মাজারের দানবাক্স খুলতেই বেরিয়ে এসেছে শুধু টাকা নয়, মানুষের মনের নানা কথাও। সিলেটের হজরত শাহজালাল (রহ.)-এর মাজারে শনিবার সকালে নতুন করে স্থাপন করা দানবাক্স খোলা হয়। সেখানে দেশি-বিদেশি মুদ্রার পাশাপাশি পাওয়া গেছে কয়েকটি চিঠি। চিঠিগুলোতে কেউ ব্যক্তিগত দুঃখ-কষ্টের কথা লিখেছেন, কেউ নিজের ইচ্ছার কথা জানিয়েছেন, আবার কেউ করেছেন বিশেষ প্রার্থনা। মাজার কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, দানবাক্সে এমন চিঠি পাওয়া নতুন কোনো ঘটনা নয়। প্রায় প্রতিবারই টাকা-পয়সার সঙ্গে মানুষের লেখা চিরকুট পাওয়া যায়।
এর মধ্যে হেনা নামের এক নারীর লেখা একটি চিঠি বিশেষভাবে নজরে এসেছে। চিঠিতে তিনি তাঁর স্বামীকে মাদকসহ বিভিন্ন ধরনের ক্ষতিকর কর্মকাণ্ড থেকে দূরে রাখার জন্য প্রার্থনা করেছেন। পাশাপাশি যাঁরা তাঁর স্বামীকে বিপথে নিয়েছেন, তাঁদের বিচার ও হেদায়েত কামনা করেছেন তিনি। নিজের কষ্টের কথা জানিয়ে ওই নারী লিখেছেন, পৃথিবী থেকে মাদকদ্রব্য যেন দূর হয়ে যায়। চিঠির ভাষায় ব্যক্তিগত জীবনের কষ্টের পাশাপাশি সমাজের একটি বড় সমস্যার কথাও উঠে এসেছে। মাজারে আসা মানুষের কাছে দান শুধু অর্থ দেওয়ার বিষয় নয়, অনেকের কাছে এটি নিজের মনের কথা প্রকাশেরও একটি মাধ্যম।
মাজারের দানবাক্সে পাওয়া আরেকটি চিঠিতেও ছিল ব্যক্তিগত প্রার্থনা। সেখানে জুলাই গণ–অভ্যুত্থানের পর দেশ ছেড়ে যাওয়া শেখ হাসিনার সুস্থতা ও দীর্ঘায়ু কামনা করা হয়েছে। একই সঙ্গে তাঁর নেতা-কর্মীরা যেন হয়রানি থেকে রক্ষা পান, সেই প্রার্থনাও করা হয়েছে। মাজার কর্তৃপক্ষের ভাষ্য অনুযায়ী, দানবাক্সে বিভিন্ন ধরনের চিঠি পাওয়া গেলেও সেগুলোর বিষয়বস্তু সাধারণত প্রকাশ্যে আসে না। কারণ আগে মাজারের দানের টাকা প্রকাশ্যে গণনা করা হতো না। এবার নিয়ে তৃতীয়বারের মতো প্রকাশ্যে টাকা গণনা করায় এসব চিঠির বিষয়ও সামনে এসেছে।
৩৫ দিন পর শনিবার আবারও হজরত শাহজালাল (রহ.)-এর মাজারের ঐতিহাসিক ডেগ ও নতুন দানবাক্স খোলা হয়। গণনা শেষে সেখানে প্রায় পৌনে এক কোটি টাকা পাওয়া গেছে। বাংলাদেশি টাকার পাশাপাশি পাউন্ড, ডলার, রিয়াল, রুপি ও দিরহামসহ বিভিন্ন দেশের মুদ্রাও ছিল। এর আগে ২২ জুন প্রথমবার এবং ১১ জুলাই দ্বিতীয়বার দানবাক্স ও ডেগ খুলে টাকা গণনা করা হয়। প্রথম দফায় প্রায় ১৭ লাখ টাকা এবং দ্বিতীয় দফায় প্রায় অর্ধকোটি টাকা পাওয়া গিয়েছিল। গণনা করা অর্থ জেলা প্রশাসকের ব্যবস্থাপনায় খোলা নতুন ব্যাংক হিসাবে জমা রাখা হয়েছে।
মাজারের দানবাক্স ঘিরে এই নতুন ব্যবস্থাপনার পেছনে রয়েছে আর্থিক স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার উদ্যোগ। গত ১২ জুন সিলেটের তৎকালীন জেলা প্রশাসক মো. সারওয়ার আলম মাজার পরিদর্শন করে আয়-ব্যয়ের ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি আনার উদ্যোগের কথা জানান। এর কয়েক দিন পর ১৮ জুন পুরোনো দানবাক্স সিলগালা করে নতুন দানবাক্স বসানো হয়। একই সঙ্গে মানুষের দেওয়া অর্থ রাখার ঐতিহাসিক ডেগও সিলগালা করা হয়। বিষয়টি নিয়ে স্থানীয়ভাবে আলোচনা ও সমালোচনা হলেও পরে মাজারের আর্থিক ব্যবস্থাপনা ও পরিচালনায় স্বচ্ছতা আনতে ১৩ সদস্যের একটি কমিটি গঠন করা হয়।
সেই কমিটির উদ্যোগেই এখন নিয়মিতভাবে দানবাক্স ও ডেগের টাকা প্রকাশ্যে গণনা করা হচ্ছে। সিলেট সিটি করপোরেশনের প্রশাসক ও কমিটির সদস্য আবদুল কাইয়ুম চৌধুরী জানিয়েছেন, আগের দুইবারের মতো এবারও কয়েকটি চিঠি পাওয়া গেছে। তবে তিনি তখনো চিঠিগুলোর বিষয়বস্তু পড়েননি। মাজারে মানুষ টাকা, বৈদেশিক মুদ্রা ও স্বর্ণালংকারের পাশাপাশি নিজেদের মনের কথাও রেখে যান—এবারের চিঠিগুলো সেই বাস্তবতারই আরেকটি উদাহরণ। দানের অর্থের স্বচ্ছ ব্যবস্থাপনার পাশাপাশি এসব ব্যক্তিগত চিঠিও দেখিয়ে দিচ্ছে, ধর্মীয় এই স্থানের সঙ্গে মানুষের আবেগ ও প্রত্যাশার সম্পর্ক কতটা গভীর।




























