নেদারল্যান্ডসের স্বর্ণ রিজার্ভের একটি বড় অংশ যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডা থেকে যুক্তরাজ্যে স্থানান্তর করেছে দেশটির কেন্দ্রীয় ব্যাংক। ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনা ও সম্ভাব্য সংকটের মধ্যে নিজেদের স্বর্ণের রিজার্ভ আরও সহজে ব্যবহারযোগ্য এবং নিরাপদ রাখতেই এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছে ডাচ কেন্দ্রীয় ব্যাংক (ডিএনবি)।
ডিএনবির তথ্য অনুযায়ী, গত ১ সেপ্টেম্বরের পর প্রকাশিত তথ্যের ভিত্তিতে স্বর্ণ স্থানান্তরের এই প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা হয়েছে। ব্যাংকটি জানিয়েছে, গুরুতর কোনো সংকট দেখা দিলে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার সক্ষমতা বাড়াতেই রিজার্ভের অবস্থান পুনর্বিন্যাস করা হয়েছে। তবে ঠিক কোন ধরনের সংকটের কথা মাথায় রেখে এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে, সে বিষয়ে বিস্তারিত জানায়নি তারা।
নেদারল্যান্ডসের মোট স্বর্ণের রিজার্ভ প্রায় ৬১২ দশমিক ৪ টন। এর বর্তমান মূল্য আনুমানিক ৭২ দশমিক ২ বিলিয়ন ইউরো বা প্রায় ৮৩ দশমিক ৮ বিলিয়ন ডলার। আর্থিক ব্যবস্থা বড় ধরনের সংকটে পড়লে স্বর্ণকে একটি গুরুত্বপূর্ণ নিরাপদ সম্পদ হিসেবে ব্যবহার করা যায়। এ কারণেই বিভিন্ন দেশ নিজেদের স্বর্ণের মজুত একাধিক দেশে সংরক্ষণ করে ঝুঁকি কমানোর চেষ্টা করে।
স্থানান্তরের আগে নেদারল্যান্ডসের মোট স্বর্ণের ৩০ দশমিক ৮ শতাংশ ছিল দেশটির নিজস্ব ক্যাশ সেন্টার জেইস্টে। লন্ডনে ছিল ১৮ দশমিক ১ শতাংশ, নিউইয়র্কে ৩১ দশমিক ৩ শতাংশ এবং কানাডার অটোয়ায় ছিল ১৯ দশমিক ৭ শতাংশ। স্থানান্তরের পর জেইস্টে থাকা স্বর্ণের অনুপাত অপরিবর্তিত থাকলেও লন্ডনে এর পরিমাণ বেড়ে হয়েছে ৩২ দশমিক ১ শতাংশ। বিপরীতে নিউইয়র্ক ও অটোয়ায় থাকা স্বর্ণের পরিমাণ কমে উভয় ক্ষেত্রেই ১৮ দশমিক ৫ শতাংশ হয়েছে।
ডিএনবির তথ্য অনুযায়ী, স্থানান্তরের একটি অংশ করা হয়েছে স্বর্ণ বিক্রি ও পুনরায় কেনার মাধ্যমে। নিউইয়র্কে প্রায় ৫৯ টন স্বর্ণ বিক্রি করে সমপরিমাণ স্বর্ণ লন্ডনে কেনা হয়েছে। এ স্বর্ণের মূল্য ছিল আনুমানিক ৮ দশমিক ৩ বিলিয়ন ডলার। পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডা থেকে ২৭ টনের বেশি স্বর্ণ সরাসরি জেইস্টে নেওয়া হয়। পরে আন্তর্জাতিক বাজারের মানদণ্ড পূরণকারী সমপরিমাণ স্বর্ণ জেইস্ট থেকে লন্ডনে স্থানান্তর করা হয়েছে।
২০২৫ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত নিউইয়র্ক থেকে প্রায় ১০ দশমিক ৭ বিলিয়ন ডলার মূল্যের স্বর্ণ এবং কানাডার অটোয়া থেকে ১ বিলিয়ন ডলারের কিছু বেশি মূল্যের স্বর্ণ সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। এর ফলে নেদারল্যান্ডসের স্বর্ণের রিজার্ভ এখন আগের তুলনায় ভৌগোলিকভাবে আরও ভারসাম্যপূর্ণ অবস্থানে রয়েছে।
নেদারল্যান্ডসের কেন্দ্রীয় ব্যাংক জানিয়েছে, এই পদক্ষেপ তাদের ঝুঁকি বৈচিত্র্যকরণ কৌশলের অংশ। স্বর্ণের অবস্থান পরিবর্তনের পাশাপাশি সরাসরি পরিবহন এবং বাজারের মাধ্যমে স্থানান্তর—দুই ধরনের পদ্ধতির অভিজ্ঞতাও কাজে লাগাতে চেয়েছে তারা। ভবিষ্যতে কোনো সংকটের সময় একটি পদ্ধতি ব্যবহার করা সম্ভব না হলে অন্য পদ্ধতি কাজে লাগানোর সুযোগ থাকবে।
লন্ডনকে স্বর্ণ রাখার জন্য গুরুত্বপূর্ণ একটি কেন্দ্র হিসেবে বিবেচনা করছে ডিএনবি। তাদের মতে, সেখানে বেশি পরিমাণ স্বর্ণ থাকলে প্রয়োজনে তা দ্রুত লেনদেন বা ব্যবহার করা সহজ হতে পারে। অন্যদিকে নিউইয়র্ক ও অটোয়ায় রাখা স্বর্ণ চরম সংকটের সময় দ্রুত এবং সরাসরি ব্যবহার করা কঠিন হতে পারে।
নেদারল্যান্ডসের এই সিদ্ধান্তের সঙ্গে সাম্প্রতিক বৈশ্বিক ভূ-রাজনৈতিক পরিস্থিতির সম্পর্ক রয়েছে কি না, তা ডিএনবি সরাসরি জানায়নি। তবে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে কানাডার বাণিজ্যিক বিরোধ, আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক উত্তেজনা এবং ইউরোপ ও যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্কের বিভিন্ন টানাপোড়েনের কারণে দেশগুলোর মধ্যে নিজেদের রিজার্ভ সম্পদের ওপর সরাসরি নিয়ন্ত্রণ রাখার প্রবণতা নিয়ে আলোচনা চলছে।
নেদারল্যান্ডস অবশ্য একমাত্র দেশ নয়, যারা যুক্তরাষ্ট্রে রাখা স্বর্ণের মজুত পুনর্বিন্যাস করেছে। চলতি বছর ফ্রান্সও নিউইয়র্ক থেকে বিপুল পরিমাণ স্বর্ণ দেশে ফিরিয়ে নিয়েছে। এর আগে জার্মানি ২০১৩ থেকে ২০১৭ সালের মধ্যে নিউইয়র্ক থেকে ৬০০ টনের বেশি স্বর্ণ ফ্রাঙ্কফুর্টে স্থানান্তর করেছিল।
বিশ্বের সবচেয়ে বেশি স্বর্ণের রিজার্ভ রয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের কাছে। দেশটির মজুত ৮ হাজার ১৩৩ দশমিক ৪ টন। এরপর রয়েছে ইতালি, চীন ও রাশিয়া। তাদের স্বর্ণের রিজার্ভ যথাক্রমে ২ হাজার ৪৫১ দশমিক ৮ টন, ২ হাজার ৩১৩ দশমিক ৪ টন এবং ২ হাজার ৩০৪ দশমিক ৭ টন। ভারতের কাছে রয়েছে ৮৮০ দশমিক ৫ টন, জাপানের ৮৪৫ দশমিক ৯ টন এবং পোল্যান্ডের ৫৮১ দশমিক ৬ টন।
নেদারল্যান্ডসের স্বর্ণ স্থানান্তরের মূল লক্ষ্য হিসেবে এখন পর্যন্ত ঝুঁকি কমানো, রিজার্ভের ভৌগোলিক ভারসাম্য এবং প্রয়োজনে দ্রুত ব্যবহারযোগ্যতা বাড়ানোর বিষয়গুলোই সামনে এসেছে। তবে এই সিদ্ধান্তের পেছনে কোনো নির্দিষ্ট দেশের সঙ্গে রাজনৈতিক বা কূটনৈতিক বিরোধকে কারণ হিসেবে নিশ্চিত করেনি ডাচ কেন্দ্রীয় ব্যাংক।





























