রিক অ্যালেনের জীবন বদলে যায় ১৯৮৪ সালের শেষ রাতে। তখন তার বয়স মাত্র ২১ বছর এবং তিনি জনপ্রিয় রক ব্যান্ড ডেফ লেপার্ডের ড্রামার হিসেবে ক্যারিয়ারের গুরুত্বপূর্ণ সময়ে ছিলেন। নতুন বছর শুরুর কয়েক ঘণ্টা আগে বান্ধবী মিরিয়াম বারেন্ডসেনকে সঙ্গে নিয়ে গাড়ি চালাচ্ছিলেন তিনি। দ্রুতগতিতে একটি গাড়িকে পাশ কাটানোর সময় নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ভয়াবহ দুর্ঘটনার শিকার হন অ্যালেন। গাড়ি থেকে ছিটকে পড়ার কারণে তাঁর বাঁ হাত শরীর থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। চিকিৎসকেরা হাতটি জোড়া লাগানোর চেষ্টা করলেও সংক্রমণের কারণে শেষ পর্যন্ত তা সম্ভব হয়নি।
রিক অ্যালেনের জন্য এই দুর্ঘটনা ছিল এক বিশাল ধাক্কা। কারণ তিনি তখন শুধু একজন ড্রামার নন, ডেফ লেপার্ডের গুরুত্বপূর্ণ সদস্য। তারও আগে ১৯৮৩ সালে ব্যান্ডটির ‘পাইরোম্যানিয়া’ অ্যালবাম ব্যাপক সাফল্য পেয়েছিল এবং যুক্তরাষ্ট্রে দলটিকে নতুন পরিচিতি এনে দিয়েছিল। এমন সময় ড্রামার এক হাত হারানোয় ব্যান্ডটির ভবিষ্যৎ নিয়েও প্রশ্ন তৈরি হয়। দুই হাত ছাড়া ড্রাম বাজানো কতটা সম্ভব, সেটিই হয়ে ওঠে বড় চ্যালেঞ্জ। এমনকি ব্যান্ডের প্রধান গায়ক জো এলিয়টও শুরুতে মনে করেছিলেন, অ্যালেনের ড্রামিং ক্যারিয়ার হয়তো এখানেই শেষ।
কিন্তু রিক অ্যালেন হাল ছাড়েননি। ডেফ লেপার্ড ছেড়ে দেওয়া কিংবা ড্রাম বাজানো বন্ধ করার পরিবর্তে তিনি এক হাত নিয়েই নতুন করে বাদ্যযন্ত্রটি শেখার সিদ্ধান্ত নেন। তার জন্য বিশেষভাবে তৈরি করা হয় একটি ড্রাম কিট, যেখানে কিছু শব্দ ও ড্রামের অংশ পায়ের সাহায্যে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব ছিল। এক হাতের সঙ্গে দুই পা ব্যবহার করে নতুন কৌশল আয়ত্ত করতে শুরু করেন তিনি। পুরোনো ড্রাম ফিল ও বাজানোর ধরনও বদলে ফেলতে হয়। দীর্ঘ অনুশীলন, মানসিক চাপ এবং শারীরিক সীমাবদ্ধতার মধ্যেও নিজের জন্য নতুন একটি বাজানোর পদ্ধতি তৈরি করেন অ্যালেন।
রিক অ্যালেনের এই লড়াইয়ে পাশে ছিলেন ডেফ লেপার্ডের সদস্য, পরিবার ও ভক্তরা। পরে তিনি নিজেই জানিয়েছেন, এমন একটা সময় এসেছিল যখন তাঁর মনে হয়েছিল তিনি আর পারবেন না। নিজেকে পরাজিত মনে হচ্ছিল। কিন্তু আশপাশের মানুষের উৎসাহ এবং নিজের অদম্য মানসিক শক্তি তাকে আবার চেষ্টা করতে সাহায্য করে। দুর্ঘটনার পর প্রায় ২০ মাস ধরে চলতে থাকে প্রস্তুতি। অবশেষে ১৯৮৬ সালের ১৬ আগস্ট ইংল্যান্ডের ক্যাসল ডনিংটনে অনুষ্ঠিত ‘মনস্টারস অব রক’ উৎসবে ডেফ লেপার্ডের সঙ্গে আবার মঞ্চে ওঠেন তিনি।
সেই মঞ্চে ফেরা ছিল রিক অ্যালেনের জীবনের অন্যতম স্মরণীয় মুহূর্ত। বাঁ হাত হারানোর পর সেটিই ছিল ব্যান্ডটির সঙ্গে তাঁর প্রথম বড় লাইভ পারফরম্যান্স। বিশেষভাবে তৈরি ড্রাম কিট ও নতুন কৌশল ব্যবহার করে আবারও দলের ছন্দের দায়িত্ব নেন তিনি। এরপর আর পেছনে তাকাতে হয়নি। ১৯৮৭ সালে ডেফ লেপার্ডের ‘হিস্টেরিয়া’ অ্যালবাম বিশ্বজুড়ে বিপুল সাফল্য পায়। ‘পাওর সাম সুগার অন মি’ ও ‘লাভ বাইটস’-এর মতো গান জনপ্রিয়তার শীর্ষে ওঠে। অ্যালবামটির বিক্রি এক কোটি কপি ছাড়িয়ে যায় বলে উল্লেখ করা হয়। ব্যান্ডটির দীর্ঘ সাফল্যের অংশ হিসেবেই পরবর্তী সময়ে অ্যালেনও নিজের জায়গা আরও শক্ত করেন।
রিক অ্যালেনের গল্প তাই শুধু একজন ড্রামারের দুর্ঘটনা কাটিয়ে ওঠার ঘটনা নয়, বরং সীমাবদ্ধতাকে নতুন সম্ভাবনায় বদলে দেওয়ার এক অনন্য উদাহরণ। ১৯৬৩ সালে ইংল্যান্ডে জন্ম নেওয়া অ্যালেন কিশোর বয়সেই ডেফ লেপার্ডে যোগ দেন। চার দশকের বেশি সময় ধরে ব্যান্ডটির সঙ্গে রয়েছেন তিনি। ২০১৯ সালে ডেফ লেপার্ড রক অ্যান্ড রোল হল অব ফেমে জায়গা করে নেয়। তবে রক সংগীতের ইতিহাসে অ্যালেনকে বিশেষভাবে মনে রাখা হয় তাঁর সেই অসম্ভব প্রত্যাবর্তনের জন্য। ১৯৮৬ সালের ১৬ আগস্ট মঞ্চে ফিরে তিনি দেখিয়েছিলেন, জীবনের বড় কোনো ক্ষতি স্বপ্নের শেষ হতে বাধ্য নয়। ইচ্ছাশক্তি, অনুশীলন আর সাহস থাকলে নতুন পথ তৈরি করা সম্ভব।
























