ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ পিএলসিতে তিন মাসের বেশি সময় ধরে পূর্ণাঙ্গ পরিচালনা পর্ষদ নেই। এর মধ্যে ব্যাংকের আমানত কমেছে ২১ হাজার কোটি টাকার বেশি, বেড়েছে লোকসান ও খেলাপি ঋণের চাপ। পাশাপাশি গ্রাহকদের আস্থার সংকটও তৈরি হয়েছে। সব মিলিয়ে দেশের অন্যতম বড় এই ব্যাংক এখন আর্থিক ও ব্যবস্থাপনাগত চাপে রয়েছে।
চলতি বছরের ১৪ জুন ইসলামী ব্যাংকের চেয়ারম্যানসহ পরিচালনা পর্ষদের সব সদস্যের নিয়োগ বাতিল করে বাংলাদেশ ব্যাংক। এরপর কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক মোহাম্মদ জহির হোসেনকে পর্ষদের ক্ষমতা প্রয়োগ ও দায়িত্ব পালনের দায়িত্ব দেওয়া হয়। তবে তিন মাসের বেশি সময় পার হলেও নতুন পূর্ণাঙ্গ পর্ষদ গঠনের দৃশ্যমান অগ্রগতি হয়নি।
এ অবস্থায় সোমবার রাজধানীর মতিঝিলে ইসলামী ব্যাংক টাওয়ারের সামনে বিক্ষোভ করে ইসলামী ব্যাংক সচেতন গ্রাহক ফোরাম। কর্মসূচির আগে সংবাদ সম্মেলনে প্রশাসক জহির হোসেনের পদত্যাগ দাবি করেন সংগঠনটির নেতারা। একই সঙ্গে দ্রুত যোগ্য, অভিজ্ঞ ও পেশাদার ব্যক্তিদের নিয়ে পূর্ণাঙ্গ পরিচালনা পর্ষদ গঠনের দাবি জানানো হয়।
ফোরামের আহ্বায়ক অধ্যাপক নুর নবী মানিকের অভিযোগ, প্রশাসক দায়িত্ব নেওয়ার পর ব্যাংকের বিভিন্ন সমস্যা সমাধানে কার্যকর অগ্রগতি দেখা যায়নি। চলমান মামলাগুলোর নিষ্পত্তি ও ব্যাংকের সংকট কাটাতে আরও কার্যকর উদ্যোগ প্রয়োজন বলেও দাবি করেন তিনি।
তবে ব্যাংকের ভারপ্রাপ্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. আলতাফ হুসাইন জানিয়েছেন, ব্যাংকের অধিকাংশ কার্যক্রম স্বাভাবিক রাখার চেষ্টা চলছে। গ্রাহকদের বিনিয়োগসংক্রান্ত চাহিদাও যথাসম্ভব পূরণ করা হচ্ছে বলে জানান তিনি।
ব্যাংকের আর্থিক প্রতিবেদনে দেখা যায়, চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে ইসলামী ব্যাংকের পরিচালন লোকসান হয়েছে ১ হাজার ২৮৫ কোটি টাকা। এ সময়ে নিট লোকসানও ১ হাজার ৩১৬ কোটি টাকা ছাড়িয়েছে। শুধু দ্বিতীয় প্রান্তিকেই পরিচালন লোকসান দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ১৬ কোটি টাকা।
অন্যদিকে মার্চ শেষে ব্যাংকটির আমানত ছিল ১ লাখ ৮৫ হাজার ৬৯৮ কোটি টাকা। জুন শেষে তা নেমে দাঁড়ায় ১ লাখ ৬৪ হাজার ৩৩৩ কোটি টাকায়। অর্থাৎ মাত্র তিন মাসে আমানত কমেছে ২১ হাজার ৩৬৫ কোটি টাকা।
ব্যাংকটির সংকটের আলোচনায় বড় অঙ্কের ঋণের বিষয়টিও সামনে এসেছে। এস আলম গ্রুপের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের নামে ইসলামী ব্যাংক থেকে বিপুল ঋণ নেওয়ার তথ্য বিভিন্ন প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। এসব ঋণের কতটা আদায় করা যাবে, তা এখন ব্যাংকটির আর্থিক সক্ষমতার জন্য গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।
আমানত কমে যাওয়ার চাপ সামাল দিতে বাংলাদেশ ব্যাংক ইসলামী ব্যাংককে প্রায় ১৩ হাজার কোটি টাকা তারল্য সহায়তা দিয়েছে। তবে দীর্ঘমেয়াদে ব্যাংককে স্থিতিশীল করতে ঋণ আদায়, নতুন আমানত সংগ্রহ, আয় বাড়ানো এবং গ্রাহকদের আস্থা পুনরুদ্ধার করাকে গুরুত্বপূর্ণ মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
সাম্প্রতিক সময়ে ব্যাংকটির প্রধান কার্যালয়কে ঘিরে গ্রাহক ও চাকরিচ্যুত কর্মকর্তা-কর্মচারীদের পাল্টাপাল্টি কর্মসূচি নিয়েও উত্তেজনা তৈরি হয়েছে। গত ১৪ সেপ্টেম্বর দুই পক্ষের সংঘর্ষে কয়েকজন আহত হন। বাংলাদেশ ব্যাংক ঘটনাটিকে অনাকাঙ্ক্ষিত বলে মন্তব্য করেছে।
বর্তমানে ইসলামী ব্যাংকের সামনে বড় চ্যালেঞ্জ হলো একটি কার্যকর পরিচালনা কাঠামো তৈরি এবং গ্রাহকদের আস্থা ফিরিয়ে আনা। পাশাপাশি খেলাপি ঋণ আদায় ও স্বাভাবিক ব্যাংকিং কার্যক্রম ধরে রাখাও গুরুত্বপূর্ণ। এসব ক্ষেত্রে কতটা দ্রুত অগ্রগতি হয়, তার ওপরই ব্যাংকটির ভবিষ্যৎ স্থিতিশীলতা অনেকাংশে নির্ভর করছে।



























