সাহাদুল হকের মৃত্যু ঘিরে নতুন করে আলোচনায় এসেছে চার বছর আগে তাঁর ডায়েরিতে লেখা একটি ‘হলফনামা’। রাজশাহীর পুঠিয়ার বানেশ্বর ইসলামিয়া উচ্চবিদ্যালয়ের এই শিক্ষক গত সোমবার রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান। তাঁর মৃত্যুর পর ডায়েরির ওই লেখা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে বিষয়টি নিয়ে শিক্ষার্থী ও স্থানীয়দের মধ্যে ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়।
২০২২ সালের ২৭ জুলাই ডায়েরির পাতায় ‘হলফনামা’ শিরোনামে নিজের সম্ভাব্য মৃত্যুর বিষয়ে কিছু কথা লিখেছিলেন সাহাদুল হক। সেখানে তিনি ডায়াবেটিস বেড়ে যাওয়া, স্ট্রোক, হার্ট অ্যাটাকসহ বিভিন্ন কারণে তাঁর মৃত্যু হলে বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক আজাদ আলী ও তাঁর পরিবারকে দায়ী করেন বলে জানা গেছে। কোনো সহকারী শিক্ষক প্রধান শিক্ষকের সঙ্গে জড়িত থাকলে তাকেও দায়ী করার কথা লেখায় উল্লেখ করা হয়। তবে ওই লেখার আইনগত অবস্থান বা মৃত্যুর সঙ্গে এর সরাসরি সম্পর্ক তদন্ত ছাড়া নিশ্চিত করা যায় না।
সাহাদুল হকের মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়ার পর বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা বিষয়টি নিয়ে বিক্ষোভ শুরু করে। বুধবার সকাল ১০টা থেকে দুপুর ১২টা পর্যন্ত তারা বিদ্যালয়ে অবস্থান করে। পরে বানেশ্বর বাজার এলাকায় ঢাকা-রাজশাহী মহাসড়ক অবরোধ করে। প্রায় ৩০ মিনিট যান চলাচল বন্ধ থাকার পর স্থানীয় প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর আশ্বাসে শিক্ষার্থীরা অবরোধ তুলে নেয়। তারা দ্রুত নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি জানিয়েছে।
দশম শ্রেণির শিক্ষার্থী সাব্বিরের ভাষ্য, সাহাদুল হক শিক্ষার্থীদের কাছে অত্যন্ত প্রিয় শিক্ষক ছিলেন। তাঁকে মানসিকভাবে নির্যাতন করা হচ্ছিল বলে শিক্ষার্থীরা আগে থেকেই শুনছিল বলে দাবি করে সে। শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, মৃত্যুর আগে ডায়েরিতে প্রধান শিক্ষকের নাম উল্লেখ করে যাওয়ার বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে তদন্ত করা প্রয়োজন। তারা ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত এবং অভিযুক্ত প্রধান শিক্ষকের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছে।
অন্যদিকে সাহাদুল হকের স্ত্রী শারমিন আক্তার অভিযোগ করেন, বিদ্যালয় থেকে ফেরার পর তাঁর স্বামী অনেক সময় মানসিকভাবে বিপর্যস্ত থাকতেন। প্রধান শিক্ষক তাঁকে মানসিক চাপ দিতেন এবং অফিসে ডেকে গালাগালি করা হতো বলেও তিনি দাবি করেন। অসুস্থতার সময় ছুটি না দেওয়ার অভিযোগও করেছেন তিনি। তবে এসব অভিযোগের স্বাধীন সত্যতা এখনো তদন্তের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত হয়নি। হাসপাতালের ডেথ রেজিস্টারে সাহাদুল হকের মৃত্যুর কারণ হিসেবে ‘কার্ডিওরেসপাইরেটরি ফেইলিয়র’ উল্লেখ করা হয়েছে।
ঘটনা নিয়ে প্রধান শিক্ষক আজাদ আলীর বক্তব্য জানতে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন ধরেননি। বিদ্যালয়ের ব্যবস্থাপনা কমিটির সভাপতি মাহবুব সরকার অবশ্য মানসিক নির্যাতনের অভিযোগকে আপেক্ষিক বলে মন্তব্য করেছেন। তাঁর দাবি, প্রতিষ্ঠান পরিচালনার সময় শিক্ষকদের বিভিন্ন বিষয়ে কথা বলতে হয়, তবে সেটিকে নিপীড়ন বলা যায় না। তিনি আরও জানান, সাহাদুল হকের পরিবারের সঙ্গে তাঁদের কথা হয়েছে এবং পরিবারের পক্ষ থেকে কোনো অভিযোগ করা হয়নি। মৃত শিক্ষকের পাওনা দ্রুত পরিশোধের উদ্যোগ নেওয়া হবে বলেও জানান তিনি। এখন চার বছর আগের ওই ডায়েরির লেখা, শিক্ষার্থীদের অভিযোগ ও পরিবারের বক্তব্য—সবকিছু মিলিয়ে ঘটনাটির প্রকৃত কারণ জানতে নিরপেক্ষ তদন্তের দিকেই তাকিয়ে আছেন সংশ্লিষ্টরা।


























