রাজকুমার রাওয়ের বলিউডযাত্রা শুরু হয়েছিল অভাব, অনিশ্চয়তা আর কঠিন সংগ্রামের মধ্য দিয়ে। আজ তিনি হিন্দি সিনেমার অন্যতম পরিচিত ও প্রশংসিত অভিনেতা হলেও একসময় মুম্বাইয়ে তাঁর ব্যাংক অ্যাকাউন্টে ছিল মাত্র ১৮ রুপি। কখনো দিনে এক প্যাকেট বিস্কুট খেয়ে থাকতে হয়েছে তাঁকে। ৩১ আগস্ট জন্মদিনে তাই অভিনেতার সাফল্যের পাশাপাশি উঠে আসে তাঁর দীর্ঘ সংগ্রামের গল্প। চলচ্চিত্র পরিবারের পরিচয় ছাড়াই নিজের প্রতিভা ও পরিশ্রমে জায়গা করে নিয়েছেন তিনি।
গুরগাঁওয়ের একটি মধ্যবিত্ত যৌথ পরিবারে বেড়ে ওঠা রাজকুমার ছোটবেলা থেকেই অভিনয়ের প্রতি আকৃষ্ট ছিলেন। থিয়েটারের প্রতি তাঁর আগ্রহ এতটাই ছিল যে দিল্লিতে অভিনয়ের জন্য প্রতিদিন প্রায় ৭০ কিলোমিটার সাইকেল চালিয়ে যাতায়াত করতেন। পরে পুণের এফটিআইআইয়ে পড়াশোনা করে অভিনয়ের দক্ষতা আরও শাণিত করেন। মুম্বাইয়ে এসে অবশ্য অপেক্ষা করছিল আরও কঠিন বাস্তবতা। প্রথম সিনেমায় সুযোগ পেতে প্রায় দুই বছর অপেক্ষা করতে হয়। এমনকি দিল্লির সময় একবার অভিনয়ের সুযোগ দেওয়ার কথা বলে তাঁকে ১০ হাজার রুপি প্রতারণার শিকারও হতে হয়েছিল।
দিবাকর ব্যানার্জির ‘লাভ, সেক্স অউর ধোঁকা’ দিয়ে বড় পর্দায় অভিষেকের পর ধীরে ধীরে নিজের জায়গা তৈরি করেন রাজকুমার। ‘গ্যাংস অব ওয়াসেপুর ২’ ও ‘তালাশ’-এর মতো সিনেমায় ছোট চরিত্রেও নজর কাড়েন। এরপর ‘কাই পো চে!’, ‘সিটিলাইটস’ ও ‘শহীদ’ তাঁকে প্রতিষ্ঠিত অভিনেতা হিসেবে পরিচিতি এনে দেয়। বিশেষ করে ‘শহীদ’ সিনেমায় মানবাধিকার আইনজীবী শহীদ আজমির চরিত্রে অভিনয়ের জন্য জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারে সেরা অভিনেতার স্বীকৃতি পান তিনি। এরপর আর পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি।
চরিত্র নির্বাচনে বৈচিত্র্যই রাজকুমার রাওয়ের অভিনয়জীবনের অন্যতম বৈশিষ্ট্য। গম্ভীর জীবনীভিত্তিক সিনেমা থেকে শুরু করে কমেডি, ভৌতিক, থ্রিলার, গ্যাংস্টার ড্রামা কিংবা রোমান্টিক কমেডি—বিভিন্ন ধরনের গল্পে নিজেকে মানিয়ে নিয়েছেন তিনি। ‘আলিগড়’, ‘ট্র্যাপড’ ও ‘বেরেলি কি বরফি’র মতো সিনেমায় তাঁর অভিনয় আলাদা করে প্রশংসিত হয়েছে। সাম্প্রতিক সময়েও ‘স্ত্রী ২’, ‘মালিক’, ‘ভুল চুক মাফ’ ও ‘ভিকি বিদ্যা কা উহ ওয়ালা ভিডিও’র মতো ভিন্নধর্মী কাজে দেখা গেছে তাঁকে।
নিজের অভিনয় নিয়ে রাজকুমার বরাবরই নতুন কিছু করার কথা বলেন। তাঁর কাছে চরিত্রে সম্পূর্ণভাবে ডুবে যাওয়া মানসিক চাপের বিষয় নয়, বরং আনন্দের। কোনো একটি চরিত্রে দিনের পর দিন মনোযোগ দিয়ে কাজ করার পর যে ক্লান্তি আসে, সেটিকেও তিনি উপভোগ করেন। তবে ‘ওমের্তা’র মতো কিছু চরিত্র তাঁর ওপর গভীর প্রভাব ফেলেছিল বলেও জানিয়েছেন। একই সঙ্গে শৈল্পিক ও বাণিজ্যিক সিনেমার মধ্যে ভারসাম্য রাখার পক্ষেও তিনি। তাঁর বিশ্বাস, ভালো গল্প ও সৎভাবে করা কাজ দর্শকের সঙ্গে সংযোগ তৈরি করতে পারে।
আজকের অবস্থানে পৌঁছেও নিজের শিকড় ভুলে যাননি রাজকুমার রাও। তারকাখ্যাতির কারণে বিজ্ঞাপন বা ব্র্যান্ড বেছে নেওয়ার ক্ষেত্রেও তিনি সতর্ক থাকার কথা জানিয়েছেন। নিজের বিশ্বাসের সঙ্গে না মিললে বড় অঙ্কের অর্থ বা প্রচারের সুযোগ থাকলেও কোনো পণ্যের প্রচারে রাজি হন না। অতীতের সেই ১৮ রুপির দিন থেকে আজকের প্রতিষ্ঠিত অভিনেতা হয়ে ওঠার পথকে তিনি নিজের সবচেয়ে বড় অর্জন মনে করেন। তবে সাফল্যের এই সময়ে তাঁর একটি আক্ষেপও রয়েছে—মা-বাবা তাঁর এই পথচলার পুরোটা দেখে যেতে পারেননি। তাঁর ইচ্ছা, যদি জীবন আবার শুরু করার সুযোগ পান, তাহলে সেই যাত্রায় মা-বাবাকেও পাশে চান।




















