নাজমুল হোসেন এখনই ফলাফলের হিসাব কষতে রাজি নন। ডারউইন টেস্টে অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে বাংলাদেশ এমন এক অবস্থানে পৌঁছেছে, যেখানে জয়ের সম্ভাবনা নিয়ে স্বাভাবিকভাবেই আলোচনা শুরু হয়েছে। তবে অধিনায়কের ভাবনায় আপাতত জয়-পরাজয় নয়, বরং একেকটি সেশন এবং নির্দিষ্ট পরিকল্পনা। অস্ট্রেলিয়ার হাতে এখনো ছয় উইকেট আছে। বাংলাদেশকে আবার ব্যাটিংয়ে পাঠাতে তাদের করতে হবে আরও ৬৬ রান। তাই ম্যাচটি যে বাংলাদেশের নিয়ন্ত্রণে, সেটি বলার মতো অবস্থায় এলেও নাজমুল দলকে বাড়তি চাপ দিতে চাইছেন না। তাঁর কাছে আপাতত সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজ হলো পরিকল্পনা অনুযায়ী বোলিং করে অস্ট্রেলিয়ার বাকি উইকেটগুলো তুলে নেওয়া।
নাজমুল হোসেনের এই মানসিকতার পেছনে অবশ্যই ম্যাচের পরিস্থিতি বড় কারণ। ২৩ বছর পর অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে টেস্ট খেলতে এসে বাংলাদেশ এমন জায়গায় থাকবে—সিরিজ শুরুর আগে খুব কম মানুষই হয়তো তা ভেবেছিলেন। সর্বশেষ ২০০৩ সালের সফরে দুই ম্যাচেই ইনিংস ব্যবধানে হেরেছিল বাংলাদেশ। এবার সেই একই অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে ডারউইনে ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার সুযোগ তৈরি হয়েছে। র্যাঙ্কিংয়ের পার্থক্যও বিশাল। অস্ট্রেলিয়া টেস্ট র্যাঙ্কিংয়ের শীর্ষ দল, আর বাংলাদেশ রয়েছে নবম স্থানে। ফলে এই ম্যাচে বাংলাদেশ জিততে পারলে সেটি শুধু একটি জয় হবে না, দেশের টেস্ট ক্রিকেটের জন্যও বড় অর্জন হয়ে থাকবে।
ম্যাচের এমন গুরুত্বপূর্ণ সময়ে দলের ড্রেসিংরুমের পরিবেশ কেমন, সেই প্রশ্নটিই নাজমুলকে করেছিলেন অস্ট্রেলিয়ার কিংবদন্তি অ্যাডাম গিলক্রিস্ট। ধারাভাষ্যকার হিসেবে ম্যাচে থাকা গিলক্রিস্ট জানতে চেয়েছিলেন, এমন অবস্থায় বাংলাদেশ কি ফলাফলের কথা ভাবছে? জবাবে নাজমুল পরিষ্কার করে দিয়েছেন, দলের চিন্তা এখন অনেক বেশি বাস্তবভিত্তিক। তাঁরা পুরো ম্যাচ একসঙ্গে না দেখে সেশন ধরে এগোচ্ছেন। অর্থাৎ, একবারে বড় লক্ষ্য সামনে রেখে চাপ বাড়ানোর বদলে প্রতিটি পর্বে একটি নির্দিষ্ট কাজ শেষ করাই দলের পরিকল্পনা।
এই কৌশল টেস্ট ক্রিকেটে নতুন কিছু নয়, কিন্তু বাংলাদেশের মতো দলের জন্য এর গুরুত্ব অনেক বেশি। অস্ট্রেলিয়ার মতো শক্তিশালী দলের বিপক্ষে শেষ মুহূর্তে অতিরিক্ত উত্তেজনা বা ফলাফল নিয়ে আগেভাগে ভাবা বিপদ ডেকে আনতে পারে। তাই বোলারদের সামনে আপাতত একটাই লক্ষ্য—সঠিক জায়গায় বল করা এবং সুযোগ তৈরি করে উইকেট নেওয়া। নাজমুলের কথায়, দলের পরিকল্পনাও সেটিই ছিল। বোলাররা কঠিন পরিস্থিতিতে যেভাবে নিজেদের দায়িত্ব পালন করেছেন, তাতে অধিনায়ক সন্তুষ্ট। বিশেষ করে ম্যাচের এই পর্যায়ে বোলারদের নিয়ন্ত্রিত পারফরম্যান্সই বাংলাদেশের বড় শক্তি হয়ে উঠেছে।
বাংলাদেশের শক্ত অবস্থানের পেছনে অবশ্য শুধু বোলারদের অবদান নেই। প্রথম ইনিংসে দলের ব্যাটিংও ম্যাচের গতিপথ বদলে দিয়েছে। ৩০৬ রানে বাংলাদেশের ষষ্ঠ উইকেট পড়ে যাওয়ার পর পরিস্থিতি খুব একটা স্বস্তিদায়ক ছিল না। লিটন দাস ফিরে যাওয়ার পর স্বীকৃত ব্যাটসম্যানদের মধ্যে আর কেউ ছিল না। সেখান থেকে বড় স্কোর গড়া কঠিন বলেই মনে হচ্ছিল। কিন্তু শেষ পর্যন্ত বাংলাদেশের লোয়ার অর্ডার ব্যাটসম্যানরা সেই ধারণা বদলে দেন। শেষ চার উইকেটে যোগ হয় আরও ১২০ রান। এর ফলে প্রথম ইনিংসেই অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে দুই শর বেশি রানের লিড নেওয়ার সুযোগ তৈরি হয়।
নাজমাল হোসেন বিশেষভাবে প্রশংসা করেছেন দলের লোয়ার-মিডল অর্ডার ও টেলএন্ডারদের। তাঁর মতে, এই জায়গাটিতে উন্নতি আনার জন্য বাংলাদেশ গত দুই-তিন বছর ধরেই কাজ করছে। অনুশীলনে শুধু মূল ব্যাটসম্যানদের নয়, বোলারদের ব্যাটিংয়েও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। ডারউইনে সেই পরিশ্রমের ফলই দেখা গেছে। শেষের দিকের ব্যাটসম্যানরা উইকেটে টিকে থেকে প্রয়োজনীয় রান যোগ করেছেন এবং দলের অবস্থান শক্ত করেছেন। টেস্ট ক্রিকেটে এমন অবদান অনেক সময় ম্যাচের ফল নির্ধারণে বড় ভূমিকা রাখে।
এই পারফরম্যান্স বাংলাদেশের জন্য আরও তাৎপর্যপূর্ণ, কারণ টেস্ট ক্রিকেটে লোয়ার অর্ডারের রান প্রায়ই ম্যাচের ব্যবধান তৈরি করে। প্রতিপক্ষ যখন ধরে নেয় যে মূল ব্যাটিং লাইনআপ শেষ, তখন বোলারদের কাছ থেকে রান পাওয়া তাদের পরিকল্পনাকে কঠিন করে দেয়। বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও সেটিই হয়েছে। শেষ চার উইকেটে ১২০ রান যোগ হওয়ায় অস্ট্রেলিয়ার সামনে বড় লক্ষ্য দাঁড়িয়েছে এবং বাংলাদেশের বোলারদের হাতে ম্যাচে প্রভাব বিস্তারের সুযোগ এসেছে।
এখন অবশ্য সব নজর বাংলাদেশের বোলারদের দিকে। অস্ট্রেলিয়ার হাতে ছয় উইকেট থাকলেও বাংলাদেশকে আবার ব্যাটিংয়ে পাঠাতে তাদের আরও ৬৬ রান করতে হবে। অর্থাৎ, স্বাগতিকদের দ্রুত আটকে দিতে পারলে বাংলাদেশের সামনে জয়ের দরজা আরও খুলে যাবে। তবে নাজমুল হোসেনের পরিকল্পনায় কোনো তাড়াহুড়ো নেই। তিনি জানেন, টেস্ট ম্যাচে একটি সেশনও পুরো পরিস্থিতি বদলে দিতে পারে। তাই প্রতিটি বল, প্রতিটি ওভার এবং প্রতিটি উইকেটের গুরুত্ব ধরে এগোতে চাইছে দল।
নাজমুল হোসেনের বক্তব্যে আরও একটি বিষয় স্পষ্ট—বাংলাদেশ এখন শুধু ফলাফলের দিকে তাকিয়ে নেই, নিজেদের প্রক্রিয়ার ওপরও বিশ্বাস রাখতে চাইছে। অস্ট্রেলিয়ার মতো দলের বিপক্ষে ভালো অবস্থানে থাকার পরও অধিনায়ক খেলোয়াড়দের শান্ত রাখতে চাইছেন। এই মানসিকতা ম্যাচের শেষ পর্যায়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। কারণ জয় যত কাছাকাছি আসে, চাপও তত বাড়ে। সেই চাপ সামলে পরিকল্পনা অনুযায়ী খেলতে পারলেই বাংলাদেশ ইতিহাসের অন্যতম স্মরণীয় টেস্ট জয় পেতে পারে।
ডারউইনের এই ম্যাচ তাই শুধু একটি টেস্ট নয়, বাংলাদেশের জন্য নিজেদের সামর্থ্য দেখানোরও বড় মঞ্চ। ২৩ বছর পর অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে ফিরে এসে এমন প্রতিদ্বন্দ্বিতা তৈরি করা নিঃসন্দেহে দলের আত্মবিশ্বাস বাড়াবে। এখন দরকার শেষ পর্যন্ত একই মনোযোগ ধরে রাখা। ফলাফল নিয়ে ভাবার সময় হয়তো পরে আসবে। আপাতত নাজমুল হোসেনের বার্তা খুব সহজ—সেশন ধরে এগোতে হবে, পরিকল্পনা মেনে খেলতে হবে এবং সুযোগ পেলেই অস্ট্রেলিয়ার উইকেট তুলে নিতে হবে।


























