ঢাকা ০১:৩১ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ২২ জুলাই ২০২৬, ৬ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম :
Logo চট্টগ্রামে মাদক-চাঁদাবাজি দমনে সিএমপির কঠোর বার্তা Logo সোহরাওয়ার্দী মেডিক্যালে ঘুষের অভিযোগ, বরখাস্ত আনসার সদস্য Logo কাইলি হটলের মৃত্যু: সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণ হারালেন গডজিলা বনাম কং অভিনেত্রী Logo ঢাকা ব্যাংক চাকরি ২০২৬ | আবেদন শুরু এখনই | সম্পূর্ণ তথ্য Logo যুব আন্দোলনে চাপে মোদি সরকার? নতুন প্রশ্ন ভারতের রাজনীতিতে Logo নাদিমা মোহাম্মদীর ওপর হামলায় মহিলা পরিষদের ক্ষোভ Logo বাংলাদেশ সিরিজের জন্য শক্তিশালী দল ঘোষণা অস্ট্রেলিয়ার Logo বড় হয়েও মায়ের ওপর নির্ভরশীল? জানুন ‘মাদার কমপ্লেক্স’ Logo ইরান আলোচনায় মরিয়া? ট্রাম্পের বিস্ফোরক দাবি Logo বড় ধাক্কার পর মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের শক্তিশালী সমাবেশ | পশ্চিমবঙ্গ শহীদ দিবস ২০২৬

রাজবাড়ীর টেপ টেনিস ক্রিকেট থেকে মিরপুরের মঞ্চে মশিউর

মিরপুরে ব্যাট হাতে ঝড় তোলা রাজবাড়ীর তরুণ ক্রিকেটার মশিউর রহমান

বাংলাদেশের ক্রিকেট ইতিহাসে দেখা গেছে, জাতীয় দলের অনেক তারকার যাত্রা শুরু হয়েছে জেলা, উপজেলা কিংবা পাড়া-মহল্লার ছোট ছোট টুর্নামেন্ট থেকে। সীমিত সুযোগ-সুবিধা, অনুশীলনের অভাব এবং অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ সত্ত্বেও প্রতিভাবান অনেক ক্রিকেটার কঠোর পরিশ্রমের মাধ্যমে জাতীয় পর্যায়ে জায়গা করে নিয়েছেন। সেই ধারাবাহিকতায় নতুন সম্ভাবনার নাম হয়ে উঠছেন রাজবাড়ীর তরুণ ক্রিকেটার মশিউর রহমান।

তৃণমূল পর্যায়ের ক্রিকেটারদের খুঁজে বের করে বড় মঞ্চে তুলে ধরতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে নতুন কুঁড়ি স্পোর্টস। দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে প্রতিভাবান খেলোয়াড়দের বাছাই করে তাদের আধুনিক প্রশিক্ষণ, প্রতিযোগিতামূলক ম্যাচ এবং জাতীয় পর্যায়ে নিজেদের প্রমাণের সুযোগ দেওয়া হচ্ছে। ক্রিকেট বিশ্লেষকদের মতে, এ ধরনের উদ্যোগ নিয়মিত হলে জাতীয় দলের জন্য দীর্ঘমেয়াদে মানসম্পন্ন ক্রিকেটার তৈরি করা সহজ হবে।

মশিউরের ক্রিকেটজীবনের শুরুতে সবচেয়ে বড় অনুপ্রেরণা ছিলেন তার বড় ভাই। তিনিই প্রথম মশিউরের হাতে ব্যাট তুলে দেন এবং টেপ টেনিস ক্রিকেটের নিয়ম-কৌশল শেখান। পরিবারের সদস্যদের উৎসাহ এবং স্থানীয় বন্ধুদের সঙ্গে নিয়মিত খেলার মধ্য দিয়েই ক্রিকেটের মৌলিক বিষয়গুলো আয়ত্ত করেন তিনি।

স্থানীয় পর্যায়ে ধারাবাহিক ভালো পারফরম্যান্সের কারণে খুব অল্প সময়েই জেলা ক্রিকেটে সুযোগ পান মশিউর। বয়সভিত্তিক টুর্নামেন্ট, স্কুল ক্রিকেট এবং জেলা লিগে ধারাবাহিক রান করে তিনি কোচ ও নির্বাচকদের নজরে আসেন। বিশেষ করে চাপের মুহূর্তে দায়িত্ব নিয়ে ব্যাটিং করার ক্ষমতা তাকে আলাদা পরিচিতি এনে দেয়।

টি-টোয়েন্টি ধাঁচের ক্রিকেটে ৩৭ বলে ৯০ রান করা যে কোনো ব্যাটারের জন্যই অসাধারণ অর্জন। মশিউরের ইনিংসে ছিল ৮টি চার ও ৮টি ছক্কা। অর্থাৎ তিনি শুধু বাউন্ডারি থেকেই ৮০ রান সংগ্রহ করেন। তার এই আগ্রাসী ব্যাটিংয়ের ফলে ফরিদপুর অঞ্চল মাত্র ১০ ওভারে ১৩৬ রানের বড় সংগ্রহ গড়ে তোলে, যা প্রতিপক্ষের জন্য পাহাড়সম লক্ষ্য হয়ে দাঁড়ায়।

শুধু ব্যাট হাতে নয়, বল হাতেও নিজের কার্যকারিতা দেখিয়েছেন মশিউর। ম্যাচে ২২ রান দিয়ে ২ উইকেট নেওয়ার মাধ্যমে তিনি প্রমাণ করেছেন যে, তিনি একজন কার্যকর অলরাউন্ডার। আধুনিক ক্রিকেটে অলরাউন্ডারদের চাহিদা সবচেয়ে বেশি। তাই ধারাবাহিক পারফরম্যান্স ধরে রাখতে পারলে ভবিষ্যতে বয়সভিত্তিক জাতীয় দল কিংবা বাংলাদেশ টাইগার্সের মতো প্ল্যাটফর্মেও সুযোগ পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

মিরপুরের শের-ই-বাংলা জাতীয় ক্রিকেট স্টেডিয়াম শুধু বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের কেন্দ্রই নয়, এটি দেশের ক্রিকেটারদের জন্য নিজেকে প্রমাণ করার সবচেয়ে বড় মঞ্চগুলোর একটি। বয়সভিত্তিক টুর্নামেন্ট বা প্রতিভা অন্বেষণ কর্মসূচিতে এখানে ভালো পারফরম্যান্স করলে তা সরাসরি নির্বাচকদের নজরে আসে। তাই মশিউরের এই ইনিংস তার ক্রিকেট ক্যারিয়ারে গুরুত্বপূর্ণ মোড় হয়ে উঠতে পারে।

ক্রিকেট সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, নতুন কুঁড়ি স্পোর্টসের মতো প্রতিযোগিতায় ধারাবাহিকভাবে ভালো খেলতে পারলে মশিউর বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের (বিসিবি) বয়সভিত্তিক দলগুলোর নির্বাচকদের নজরে আসতে পারেন। অনূর্ধ্ব-১৭, অনূর্ধ্ব-১৯ কিংবা হাই পারফরম্যান্স (এইচপি) ইউনিটে জায়গা করে নেওয়ার জন্য এমন পারফরম্যান্স বড় ভূমিকা রাখে।

ম্যাচ শেষে মশিউর নিজেই জানিয়েছেন, তার বাবা-মা গ্যালারিতে উপস্থিত ছিলেন। পরিবারের সামনে এমন একটি ম্যাচজয়ী ইনিংস খেলতে পারা তার জন্য ছিল বিশেষ অনুভূতির। খেলাধুলায় পরিবারের সমর্থন একজন তরুণ খেলোয়াড়ের আত্মবিশ্বাস বাড়াতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে বলে মনে করেন ক্রীড়া মনোবিজ্ঞানীরা।

মশিউরের ব্যাটিংয়ের সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য হলো, তিনি শুরু থেকেই ইতিবাচক ক্রিকেট খেলতে পছন্দ করেন। তবে অযথা ঝুঁকি না নিয়ে পরিস্থিতি বুঝে শট নির্বাচন করেন। তার ৩৭ বলে ৯০ রানের ইনিংসেও দেখা গেছে, সুযোগ পেলেই বড় শট খেলেছেন, আবার প্রয়োজন হলে স্ট্রাইক ঘুরিয়েও খেলেছেন।

বর্তমান ক্রিকেটে শুধু ব্যাটসম্যান বা বোলার নয়, অলরাউন্ডারদের মূল্য সবচেয়ে বেশি। মশিউর সেই জায়গায় নিজেকে গড়ে তুলতে চাইছেন। মিডল অর্ডারে দ্রুত রান করার পাশাপাশি প্রয়োজনের সময় বল হাতেও দলকে সাফল্য এনে দিতে পারেন। এ ধরনের দক্ষতা তাকে ভবিষ্যতে আরও এগিয়ে নিতে পারে

রাজবাড়ীর টেপ টেনিস ক্রিকেট থেকে শুরু হওয়া মশিউরের যাত্রা এখন মিরপুরের আন্তর্জাতিক ভেন্যু পর্যন্ত পৌঁছেছে। তবে তার লক্ষ্য এখানেই শেষ নয়। জাতীয় দলে খেলা, দেশের হয়ে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে প্রতিনিধিত্ব করা এবং নিজের প্রিয় ক্রিকেটারদের মতো বড় মঞ্চে পারফর্ম করাই এখন তার নতুন স্বপ্ন।

কোচদের মতে, প্রতিভা থাকলেই সফল হওয়া যায় না। আন্তর্জাতিক পর্যায়ে যেতে হলে নিয়মিত ফিটনেস ট্রেনিং, সঠিক খাদ্যাভ্যাস, মানসিক দৃঢ়তা এবং টেকনিক্যাল অনুশীলনের বিকল্প নেই। মশিউরও এখন নিজের ফিটনেস ও দক্ষতা উন্নয়নে আরও বেশি মনোযোগ দিচ্ছেন।

মশিউর জানিয়েছেন, দেশের ক্রিকেটারদের মধ্যে লিটন দাস ও মুশফিকুর রহিমের ব্যাটিং তাকে সবচেয়ে বেশি অনুপ্রাণিত করে। লিটনের টাইমিং, শট নির্বাচন এবং মুশফিকের লড়াকু মানসিকতা নিজের খেলায় আনার চেষ্টা করেন তিনি। আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে নিউজিল্যান্ডের সাবেক অধিনায়ক কেইন উইলিয়ামসনের শান্ত স্বভাব ও দায়িত্বশীল ব্যাটিং তার কাছে আদর্শ।

একটি ম্যাচে দুর্দান্ত পারফরম্যান্স অবশ্যই আলোচনায় আনে, তবে জাতীয় পর্যায়ে জায়গা পেতে হলে ধারাবাহিকতা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। সামনে আরও কয়েকটি ম্যাচে ভালো পারফরম্যান্স করতে পারলে মশিউরের জন্য বয়সভিত্তিক জাতীয় দল, বাংলাদেশ টাইগার্স বা বিসিবির হাই পারফরম্যান্স ইউনিটের দরজা খুলে যেতে পারে।

ফরিদপুর জেলা দলের কোচ তানভীর আহমেদ রাজিবের মতে, মশিউরের সবচেয়ে বড় শক্তি হলো চাপের মধ্যে স্বাভাবিকভাবে খেলার মানসিকতা। নিয়মিত অনুশীলন, সঠিক পরিচর্যা এবং উন্নত কোচিং পেলে তিনি বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ ক্রিকেটে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারেন। তার মতো প্রতিভাবান ক্রিকেটারদের যথাযথ পরিচর্যা করা গেলে জাতীয় দল আরও শক্তিশালী হবে বলেও মনে করেন তিনি।

ক্রীড়া বিশ্লেষকদের মতে, বাংলাদেশের ক্রিকেটের ভবিষ্যৎ আরও শক্তিশালী করতে হলে তৃণমূল পর্যায়ে বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে নিয়মিত প্রতিযোগিতা, দক্ষ কোচ নিয়োগ, উন্নত অনুশীলন সুবিধা এবং প্রতিভা অন্বেষণ কার্যক্রম বাড়ানো গেলে মশিউরের মতো আরও অনেক ক্রিকেটার উঠে আসবেন।

মশিউরের সামনে এখন নতুন চ্যালেঞ্জ। রাজবাড়ীর ছোট্ট মাঠ থেকে মিরপুর পর্যন্ত আসার স্বপ্ন তিনি পূরণ করেছেন। এবার তার লক্ষ্য বাংলাদেশের জাতীয় দলের জার্সি গায়ে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে দেশের প্রতিনিধিত্ব করা। নিজের পরিশ্রম, পরিবারের সমর্থন এবং কোচদের দিকনির্দেশনা ধরে রাখতে পারলে সেই স্বপ্ন বাস্তবেও রূপ নিতে পারে।

জনপ্রিয় সংবাদ

চট্টগ্রামে মাদক-চাঁদাবাজি দমনে সিএমপির কঠোর বার্তা

রাজবাড়ীর টেপ টেনিস ক্রিকেট থেকে মিরপুরের মঞ্চে মশিউর

Update Time : ১০:৩৮:০৪ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ২১ জুলাই ২০২৬

বাংলাদেশের ক্রিকেট ইতিহাসে দেখা গেছে, জাতীয় দলের অনেক তারকার যাত্রা শুরু হয়েছে জেলা, উপজেলা কিংবা পাড়া-মহল্লার ছোট ছোট টুর্নামেন্ট থেকে। সীমিত সুযোগ-সুবিধা, অনুশীলনের অভাব এবং অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ সত্ত্বেও প্রতিভাবান অনেক ক্রিকেটার কঠোর পরিশ্রমের মাধ্যমে জাতীয় পর্যায়ে জায়গা করে নিয়েছেন। সেই ধারাবাহিকতায় নতুন সম্ভাবনার নাম হয়ে উঠছেন রাজবাড়ীর তরুণ ক্রিকেটার মশিউর রহমান।

তৃণমূল পর্যায়ের ক্রিকেটারদের খুঁজে বের করে বড় মঞ্চে তুলে ধরতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে নতুন কুঁড়ি স্পোর্টস। দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে প্রতিভাবান খেলোয়াড়দের বাছাই করে তাদের আধুনিক প্রশিক্ষণ, প্রতিযোগিতামূলক ম্যাচ এবং জাতীয় পর্যায়ে নিজেদের প্রমাণের সুযোগ দেওয়া হচ্ছে। ক্রিকেট বিশ্লেষকদের মতে, এ ধরনের উদ্যোগ নিয়মিত হলে জাতীয় দলের জন্য দীর্ঘমেয়াদে মানসম্পন্ন ক্রিকেটার তৈরি করা সহজ হবে।

মশিউরের ক্রিকেটজীবনের শুরুতে সবচেয়ে বড় অনুপ্রেরণা ছিলেন তার বড় ভাই। তিনিই প্রথম মশিউরের হাতে ব্যাট তুলে দেন এবং টেপ টেনিস ক্রিকেটের নিয়ম-কৌশল শেখান। পরিবারের সদস্যদের উৎসাহ এবং স্থানীয় বন্ধুদের সঙ্গে নিয়মিত খেলার মধ্য দিয়েই ক্রিকেটের মৌলিক বিষয়গুলো আয়ত্ত করেন তিনি।

স্থানীয় পর্যায়ে ধারাবাহিক ভালো পারফরম্যান্সের কারণে খুব অল্প সময়েই জেলা ক্রিকেটে সুযোগ পান মশিউর। বয়সভিত্তিক টুর্নামেন্ট, স্কুল ক্রিকেট এবং জেলা লিগে ধারাবাহিক রান করে তিনি কোচ ও নির্বাচকদের নজরে আসেন। বিশেষ করে চাপের মুহূর্তে দায়িত্ব নিয়ে ব্যাটিং করার ক্ষমতা তাকে আলাদা পরিচিতি এনে দেয়।

টি-টোয়েন্টি ধাঁচের ক্রিকেটে ৩৭ বলে ৯০ রান করা যে কোনো ব্যাটারের জন্যই অসাধারণ অর্জন। মশিউরের ইনিংসে ছিল ৮টি চার ও ৮টি ছক্কা। অর্থাৎ তিনি শুধু বাউন্ডারি থেকেই ৮০ রান সংগ্রহ করেন। তার এই আগ্রাসী ব্যাটিংয়ের ফলে ফরিদপুর অঞ্চল মাত্র ১০ ওভারে ১৩৬ রানের বড় সংগ্রহ গড়ে তোলে, যা প্রতিপক্ষের জন্য পাহাড়সম লক্ষ্য হয়ে দাঁড়ায়।

আরও পড়ুন  ২১ বছর আগের সেই গোল, মিশরের বিপক্ষে মেসির মহাকাব্যের শুরু

শুধু ব্যাট হাতে নয়, বল হাতেও নিজের কার্যকারিতা দেখিয়েছেন মশিউর। ম্যাচে ২২ রান দিয়ে ২ উইকেট নেওয়ার মাধ্যমে তিনি প্রমাণ করেছেন যে, তিনি একজন কার্যকর অলরাউন্ডার। আধুনিক ক্রিকেটে অলরাউন্ডারদের চাহিদা সবচেয়ে বেশি। তাই ধারাবাহিক পারফরম্যান্স ধরে রাখতে পারলে ভবিষ্যতে বয়সভিত্তিক জাতীয় দল কিংবা বাংলাদেশ টাইগার্সের মতো প্ল্যাটফর্মেও সুযোগ পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

মিরপুরের শের-ই-বাংলা জাতীয় ক্রিকেট স্টেডিয়াম শুধু বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের কেন্দ্রই নয়, এটি দেশের ক্রিকেটারদের জন্য নিজেকে প্রমাণ করার সবচেয়ে বড় মঞ্চগুলোর একটি। বয়সভিত্তিক টুর্নামেন্ট বা প্রতিভা অন্বেষণ কর্মসূচিতে এখানে ভালো পারফরম্যান্স করলে তা সরাসরি নির্বাচকদের নজরে আসে। তাই মশিউরের এই ইনিংস তার ক্রিকেট ক্যারিয়ারে গুরুত্বপূর্ণ মোড় হয়ে উঠতে পারে।

ক্রিকেট সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, নতুন কুঁড়ি স্পোর্টসের মতো প্রতিযোগিতায় ধারাবাহিকভাবে ভালো খেলতে পারলে মশিউর বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের (বিসিবি) বয়সভিত্তিক দলগুলোর নির্বাচকদের নজরে আসতে পারেন। অনূর্ধ্ব-১৭, অনূর্ধ্ব-১৯ কিংবা হাই পারফরম্যান্স (এইচপি) ইউনিটে জায়গা করে নেওয়ার জন্য এমন পারফরম্যান্স বড় ভূমিকা রাখে।

ম্যাচ শেষে মশিউর নিজেই জানিয়েছেন, তার বাবা-মা গ্যালারিতে উপস্থিত ছিলেন। পরিবারের সামনে এমন একটি ম্যাচজয়ী ইনিংস খেলতে পারা তার জন্য ছিল বিশেষ অনুভূতির। খেলাধুলায় পরিবারের সমর্থন একজন তরুণ খেলোয়াড়ের আত্মবিশ্বাস বাড়াতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে বলে মনে করেন ক্রীড়া মনোবিজ্ঞানীরা।

আরও পড়ুন  বিশ্বকাপে বদলি নেমে ভাগ্য বদলে দিচ্ছেন তাঁরা

মশিউরের ব্যাটিংয়ের সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য হলো, তিনি শুরু থেকেই ইতিবাচক ক্রিকেট খেলতে পছন্দ করেন। তবে অযথা ঝুঁকি না নিয়ে পরিস্থিতি বুঝে শট নির্বাচন করেন। তার ৩৭ বলে ৯০ রানের ইনিংসেও দেখা গেছে, সুযোগ পেলেই বড় শট খেলেছেন, আবার প্রয়োজন হলে স্ট্রাইক ঘুরিয়েও খেলেছেন।

বর্তমান ক্রিকেটে শুধু ব্যাটসম্যান বা বোলার নয়, অলরাউন্ডারদের মূল্য সবচেয়ে বেশি। মশিউর সেই জায়গায় নিজেকে গড়ে তুলতে চাইছেন। মিডল অর্ডারে দ্রুত রান করার পাশাপাশি প্রয়োজনের সময় বল হাতেও দলকে সাফল্য এনে দিতে পারেন। এ ধরনের দক্ষতা তাকে ভবিষ্যতে আরও এগিয়ে নিতে পারে

রাজবাড়ীর টেপ টেনিস ক্রিকেট থেকে শুরু হওয়া মশিউরের যাত্রা এখন মিরপুরের আন্তর্জাতিক ভেন্যু পর্যন্ত পৌঁছেছে। তবে তার লক্ষ্য এখানেই শেষ নয়। জাতীয় দলে খেলা, দেশের হয়ে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে প্রতিনিধিত্ব করা এবং নিজের প্রিয় ক্রিকেটারদের মতো বড় মঞ্চে পারফর্ম করাই এখন তার নতুন স্বপ্ন।

কোচদের মতে, প্রতিভা থাকলেই সফল হওয়া যায় না। আন্তর্জাতিক পর্যায়ে যেতে হলে নিয়মিত ফিটনেস ট্রেনিং, সঠিক খাদ্যাভ্যাস, মানসিক দৃঢ়তা এবং টেকনিক্যাল অনুশীলনের বিকল্প নেই। মশিউরও এখন নিজের ফিটনেস ও দক্ষতা উন্নয়নে আরও বেশি মনোযোগ দিচ্ছেন।

মশিউর জানিয়েছেন, দেশের ক্রিকেটারদের মধ্যে লিটন দাস ও মুশফিকুর রহিমের ব্যাটিং তাকে সবচেয়ে বেশি অনুপ্রাণিত করে। লিটনের টাইমিং, শট নির্বাচন এবং মুশফিকের লড়াকু মানসিকতা নিজের খেলায় আনার চেষ্টা করেন তিনি। আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে নিউজিল্যান্ডের সাবেক অধিনায়ক কেইন উইলিয়ামসনের শান্ত স্বভাব ও দায়িত্বশীল ব্যাটিং তার কাছে আদর্শ।

আরও পড়ুন  মেসির বার্তা: শক্তিশালী আর্জেন্টিনাকে হারানো হবে বড় চ্যালেঞ্জ

একটি ম্যাচে দুর্দান্ত পারফরম্যান্স অবশ্যই আলোচনায় আনে, তবে জাতীয় পর্যায়ে জায়গা পেতে হলে ধারাবাহিকতা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। সামনে আরও কয়েকটি ম্যাচে ভালো পারফরম্যান্স করতে পারলে মশিউরের জন্য বয়সভিত্তিক জাতীয় দল, বাংলাদেশ টাইগার্স বা বিসিবির হাই পারফরম্যান্স ইউনিটের দরজা খুলে যেতে পারে।

ফরিদপুর জেলা দলের কোচ তানভীর আহমেদ রাজিবের মতে, মশিউরের সবচেয়ে বড় শক্তি হলো চাপের মধ্যে স্বাভাবিকভাবে খেলার মানসিকতা। নিয়মিত অনুশীলন, সঠিক পরিচর্যা এবং উন্নত কোচিং পেলে তিনি বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ ক্রিকেটে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারেন। তার মতো প্রতিভাবান ক্রিকেটারদের যথাযথ পরিচর্যা করা গেলে জাতীয় দল আরও শক্তিশালী হবে বলেও মনে করেন তিনি।

ক্রীড়া বিশ্লেষকদের মতে, বাংলাদেশের ক্রিকেটের ভবিষ্যৎ আরও শক্তিশালী করতে হলে তৃণমূল পর্যায়ে বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে নিয়মিত প্রতিযোগিতা, দক্ষ কোচ নিয়োগ, উন্নত অনুশীলন সুবিধা এবং প্রতিভা অন্বেষণ কার্যক্রম বাড়ানো গেলে মশিউরের মতো আরও অনেক ক্রিকেটার উঠে আসবেন।

মশিউরের সামনে এখন নতুন চ্যালেঞ্জ। রাজবাড়ীর ছোট্ট মাঠ থেকে মিরপুর পর্যন্ত আসার স্বপ্ন তিনি পূরণ করেছেন। এবার তার লক্ষ্য বাংলাদেশের জাতীয় দলের জার্সি গায়ে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে দেশের প্রতিনিধিত্ব করা। নিজের পরিশ্রম, পরিবারের সমর্থন এবং কোচদের দিকনির্দেশনা ধরে রাখতে পারলে সেই স্বপ্ন বাস্তবেও রূপ নিতে পারে।