পারে এবং সেটি নিয়মিত পরিবর্তন করার নির্দেশনাও ছিল।

‘কমেডিয়ান’-এর সবচেয়ে বড় সাফল্য সম্ভবত এর বিতর্ক তৈরি করার ক্ষমতা। ২০২৪ সালে এই শিল্পকর্মের একটি সংস্করণ নিলামে ৬২ লাখ ৪০ হাজার ডলারে বিক্রি হয়। অর্থাৎ যে কলাটি দেখতে কয়েক ডলারের বেশি মূল্যবান মনে হয় না, সেটিই কোটি কোটি টাকার শিল্পকর্মে পরিণত হয়েছে। এর দাম নিয়ে যেমন সমালোচনা হয়েছে, তেমনি আধুনিক শিল্পের ধারণা নিয়েও নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। ক্যাতেলানের কাজ শেষ পর্যন্ত দেখিয়েছে, শিল্প সবসময় শুধু সৌন্দর্য বা কারিগরি দক্ষতার বিষয় নয়। কখনো একটি সাধারণ কলাও মানুষের চিন্তা, বিতর্ক ও কৌতূহলের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হতে পারে।

জনপ্রিয় সংবাদ

দীর্ঘসময় ইতালির ক্ষমতায় থাকা মেলোনিকে মোদীর শুভেচ্ছা, বার্তায় যা লিখেছেন

৬ মিলিয়ন ডলারের কলা, যে শিল্পকর্মে বিশ্বজুড়ে তোলপাড়

Update Time : ০৮:৪৮:৩৪ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬

একটি কলা, দেয়াল এবং কয়েক টুকরো ডাক্ট টেপ। এই সাধারণ তিনটি জিনিস দিয়েই বিশ্বজুড়ে তুমুল আলোচনার জন্ম দিয়েছিলেন ইতালীয় শিল্পী মরিজিও ক্যাতেলান। তার তৈরি ‘কমেডিয়ান’ নামের শিল্পকর্মে একটি আসল কলা দেয়ালে রুপালি টেপ দিয়ে আটকে রাখা হয়েছিল। দেখতে একেবারে সাধারণ হলেও এই শিল্পকর্মের দাম এবং এর পেছনের ভাবনা শিল্পজগতে ব্যাপক বিতর্ক তৈরি করে। ২০১৯ সালে মিয়ামি বিচের আর্ট বাসেলে প্রথম প্রদর্শিত হওয়ার পর থেকেই এটি আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে চলে আসে।

‘কমেডিয়ান’ প্রদর্শনীর কয়েক দিনের মধ্যেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হয়ে যায়। দর্শনার্থীরা শিল্পকর্মটির ছবি তুলে অনলাইনে প্রকাশ করতে থাকেন। কেউ বিষয়টি নিয়ে হাসাহাসি করেছেন, কেউ বিস্ময় প্রকাশ করেছেন, আবার অনেকে প্রশ্ন তুলেছেন, একটি সাধারণ কলা কীভাবে শিল্পকর্ম হতে পারে। এর মধ্যেই শিল্পটির দুটি সংস্করণ ১ লাখ ২০ হাজার ডলার করে বিক্রি হয়। পরে তৃতীয় ও শেষ সংস্করণটি বিক্রি হয় ১ লাখ ৫০ হাজার ডলারে। ক্রেতাদের দেওয়া হয়েছিল সত্যায়ন সনদ এবং শিল্পকর্মটি প্রদর্শনের জন্য নির্দিষ্ট নির্দেশনা।

আরও পড়ুন  ভারতে ৬২ হাজার, যুক্তরাষ্ট্রে ২৮ লাখ! চিকিৎসার খরচে বড় পার্থক্য

তবে ‘কমেডিয়ান’-এর উদ্দেশ্য শুধু দর্শকদের চমকে দেওয়া ছিল না। ক্যাতেলান মূলত শিল্পবাজার এবং বড় শিল্প প্রদর্শনীর সংস্কৃতিকে ব্যঙ্গ করতে চেয়েছিলেন। এর আগেও তিনি বিতর্ক তৈরি করা একাধিক শিল্পকর্ম তৈরি করেছেন। ১৯৯৯ সালের ‘এ পারফেক্ট ডে’ নামের কাজে তিনি তার শিল্প ব্যবসায়ী মাসিমো ডি কার্লোকে ডাক্ট টেপ দিয়ে দেয়ালে আটকে দিয়েছিলেন। সেখানে শিল্পকর্মের চেয়ে মানুষটিই প্রদর্শনীর মূল আকর্ষণে পরিণত হয়েছিল। প্রায় দুই দশক পর ‘কমেডিয়ান’-এ একই ধরনের টেপ ব্যবহার করে ক্যাতেলান আবারও তার ব্যঙ্গাত্মক শিল্পধারার পরিচয় দেন।

কেন কলাকে বেছে নেওয়া হলো, সেটিও এই শিল্পকর্মের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। শিল্পের ইতিহাসে কলা নতুন কোনো বিষয় নয়। জর্জিও দে কিরিকো, অ্যান্ডি ওয়ারহলসহ অনেক শিল্পী তাদের কাজে কলার ব্যবহার করেছেন। ফলমূল ও দৈনন্দিন বস্তুকে শিল্পে তুলে ধরার ঐতিহ্যও কয়েক শতাব্দী পুরোনো। বিশেষ করে স্টিল লাইফ চিত্রকলায় সাধারণ ফলমূলকে মানুষের জীবন, সময় এবং প্রকৃতির প্রতীক হিসেবে দেখানো হয়েছে। ফলে ক্যাতেলানের কলা ব্যবহার পুরোপুরি নতুন ধারণা নয়। বরং পরিচিত একটি বস্তুকে অপ্রত্যাশিতভাবে উপস্থাপন করেই তিনি মানুষের মনোযোগ কেড়েছেন।

আরও পড়ুন  পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচন: শিলিগুড়িতে মোদির প্রচার, ‘পদ্ম ফোটান অনুপ্রবেশকারী হটান’

এর সঙ্গে যুক্ত রয়েছে ‘রেডিমেড’ শিল্পের ধারণা। বাস্তব জীবনের তৈরি কোনো সাধারণ বস্তুকে শিল্পকর্ম হিসেবে উপস্থাপনের এই পদ্ধতি শত বছরেরও বেশি পুরোনো। ফরাসি শিল্পী মার্সেল দুশাঁ ১৯১০-এর দশকে বোতল রাখার স্ট্যান্ড, সাইকেলের চাকা এবং একটি প্রস্রাবের পাত্রের মতো সাধারণ জিনিসকে শিল্প হিসেবে উপস্থাপন করে প্রচলিত ধারণাকে প্রশ্নের মুখে ফেলেছিলেন। ক্যাতেলানের ‘কমেডিয়ান’-এও সেই চিন্তার প্রভাব রয়েছে। তবে এখানে ব্যবহৃত কলাটি আসল হওয়ায় এর একটি বিশেষ বৈশিষ্ট্য রয়েছে। কলাটি কয়েক দিনের মধ্যেই পচে যেতে পারে এবং সেটি নিয়মিত পরিবর্তন করার নির্দেশনাও ছিল।

আরও পড়ুন  ট্রাম্প কি নেতানিয়াহুর প্রভাবের জিম্মি?

‘কমেডিয়ান’-এর সবচেয়ে বড় সাফল্য সম্ভবত এর বিতর্ক তৈরি করার ক্ষমতা। ২০২৪ সালে এই শিল্পকর্মের একটি সংস্করণ নিলামে ৬২ লাখ ৪০ হাজার ডলারে বিক্রি হয়। অর্থাৎ যে কলাটি দেখতে কয়েক ডলারের বেশি মূল্যবান মনে হয় না, সেটিই কোটি কোটি টাকার শিল্পকর্মে পরিণত হয়েছে। এর দাম নিয়ে যেমন সমালোচনা হয়েছে, তেমনি আধুনিক শিল্পের ধারণা নিয়েও নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। ক্যাতেলানের কাজ শেষ পর্যন্ত দেখিয়েছে, শিল্প সবসময় শুধু সৌন্দর্য বা কারিগরি দক্ষতার বিষয় নয়। কখনো একটি সাধারণ কলাও মানুষের চিন্তা, বিতর্ক ও কৌতূহলের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হতে পারে।