চীনা পর্যটক চট্টগ্রাম প্রসঙ্গ উঠলে সামনে আসে প্রাচীন এশিয়ার বিস্ময়কর যোগাযোগ ব্যবস্থার কথা। আজকের মতো আধুনিক যানবাহন না থাকলেও কয়েকশ বছর আগে মানুষ সমুদ্রপথে হাজার হাজার কিলোমিটার ভ্রমণ করত। সেই সময় বঙ্গোপসাগরের তীরবর্তী চট্টগ্রাম ছিল দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বন্দর। চট্টগ্রামের অবস্থান ছিল এমন এক জায়গায়, যা ভারত মহাসাগরীয় বাণিজ্য পথের সঙ্গে যুক্ত ছিল। আরব, পারস্য, চীন ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার ব্যবসায়ীরা এই অঞ্চলের সঙ্গে যোগাযোগ রাখতেন। ফলে চট্টগ্রাম শুধু একটি বন্দর নয়, বরং বিভিন্ন সংস্কৃতি ও সভ্যতার মিলনস্থল হয়ে উঠেছিল।
প্রাচীন চীনা পর্যটক ও পরিব্রাজকরা মূলত জ্ঞান, ধর্ম, সংস্কৃতি ও বাণিজ্যের উদ্দেশ্যে ভারতীয় উপমহাদেশে ভ্রমণ করতেন। তাদের অনেকেই সমুদ্রপথ ও স্থলপথ ব্যবহার করে দক্ষিণ এশিয়ার বিভিন্ন অঞ্চলে পৌঁছান। এসব ভ্রমণের বিবরণ থেকে সেই সময়ের আন্তর্জাতিক যোগাযোগ সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যায়। চীনা পরিব্রাজকদের মধ্যে ফা শিয়েন এবং হিউয়েন সাং ভারত ভ্রমণের জন্য বিখ্যাত। যদিও তাদের ভ্রমণপথের প্রতিটি ধাপে চট্টগ্রামের উল্লেখ পাওয়া যায় না, তবে তাদের ভ্রমণ বিবরণ প্রাচীন ভারত ও এশিয়ার যোগাযোগ ব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দেয়।
চট্টগ্রামের ইতিহাসে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো এর বন্দর। কর্ণফুলী নদীর মোহনায় অবস্থিত এই বন্দর প্রাচীনকাল থেকেই নৌযান চলাচলের জন্য উপযোগী ছিল। বিভিন্ন দেশের ব্যবসায়ীরা এখানে আসতেন পণ্য বিনিময় করতে। মসলা, কাপড়, মূল্যবান দ্রব্যসহ নানা পণ্যের বাণিজ্য চলত এই অঞ্চলে।সমুদ্রপথের কারণে চট্টগ্রাম ধীরে ধীরে আন্তর্জাতিক পরিচিতি লাভ করে। চীনের সঙ্গে সরাসরি বা পরোক্ষভাবে বাণিজ্যিক যোগাযোগ তৈরি হওয়ার পেছনে এই সমুদ্রপথ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। বিভিন্ন ঐতিহাসিক সূত্রে জানা যায়, বঙ্গ অঞ্চলের বন্দরগুলো এশিয়ার বড় বাণিজ্য নেটওয়ার্কের অংশ ছিল।
চট্টগ্রামের প্রাচীন পরিচয় শুধু বাণিজ্যের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না। এখানে বিভিন্ন সংস্কৃতির মানুষের আগমন ঘটেছে। বিভিন্ন জাতি ও দেশের মানুষের উপস্থিতি শহরের ভাষা, খাবার, স্থাপত্য ও জীবনধারায় প্রভাব ফেলেছে। মধ্যযুগে চট্টগ্রাম আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। সুলতানি আমল, মুঘল আমল এবং পরবর্তী সময়ে ইউরোপীয় বণিকদের আগমনের কারণে এই অঞ্চলের গুরুত্ব বৃদ্ধি পায়। পর্তুগিজ নাবিকদের কাছেও চট্টগ্রাম ছিল পরিচিত একটি বন্দর।
চীনা পর্যটকদের আগমন বা এশিয়ার বিভিন্ন দেশের সঙ্গে যোগাযোগের গল্প আমাদের মনে করিয়ে দেয়, চট্টগ্রাম কখনো বিচ্ছিন্ন কোনো শহর ছিল না। এটি ছিল এমন একটি অঞ্চল, যেখানে সমুদ্র মানুষকে একে অপরের কাছে নিয়ে এসেছে। বর্তমান সময়েও চট্টগ্রাম বাংলাদেশের অর্থনীতির অন্যতম প্রধান কেন্দ্র। দেশের প্রধান সমুদ্রবন্দর হিসেবে এর গুরুত্ব অনেক বেশি। অতীতের সেই বাণিজ্যিক ঐতিহ্য আজও আধুনিক চট্টগ্রামের পরিচয়ের অংশ।
ইতিহাসের পাতা ঘাঁটলে দেখা যায়, একটি শহরের পরিচয় শুধু তার বর্তমান দিয়ে তৈরি হয় না। শত শত বছর ধরে মানুষের যাতায়াত, সংস্কৃতির আদান-প্রদান এবং বাণিজ্যের মাধ্যমেই একটি শহরের ইতিহাস সমৃদ্ধ হয়। চট্টগ্রামের গল্প তাই শুধু একটি বন্দরের গল্প নয়, এটি মানুষের যোগাযোগ, ভ্রমণ এবং সভ্যতার মিলনের গল্প। প্রাচীন চীনা ভ্রমণকারীদের সঙ্গে সম্পর্কিত এই ইতিহাস আমাদের মনে করিয়ে দেয়, হাজার বছর আগেও পৃথিবীর মানুষ একে অপরের সঙ্গে যুক্ত ছিল।
চট্টগ্রামের এই ঐতিহাসিক গুরুত্ব ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে তুলে ধরা প্রয়োজন। কারণ একটি শহরের অতীত জানলেই বোঝা যায়, কীভাবে সেই শহর সময়ের সঙ্গে পরিবর্তিত হয়ে আজকের অবস্থানে এসেছে।


























