বিশ্বব্যাংকের আয়ের তালিকা অনুযায়ী চলতি বছরের মূল্যায়নে কয়েকটি দেশের অর্থনৈতিক অবস্থানে গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন এসেছে। নতুন তালিকায় শ্রীলঙ্কা, ভিয়েতনাম, ফিলিপাইন, জর্ডান ও মাইক্রোনেশিয়া নিম্নমধ্যম আয়ের দেশ থেকে উচ্চমধ্যম আয়ের দেশের কাতারে উঠেছে। অন্যদিকে আফ্রিকার টোগো নিম্ন আয়ের দেশ থেকে নিম্নমধ্যম আয়ের দেশে উন্নীত হয়েছে। তবে বাংলাদেশের অবস্থানে কোনো পরিবর্তন হয়নি। দেশটি আগের মতোই নিম্নমধ্যম আয়ের দেশের তালিকায় রয়েছে।
বিশ্বব্যাংক প্রতি বছরের জুলাই মাসের শুরুতে সদস্যভুক্ত দেশগুলোর মাথাপিছু জাতীয় আয়ের ভিত্তিতে নতুন শ্রেণিবিন্যাস প্রকাশ করে। এই শ্রেণিবিন্যাস শুধু একটি অর্থনৈতিক পরিচয় নয়, বরং আন্তর্জাতিক ঋণ, উন্নয়ন সহায়তা ও বিভিন্ন আর্থিক সুবিধা নির্ধারণেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। বর্তমানে বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) তথ্য অনুযায়ী দেশের মাথাপিছু আয় ৩ হাজার ২০ মার্কিন ডলার হলেও বিশ্বব্যাংক অ্যাটলাস পদ্ধতিতে হিসাব করায় তাদের তথ্য ভিন্ন হতে পারে।
এবারের মূল্যায়নের সঙ্গে নতুন আয়ের সীমাও নির্ধারণ করেছে বিশ্বব্যাংক। এখন নিম্নমধ্যম আয়ের দেশে থাকতে হলে মাথাপিছু আয় কমপক্ষে ১ হাজার ১৭৫ ডলার হতে হবে। উচ্চমধ্যম আয়ের দেশে যেতে প্রয়োজন কমপক্ষে ৪ হাজার ৬৩৫ ডলার এবং উচ্চ আয়ের দেশের তালিকায় যেতে মাথাপিছু আয় হতে হবে অন্তত ১৪ হাজার ৩৭৫ ডলার। এই সীমার ভিত্তিতেই বিভিন্ন দেশের অবস্থান পুনর্নির্ধারণ করা হয়েছে।
উন্নীত হওয়া দেশগুলোর প্রত্যেকটির পেছনে রয়েছে ভিন্ন ভিন্ন কারণ। ভিয়েতনাম ধারাবাহিক রপ্তানি প্রবৃদ্ধি ও শক্তিশালী উৎপাদন খাতের কারণে দ্রুত এগিয়েছে। গত কয়েক বছরে দেশটির রপ্তানি আয় ১৫ শতাংশের বেশি বেড়েছে এবং জিডিপি প্রবৃদ্ধিও ছিল উল্লেখযোগ্য। একইভাবে ফিলিপাইন শিল্প, সেবা, নির্মাণ ও ভোক্তা ব্যয়ের মতো একাধিক খাতের সমন্বিত প্রবৃদ্ধির মাধ্যমে নতুন আয়ের স্তরে পৌঁছেছে।
শ্রীলঙ্কার গল্পটি কিছুটা ভিন্ন। ২০২২ সালের ভয়াবহ অর্থনৈতিক সংকট কাটিয়ে মাত্র তিন বছরের মধ্যে দেশটি পুনরুদ্ধারের দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে। শিল্প, পর্যটন ও আর্থিক খাতের পুনর্জাগরণ দেশটির অর্থনীতিকে আবারও গতি দিয়েছে। অন্যদিকে মাইক্রোনেশিয়া ধীরগতির হলেও নির্মাণ ও কৃষি খাতের স্থিতিশীল প্রবৃদ্ধির মাধ্যমে উন্নীত হয়েছে। জর্ডানের ক্ষেত্রে নতুন জরিপ ও জাতীয় হিসাব সংশোধনের ফলে অর্থনীতির প্রকৃত আকার আগের ধারণার তুলনায় বড় হওয়ায় দেশটি উচ্চমধ্যম আয়ের তালিকায় স্থান পেয়েছে।
আফ্রিকার টোগোর উন্নতির কারণও বেশ ব্যতিক্রমী। দেশটির নতুন আদমশুমারিতে জনসংখ্যার হিসাব উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যাওয়ায় মাথাপিছু আয় স্বাভাবিকভাবেই বেড়ে যায়। পাশাপাশি অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও বিনিময় হারও ইতিবাচক ভূমিকা রাখে। সব মিলিয়ে বিশ্বব্যাংকের সর্বশেষ মূল্যায়ন দেখাচ্ছে, অর্থনৈতিক উন্নয়ন শুধু প্রবৃদ্ধির ওপর নয়; সঠিক পরিসংখ্যান, জনসংখ্যা, বিনিময় হার এবং জাতীয় আয়ের হিসাবের মতো বিষয়ও একটি দেশের অবস্থান নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলে। বাংলাদেশের জন্যও এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা—উচ্চমধ্যম আয়ের দেশে পৌঁছাতে হলে উৎপাদনশীলতা, রপ্তানি, বিনিয়োগ এবং মাথাপিছু আয় আরও বাড়ানোর বিকল্প নেই।























