পরিসংখ্যানের খাতায় কেপ ভার্দের নামের পাশে মাত্র একটি হার লেখা থাকবে। কিন্তু মাঠের ফুটবল বলছে ভিন্ন গল্প। বিশ্বকাপের শেষ ৩২-এ লিওনেল মেসির আর্জেন্টিনাকে অতিরিক্ত সময় পর্যন্ত টেনে নিয়ে যাওয়া আফ্রিকার ছোট্ট দ্বীপরাষ্ট্রটি বিদায় নিলেও জয় করেছে কোটি ফুটবলপ্রেমীর হৃদয়। ৩-২ ব্যবধানে হারের এই ম্যাচই কেপ ভার্দেকে এবারের টুর্নামেন্টের সবচেয়ে বড় বিস্ময় হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে।
গ্রুপ পর্বেই নিজেদের সামর্থ্যের প্রমাণ দিয়েছিল কেপ ভার্দে। সাবেক বিশ্বচ্যাম্পিয়ন স্পেন ও উরুগুয়ের বিপক্ষে ড্র করার পাশাপাশি সৌদি আরবকেও রুখে দিয়ে প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপের নকআউট পর্বে জায়গা করে নেয় তারা। কোনো ম্যাচ না জিতেও এমন কীর্তি দেখিয়ে তারা বিশ্ব ফুটবলে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে উঠে আসে।
আর্জেন্টিনার বিপক্ষেও শুরু থেকেই নির্ভীক ফুটবল খেলেছে কেপ ভার্দে। ম্যাচের প্রথম দিকে রায়ান মেন্ডেস আর্জেন্টিনার রক্ষণভাগকে বেশ কয়েকবার চাপে ফেলেন। তবে ধীরে ধীরে বলের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নেয় লাতিন আমেরিকার জায়ান্টরা এবং ৩১তম মিনিটে লিসান্দ্রো মার্টিনেজের পাস থেকে দুর্দান্ত ফিনিশিংয়ে গোল করেন লিওনেল মেসি।
বিরতির পর যেন নতুন রূপে মাঠে নামে কেপ ভার্দে। মেন্ডেসের পাস থেকে ডেরয় ডুয়ার্তে কঠিন কোণ থেকে অসাধারণ শটে সমতা ফেরান। এটি ছিল বিশ্বকাপের নকআউট পর্বে কেপ ভার্দের ইতিহাসের প্রথম গোল, যা দলটির আত্মবিশ্বাস আরও বাড়িয়ে দেয়।
নির্ধারিত সময়ে আর কোনো গোল না হওয়ায় ম্যাচ গড়ায় অতিরিক্ত সময়ে। ৯২তম মিনিটে কর্নার থেকে লিসান্দ্রো মার্টিনেজ গোল করে আর্জেন্টিনাকে আবারও এগিয়ে দেন। তবে হার না মানা কেপ ভার্দে ১০৩তম মিনিটে সিডনি লোপেস কাবরালের বাঁকানো শটে দ্বিতীয়বার সমতায় ফিরে ম্যাচে নতুন উত্তেজনা সৃষ্টি করে।
মনে হচ্ছিল ম্যাচটি টাইব্রেকারে গড়াবে। কিন্তু ১১১তম মিনিটে মেসির কর্নার থেকে রোমেরোর হেড কেপ ভার্দের ডিফেন্ডার দিনেই বোর্গেসের গায়ে লেগে জালে জড়িয়ে যায়। আত্মঘাতী সেই গোলই শেষ পর্যন্ত আর্জেন্টিনাকে ৩-২ ব্যবধানে জয় এনে দেয় এবং কেপ ভার্দের স্বপ্নভঙ্গ ঘটে।
এই স্বপ্নযাত্রার সবচেয়ে উজ্জ্বল নাম ৪০ বছর বয়সী গোলরক্ষক ভোজিনিয়া। স্পেনের বিপক্ষে প্রথম ম্যাচেই সাতটি দুর্দান্ত সেভ করে ম্যাচসেরা হয়েছিলেন তিনি। আর্জেন্টিনার বিপক্ষেও আরও আটটি সেভ করে দলকে দীর্ঘ সময় লড়াইয়ে টিকিয়ে রাখেন। পুরো টুর্নামেন্টে তার মোট সেভের সংখ্যা দাঁড়ায় ১৮টি।
চলতি বিশ্বকাপে ভোজিনিয়ার চেয়ে বেশি সেভ করেছেন কেবল কুরাসাওয়ের এলোয় রুম (২০) এবং প্যারাগুয়ের অরল্যান্ডো গিল (১৯)। আর ৪০ বছর বা তার বেশি বয়সী গোলরক্ষকদের মধ্যে এক আসরে তার চেয়ে বেশি সেভ করার কীর্তি রয়েছে শুধু ইংল্যান্ডের পিটার শিলটন ও ইতালির কিংবদন্তি দিনো জফের।
আর্জেন্টিনার বিপক্ষে এক ম্যাচে আটটি সেভ করে নতুন আফ্রিকান রেকর্ডও গড়েছেন ভোজিনিয়া। ২০১৪ বিশ্বকাপে জার্মানির বিপক্ষে আলজেরিয়ার রাইস এম’বোলহির পর নকআউট পর্বে কোনো আফ্রিকান গোলরক্ষকের এটিই সর্বোচ্চ সেভের কীর্তি। তার দুর্দান্ত পারফরম্যান্সই কেপ ভার্দেকে বিশ্বমঞ্চে নতুন পরিচিতি এনে দিয়েছে।
মাত্র ৪ হাজার ৩৩ বর্গকিলোমিটার আয়তন এবং প্রায় ৫ লাখ ২৯ হাজার জনসংখ্যার দেশ কেপ ভার্দে ফিফা র্যাঙ্কিংয়ে রয়েছে ৬৭ নম্বরে। তবু তারা স্পেন, উরুগুয়ে ও আর্জেন্টিনার মতো শক্তিশালী দলগুলোর বিপক্ষে সমানতালে লড়েছে। পুরো টুর্নামেন্টে চারটি গোল করেছে, পাঁচটি গোল হজম করেছে, তিনটি ম্যাচ ড্র করেছে এবং মাত্র একটি ম্যাচে হেরেছে।
বিদায়ের আগে শেষ মুহূর্তেও সমতা ফেরানোর সুযোগ পেয়েছিল কেপ ভার্দে। লোপেস কাবরালের দুর্দান্ত ফ্রি-কিক অসাধারণ দক্ষতায় ঠেকিয়ে দেন আর্জেন্টিনার গোলরক্ষক এমিলিয়ানো মার্তিনেজ। সেই সেভেই নিশ্চিত হয় আর্জেন্টিনার জয়, আর কেপ ভার্দে বিদায় নেয় মাথা উঁচু করে। ফলাফল তাদের বিপক্ষে গেলেও এবারের বিশ্বকাপের অন্যতম অনুপ্রেরণার গল্প হয়ে থাকবে কেপ ভার্দে এবং তাদের লড়াকু গোলরক্ষক ভোজিনিয়া।




























