ঢাকা ০৬:২১ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ০১ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১৭ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

ভয়াবহ বন্যার মাঝেও বিদেশি সহায়তায় নেপালের ‘না’, কেন?

  • ডেস্ক নিউজ
  • Update Time : ০৪:০৫:৪০ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ১ সেপ্টেম্বর ২০২৬
  • ৫১৫

নেপালে বন্যা ও ভূমিধসের পর চলছে ব্যাপক উদ্ধার অভিযান। ছবি: সংগৃহীত

নেপাল বন্যা ও ভূমিধসে ভয়াবহ মানবিক বিপর্যয়ের মুখে পড়েছে দেশটি। গত সপ্তাহে বরফ ও পাথরের বিশাল স্তূপ ধসে পড়ার পর সৃষ্ট বন্যা ও কাদাধসে হিমালয়সংলগ্ন বেশ কয়েকটি গ্রাম ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয়, বিভিন্ন জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের নির্মাণাধীন টানেলে শত শত শ্রমিক আটকা পড়েছেন। পরিস্থিতি মোকাবিলায় দেশটির উদ্ধার সক্ষমতা নিয়ে এখন নতুন করে প্রশ্ন উঠছে।

নেপালের দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা বিভাগের সোমবারের তথ্য অনুযায়ী, দুর্যোগে ৯০৩ জনের মৃত্যু হয়েছে এবং ৪ হাজার ২৪৭ জনকে এখনও নিখোঁজ হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। নিখোঁজদের মধ্যে অন্তত ৮৫ জন মার্কিন নাগরিক রয়েছেন বলে জানিয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তর। ভূমিধসের ধ্বংসাবশেষে রসুয়া ও নুওয়াকোট জেলার নয়টি জলবিদ্যুৎ টানেলের প্রবেশপথ বন্ধ হয়ে গেছে। এসব টানেলে নেপাল, দক্ষিণ কোরিয়া ও চীনের ৯৩৩ জন শ্রমিক আটকা পড়েছেন বলে প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে।

আটকে পড়াদের উদ্ধারে নেপালি সেনাবাহিনী ও অন্যান্য উদ্ধারকারী দল ভারী যন্ত্রপাতি ব্যবহার করছে। ড্রিল ও এক্সকাভেটরের সাহায্যে বন্ধ হয়ে যাওয়া টানেলের পথ খোঁজা এবং ধ্বংসাবশেষ সরানোর চেষ্টা চলছে। তবে বিপর্যয়ের মাত্রা এত বেশি যে কোথাও কোথাও উদ্ধারকারীদের টানেলের অবস্থান শনাক্ত করতেই কয়েক দিন সময় লেগেছে। নেপালের বেসরকারি বিদ্যুৎ উৎপাদকদের সংগঠনের প্রধান নির্বাহী ভীম গৌতমের দাবি, এমন বড় ধরনের উদ্ধার অভিযানের জন্য দেশটির প্রয়োজনীয় প্রযুক্তি, সরঞ্জাম ও বিশেষজ্ঞের ঘাটতি রয়েছে।

এ পরিস্থিতিতে নেপাল বন্যা মোকাবিলায় বিদেশি সহায়তা গ্রহণে সরকারের প্রাথমিক দেরি নিয়ে সমালোচনা শুরু হয়েছে। গৌতমের ভাষ্য অনুযায়ী, শিল্পসংশ্লিষ্ট নেতাদের সরকারকে বিদেশি উদ্ধারকারী দল অনুমোদনের জন্য চাপ দিতে হয়েছে। পরে চীন, ভারত ও অস্ট্রেলিয়ার উদ্ধারকারী দলকে আসার অনুমতি দেওয়া হলেও তাঁর মতে, সিদ্ধান্তটি আরও আগে নেওয়া প্রয়োজন ছিল। তবে নেপালের অর্থমন্ত্রী স্বর্ণিম ওয়াগলে বিদেশি সহায়তা প্রত্যাখ্যানের খবর অস্বীকার করে বলেছেন, মাঠপর্যায়ের প্রয়োজন অনুযায়ী সহায়তা গ্রহণ করা হয়েছে।

প্রধানমন্ত্রী বালেন শাহও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক বিবৃতিতে জানিয়েছেন, নেপালি সেনাবাহিনী ও পুলিশ বিভিন্ন জলবিদ্যুৎ টানেলে উদ্ধারকাজ চালাচ্ছে। ভারত, চীন ও দক্ষিণ কোরিয়ার বিশেষজ্ঞরাও এসব অভিযানে যুক্ত হয়েছেন। তবে রাজনৈতিক বিশ্লেষক চন্দ্রদেব ভট্টের মতে, সরকারের শুরুতে বিদেশি সহায়তা নিতে অনীহার পেছনে ভূরাজনৈতিক বিষয় কাজ করে থাকতে পারে। তাঁর দাবি, ২০১৫ সালের ভূমিকম্পের পর পুনর্গঠন কার্যক্রমে ভারত, চীন ও পশ্চিমা দেশগুলোর মধ্যে প্রভাব বিস্তারের প্রতিযোগিতা নেপালের অভিজ্ঞতাকে প্রভাবিত করেছে।

সরকারের এই অবস্থান সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও সমালোচনার মুখে পড়েছে। অনেকেই মনে করছেন, দুর্যোগের মুহূর্তে কোন দেশ থেকে সাহায্য আসছে সেটির চেয়ে দ্রুত মানুষের জীবন রক্ষা করাই বেশি গুরুত্বপূর্ণ। বিশ্লেষক ভট্টার মতে, পরিস্থিতির ব্যাপকতা সরকার শুরুতে পুরোপুরি বুঝতে না পারার সম্ভাবনাও রয়েছে। তাঁর আশঙ্কা, উদ্ধার সহায়তা যদি আরও আগে পাওয়া যেত, তাহলে হয়তো আরও কিছু প্রাণ বাঁচানো সম্ভব হতো।

এদিকে নেপালের পাশাপাশি চীনের দিকেও নজর রয়েছে। দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এমন অভিযোগ অস্বীকার করেছে যে চীনা কর্মকর্তারা দুর্যোগের প্রাথমিক সতর্কতা উপেক্ষা করেছেন কিংবা হতাহতের তথ্য কম করে দেখিয়েছেন। বেইজিংয়ের দাবি, নেপাল সীমান্তসংলগ্ন বন্যা ও ভূমিধসের তথ্য সময়মতো এবং স্বচ্ছভাবেই প্রকাশ করা হয়েছে। তবে চীনের সর্বশেষ প্রকাশিত হিসাবে ১৬ জনের মৃত্যু ও ৫৪৬ জন নিখোঁজ থাকার কথা জানানো হয়েছিল, যা ৪৮ ঘণ্টার বেশি সময় ধরে আর আপডেট করা হয়নি।

এই পরিস্থিতিতে নেপাল বন্যা শুধু একটি প্রাকৃতিক দুর্যোগের ঘটনা হয়ে থাকছে না; এটি দেশটির উদ্ধার সক্ষমতা, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা এবং আন্তর্জাতিক সহায়তা গ্রহণের নীতি নিয়েও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন তুলছে। এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় আটকে থাকা মানুষদের দ্রুত খুঁজে বের করা এবং ক্ষতিগ্রস্তদের কাছে প্রয়োজনীয় সহায়তা পৌঁছে দেওয়া। উদ্ধার অভিযান যত এগোবে, ততই দুর্যোগের প্রকৃত ক্ষয়ক্ষতির চিত্র আরও পরিষ্কার হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

ভয়াবহ বন্যার মাঝেও বিদেশি সহায়তায় নেপালের ‘না’, কেন?

Update Time : ০৪:০৫:৪০ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ১ সেপ্টেম্বর ২০২৬

নেপাল বন্যা ও ভূমিধসে ভয়াবহ মানবিক বিপর্যয়ের মুখে পড়েছে দেশটি। গত সপ্তাহে বরফ ও পাথরের বিশাল স্তূপ ধসে পড়ার পর সৃষ্ট বন্যা ও কাদাধসে হিমালয়সংলগ্ন বেশ কয়েকটি গ্রাম ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয়, বিভিন্ন জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের নির্মাণাধীন টানেলে শত শত শ্রমিক আটকা পড়েছেন। পরিস্থিতি মোকাবিলায় দেশটির উদ্ধার সক্ষমতা নিয়ে এখন নতুন করে প্রশ্ন উঠছে।

নেপালের দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা বিভাগের সোমবারের তথ্য অনুযায়ী, দুর্যোগে ৯০৩ জনের মৃত্যু হয়েছে এবং ৪ হাজার ২৪৭ জনকে এখনও নিখোঁজ হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। নিখোঁজদের মধ্যে অন্তত ৮৫ জন মার্কিন নাগরিক রয়েছেন বলে জানিয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তর। ভূমিধসের ধ্বংসাবশেষে রসুয়া ও নুওয়াকোট জেলার নয়টি জলবিদ্যুৎ টানেলের প্রবেশপথ বন্ধ হয়ে গেছে। এসব টানেলে নেপাল, দক্ষিণ কোরিয়া ও চীনের ৯৩৩ জন শ্রমিক আটকা পড়েছেন বলে প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে।

আটকে পড়াদের উদ্ধারে নেপালি সেনাবাহিনী ও অন্যান্য উদ্ধারকারী দল ভারী যন্ত্রপাতি ব্যবহার করছে। ড্রিল ও এক্সকাভেটরের সাহায্যে বন্ধ হয়ে যাওয়া টানেলের পথ খোঁজা এবং ধ্বংসাবশেষ সরানোর চেষ্টা চলছে। তবে বিপর্যয়ের মাত্রা এত বেশি যে কোথাও কোথাও উদ্ধারকারীদের টানেলের অবস্থান শনাক্ত করতেই কয়েক দিন সময় লেগেছে। নেপালের বেসরকারি বিদ্যুৎ উৎপাদকদের সংগঠনের প্রধান নির্বাহী ভীম গৌতমের দাবি, এমন বড় ধরনের উদ্ধার অভিযানের জন্য দেশটির প্রয়োজনীয় প্রযুক্তি, সরঞ্জাম ও বিশেষজ্ঞের ঘাটতি রয়েছে।

আরও পড়ুন  আদানির মামলা প্রত্যাহারে প্রশ্ন, বিচারকের নির্দেশে নতুন মোড়

এ পরিস্থিতিতে নেপাল বন্যা মোকাবিলায় বিদেশি সহায়তা গ্রহণে সরকারের প্রাথমিক দেরি নিয়ে সমালোচনা শুরু হয়েছে। গৌতমের ভাষ্য অনুযায়ী, শিল্পসংশ্লিষ্ট নেতাদের সরকারকে বিদেশি উদ্ধারকারী দল অনুমোদনের জন্য চাপ দিতে হয়েছে। পরে চীন, ভারত ও অস্ট্রেলিয়ার উদ্ধারকারী দলকে আসার অনুমতি দেওয়া হলেও তাঁর মতে, সিদ্ধান্তটি আরও আগে নেওয়া প্রয়োজন ছিল। তবে নেপালের অর্থমন্ত্রী স্বর্ণিম ওয়াগলে বিদেশি সহায়তা প্রত্যাখ্যানের খবর অস্বীকার করে বলেছেন, মাঠপর্যায়ের প্রয়োজন অনুযায়ী সহায়তা গ্রহণ করা হয়েছে।

আরও পড়ুন  ভুল করে নিজ দেশেই বোমা ফেলেছে ইসরায়েলি হেলিকপ্টার

প্রধানমন্ত্রী বালেন শাহও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক বিবৃতিতে জানিয়েছেন, নেপালি সেনাবাহিনী ও পুলিশ বিভিন্ন জলবিদ্যুৎ টানেলে উদ্ধারকাজ চালাচ্ছে। ভারত, চীন ও দক্ষিণ কোরিয়ার বিশেষজ্ঞরাও এসব অভিযানে যুক্ত হয়েছেন। তবে রাজনৈতিক বিশ্লেষক চন্দ্রদেব ভট্টের মতে, সরকারের শুরুতে বিদেশি সহায়তা নিতে অনীহার পেছনে ভূরাজনৈতিক বিষয় কাজ করে থাকতে পারে। তাঁর দাবি, ২০১৫ সালের ভূমিকম্পের পর পুনর্গঠন কার্যক্রমে ভারত, চীন ও পশ্চিমা দেশগুলোর মধ্যে প্রভাব বিস্তারের প্রতিযোগিতা নেপালের অভিজ্ঞতাকে প্রভাবিত করেছে।

সরকারের এই অবস্থান সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও সমালোচনার মুখে পড়েছে। অনেকেই মনে করছেন, দুর্যোগের মুহূর্তে কোন দেশ থেকে সাহায্য আসছে সেটির চেয়ে দ্রুত মানুষের জীবন রক্ষা করাই বেশি গুরুত্বপূর্ণ। বিশ্লেষক ভট্টার মতে, পরিস্থিতির ব্যাপকতা সরকার শুরুতে পুরোপুরি বুঝতে না পারার সম্ভাবনাও রয়েছে। তাঁর আশঙ্কা, উদ্ধার সহায়তা যদি আরও আগে পাওয়া যেত, তাহলে হয়তো আরও কিছু প্রাণ বাঁচানো সম্ভব হতো।

এদিকে নেপালের পাশাপাশি চীনের দিকেও নজর রয়েছে। দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এমন অভিযোগ অস্বীকার করেছে যে চীনা কর্মকর্তারা দুর্যোগের প্রাথমিক সতর্কতা উপেক্ষা করেছেন কিংবা হতাহতের তথ্য কম করে দেখিয়েছেন। বেইজিংয়ের দাবি, নেপাল সীমান্তসংলগ্ন বন্যা ও ভূমিধসের তথ্য সময়মতো এবং স্বচ্ছভাবেই প্রকাশ করা হয়েছে। তবে চীনের সর্বশেষ প্রকাশিত হিসাবে ১৬ জনের মৃত্যু ও ৫৪৬ জন নিখোঁজ থাকার কথা জানানো হয়েছিল, যা ৪৮ ঘণ্টার বেশি সময় ধরে আর আপডেট করা হয়নি।

আরও পড়ুন  বিশ্বব্যাংকের আয়ের তালিকা: সুখবর, ৫ দেশ উচ্চমধ্যম আয়ের দেশে উন্নীত

এই পরিস্থিতিতে নেপাল বন্যা শুধু একটি প্রাকৃতিক দুর্যোগের ঘটনা হয়ে থাকছে না; এটি দেশটির উদ্ধার সক্ষমতা, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা এবং আন্তর্জাতিক সহায়তা গ্রহণের নীতি নিয়েও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন তুলছে। এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় আটকে থাকা মানুষদের দ্রুত খুঁজে বের করা এবং ক্ষতিগ্রস্তদের কাছে প্রয়োজনীয় সহায়তা পৌঁছে দেওয়া। উদ্ধার অভিযান যত এগোবে, ততই দুর্যোগের প্রকৃত ক্ষয়ক্ষতির চিত্র আরও পরিষ্কার হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।