ফিফা নথি সংরক্ষণ ইস্যুতে নতুন করে উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে বিশ্ব ফুটবল প্রশাসন। বিশ্বকাপসহ বড় টুর্নামেন্টের বাণিজ্যিক স্বত্ব বেসরকারি বিনিয়োগকারীদের কাছে হস্তান্তরের পরিকল্পনা শেষ পর্যন্ত বাতিল করেছে ফিফা। তবে পরিকল্পনা বাতিল হলেও বিষয়টি এখানেই শেষ করতে রাজি নয় উয়েফা। ইউরোপের ফুটবলের নিয়ন্ত্রক সংস্থাটি মনে করছে, পুরো প্রক্রিয়া নিয়ে আরও স্বচ্ছতা প্রয়োজন এবং ভবিষ্যতের আইনি প্রক্রিয়ার জন্য সব নথি সংরক্ষণ করা জরুরি।
এই কারণেই ফিফা সভাপতি জিয়ান্নি ইনফান্তিনোর কাছে আনুষ্ঠানিক চিঠি পাঠিয়েছে উয়েফা। সেখানে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে, পরিকল্পনার সঙ্গে সম্পর্কিত কোনো কাগজপত্র, ই-মেইল, ডিজিটাল ফাইল বা ইলেকট্রনিক তথ্য যেন কোনোভাবেই মুছে ফেলা, পরিবর্তন করা বা ধ্বংস করা না হয়। সংস্থাটির মতে, তদন্ত বা আইনি প্রক্রিয়া শুরু হলে এসব নথিই গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। তাই সংশ্লিষ্ট সবাইকে প্রয়োজনীয় তথ্য নিরাপদে সংরক্ষণ করার নির্দেশ দেওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে।
উয়েফার দাবি, তারা শুধু সম্ভাব্য আইনি লড়াই নয়, প্রয়োজন হলে সালিসি বা নিয়ন্ত্রক সংস্থার কাছেও অভিযোগ জানাতে প্রস্তুত। তাই ইনফান্তিনোর পাশাপাশি ফিফার গ্লোবাল ফুটবল ডেভেলপমেন্ট প্রধান আর্সেন ওয়েঙ্গার, মহাসচিব ম্যাথিয়াস গ্রাফস্ট্রম, প্রধান পরিচালন কর্মকর্তা কেভিন লামোরসহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের তথ্য সংরক্ষণের বিষয়টি নিশ্চিত করতে বলা হয়েছে। একই ধরনের নোটিশ সম্ভাব্য বিনিয়োগকারী গোষ্ঠীর প্রতিনিধিদের কাছেও পাঠানো হয়েছে, যাতে পরবর্তীতে কোনো গুরুত্বপূর্ণ তথ্য হারিয়ে না যায়।
বিতর্কের সূত্রপাত হয়েছিল ‘ফিফা ফরোয়ার্ড এন্টারপ্রাইজ (এফএফই)’ নামে একটি স্বতন্ত্র কোম্পানি গঠনের পরিকল্পনা থেকে। ফিফার প্রস্তাব ছিল, এই প্রতিষ্ঠানের একটি অংশ বেসরকারি বিনিয়োগকারীদের কাছে ছেড়ে দিয়ে বিশ্বকাপসহ বড় টুর্নামেন্টের বাণিজ্যিক কার্যক্রম পরিচালনা করা হবে। ফিফার দাবি ছিল, এতে সংস্থার ২১১টি সদস্যদেশ আর্থিকভাবে লাভবান হবে। তবে উয়েফা, কনক্যাকাফ ও এশিয়ান ফুটবল কনফেডারেশন (এএফসি) শুরু থেকেই এই উদ্যোগের বিরোধিতা করে। তাদের মতে, বিশ্ব ফুটবলের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রতিযোগিতাগুলোর বাণিজ্যিক নিয়ন্ত্রণ বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের হাতে গেলে ফুটবলের স্বাধীনতা ও স্বচ্ছতা প্রশ্নের মুখে পড়তে পারে। সমালোচনার মুখে শেষ পর্যন্ত পরিকল্পনা বাতিল করতে বাধ্য হয় ফিফা।
এদিকে এই বিতর্ক রাজনৈতিক অঙ্গনেও প্রভাব ফেলেছে। যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী অ্যান্ডি বার্নহ্যাম আবারও বলেছেন, শুধু পরিকল্পনা বাতিল করলেই বিষয়টির সমাধান হয়ে যায় না। তাঁর মতে, এমন একটি সিদ্ধান্ত বিশ্ব ফুটবলে আস্থার সংকট তৈরি করেছে এবং এর জন্য জবাবদিহি প্রয়োজন। তিনি পুনরায় ফিফা সভাপতি জিয়ান্নি ইনফান্তিনোর পদত্যাগের দাবি জানিয়ে বলেন, বিশ্ব ফুটবলের নেতৃত্বে নতুন দৃষ্টিভঙ্গির প্রয়োজন রয়েছে। বার্নহ্যামের বক্তব্য ইতোমধ্যেই আন্তর্জাতিক ফুটবল অঙ্গনে নতুন বিতর্কের জন্ম দিয়েছে।
এখন সবার নজর ফিফার পরবর্তী পদক্ষেপের দিকে। সংস্থাটি এখন পর্যন্ত উয়েফার চিঠি নিয়ে আনুষ্ঠানিক কোনো মন্তব্য করেনি। তবে আইনি প্রক্রিয়া শুরু হলে বিশ্ব ফুটবলের প্রশাসনিক ইতিহাসে এটি বড় একটি অধ্যায় হয়ে উঠতে পারে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এই ঘটনার ফল শুধু ফিফা ও উয়েফার সম্পর্কেই সীমাবদ্ধ থাকবে না; ভবিষ্যতে বিশ্বকাপসহ আন্তর্জাতিক টুর্নামেন্টের বাণিজ্যিক কাঠামো নির্ধারণেও এর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব পড়তে পারে।
























