বিশ্বকাপের মূল মঞ্চে পা রাখার আগেই আরও একটি অনন্য রেকর্ড নিজের নামে লিখে নিলেন আর্জেন্টিনা অধিনায়ক লিওনেল মেসি। ২০২৬ ফিফা বিশ্বকাপ শুরুর প্রাক্কালে আইসল্যান্ডের বিপক্ষে প্রস্তুতি ম্যাচে গোল করে দেশের ফুটবল ইতিহাসে সবচেয়ে বেশি বয়সে গোলদাতার কীর্তি গড়েছেন তিনি। ফলে বিশ্বকাপের প্রথম ম্যাচের আগেই আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে উঠে এসেছেন বর্তমান বিশ্বচ্যাম্পিয়ন দলের এই মহাতারকা।
যুক্তরাষ্ট্রের আলাবামার জর্ডান-হেয়ার স্টেডিয়ামে অনুষ্ঠিত প্রস্তুতি ম্যাচে আর্জেন্টিনা ৩-০ গোলের জয় তুলে নেয় আইসল্যান্ডের বিপক্ষে। ম্যাচের স্কোরলাইন যেমন আর্জেন্টাইন সমর্থকদের আনন্দ দিয়েছে, তেমনি মেসির ব্যক্তিগত অর্জনও সমানভাবে আলোচনায় এসেছে। বিশ্বকাপের আগে দলকে আত্মবিশ্বাসী করে তুলতে এই জয়কে গুরুত্বপূর্ণ বলেই মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
ম্যাচের আগে মেসির ফিটনেস নিয়ে কিছুটা শঙ্কা তৈরি হয়েছিল। সামান্য হ্যামস্ট্রিং সমস্যার কারণে কোচ লিওনেল স্কালোনি তাকে শুরুর একাদশে রাখেননি। সতর্কতার অংশ হিসেবেই দলের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ খেলোয়াড়কে বেঞ্চে রেখে শুরু করা হয়েছিল ম্যাচটি।
দ্বিতীয়ার্ধে পরিস্থিতি বদলে যায়। ম্যাচের ৬৯তম মিনিটে মাঠে নামেন মেসি। স্টেডিয়ামে উপস্থিত প্রায় ৮৮ হাজার দর্শক করতালির মাধ্যমে তাকে স্বাগত জানান। তার মাঠে নামার সঙ্গে সঙ্গেই আর্জেন্টিনার আক্রমণে নতুন গতি দেখা যায়।
মেসির উপস্থিতি প্রতিপক্ষ রক্ষণভাগের ওপর দ্রুত চাপ সৃষ্টি করে। কয়েক মিনিটের মধ্যেই তার নিখুঁত পাস থেকে তৈরি হওয়া একটি আক্রমণে বক্সের মধ্যে ফাউলের শিকার হন স্ট্রাইকার লাউতারো মার্তিনেজ। ফলে পেনাল্টির সুযোগ পায় আর্জেন্টিনা।
৭১তম মিনিটে স্পট কিক নিতে এগিয়ে আসেন মেসি। স্বভাবসুলভ শান্ত ভঙ্গিতে বল জালে পাঠিয়ে দলের ব্যবধান ২-০ করেন তিনি। গোলটি ছিল ম্যাচের অন্যতম আকর্ষণীয় মুহূর্ত এবং সেটিই পরবর্তীতে ইতিহাসের অংশ হয়ে যায়।
এই গোলের মাধ্যমে আর্জেন্টিনা জাতীয় দলের ইতিহাসে সবচেয়ে বেশি বয়সে গোল করার রেকর্ড নিজের করে নেন মেসি। গোল করার সময় তার বয়স ছিল ৩৮ বছর ১১ মাস ১৮ দিন। এর আগে দীর্ঘদিন ধরে এই রেকর্ডটি ছিল কিংবদন্তি ফরোয়ার্ড আনহেল আমাদেও লাব্রুনার দখলে।
লাব্রুনা ১৯৫৭ সালে ব্রাজিলের বিপক্ষে রোকা কাপের ম্যাচে ৩৮ বছর ৯ মাস ১০ দিন বয়সে গোল করেছিলেন। প্রায় সাত দশক ধরে টিকে থাকা সেই রেকর্ড অনেকেই অটুট থাকবে বলে মনে করেছিলেন। কিন্তু মেসি আবারও প্রমাণ করলেন, বয়স কেবল একটি সংখ্যা।
ফুটবল ইতিহাসে রেকর্ড ভাঙা এবং নতুন ইতিহাস গড়া যেন মেসির ক্যারিয়ারের অবিচ্ছেদ্য অংশ। ক্লাব এবং জাতীয় দল—দুই পর্যায়েই অসংখ্য রেকর্ডের মালিক তিনি। এবার সেই তালিকায় যুক্ত হলো আর্জেন্টিনার সবচেয়ে বেশি বয়সী গোলদাতার স্বীকৃতি।
আর্জেন্টিনার জার্সিতে এটি ছিল মেসির ১১৭তম আন্তর্জাতিক গোল। জাতীয় দলের হয়ে সর্বোচ্চ গোলদাতার আসনে তিনি অনেক আগেই নিজের অবস্থান শক্ত করেছেন। প্রতিটি ম্যাচের সঙ্গে সেই রেকর্ড আরও সমৃদ্ধ হচ্ছে।
দেশের সর্বকালের গোলদাতাদের তালিকায় দ্বিতীয় স্থানে রয়েছেন গ্যাব্রিয়েল বাতিস্তুতা। তার গোলসংখ্যা ৫৫। অর্থাৎ বাতিস্তুতার তুলনায় দ্বিগুণেরও বেশি গোল এখন মেসির ঝুলিতে রয়েছে, যা তার অসাধারণ ধারাবাহিকতার প্রমাণ।
শুধু গোলসংখ্যা নয়, আন্তর্জাতিক ম্যাচ খেলার ক্ষেত্রেও এক নতুন মাইলফলকের সামনে দাঁড়িয়ে আছেন মেসি। আইসল্যান্ড ম্যাচটি ছিল তার ১৯৯তম আন্তর্জাতিক উপস্থিতি। ফলে বিশ্বকাপের প্রথম ম্যাচে মাঠে নামলেই তিনি ২০০ আন্তর্জাতিক ম্যাচের বিরল কীর্তি স্পর্শ করবেন।
আন্তর্জাতিক ফুটবলে ২০০ ম্যাচ খেলা অত্যন্ত সম্মানজনক একটি অর্জন। খুব কম ফুটবলারই এই মাইলফলক স্পর্শ করতে পেরেছেন। মেসি সেই অভিজাত তালিকায় আরও শক্ত অবস্থান তৈরি করতে যাচ্ছেন।
বিশ্বকাপে সবচেয়ে বেশি বয়সে আর্জেন্টিনার হয়ে গোল করার রেকর্ডও এখন তার নাগালের মধ্যে রয়েছে। বর্তমানে এই রেকর্ডটি সাবেক স্ট্রাইকার মার্টিন পালের্মোর দখলে। ২০১০ বিশ্বকাপে তিনি এই কীর্তি গড়েছিলেন।
বিশ্বকাপের মঞ্চে মেসির অভিজ্ঞতা এবং বর্তমান ফর্ম বিবেচনায় অনেকেই মনে করছেন, পালের্মোর রেকর্ড ভাঙা তার জন্য অসম্ভব কিছু নয়। যদি তিনি গ্রুপ পর্বেই গোল পান, তাহলে আরেকটি ঐতিহাসিক অধ্যায় রচিত হতে পারে।
২০২২ সালে কাতার বিশ্বকাপে শিরোপা জয়ের মাধ্যমে দীর্ঘদিনের স্বপ্ন পূরণ করেছিল আর্জেন্টিনা। সেই দলের নেতৃত্বে ছিলেন মেসি। বিশ্বকাপ জয়ের পরও তার ক্ষুধা কমেনি, বরং নতুন নতুন রেকর্ড গড়ে নিজেকে আরও অনন্য উচ্চতায় নিয়ে যাচ্ছেন।
আর্জেন্টিনার কোচিং স্টাফও মেসির শারীরিক অবস্থা নিয়ে আশাবাদী। সামান্য চোটের সমস্যা কাটিয়ে তিনি ধীরে ধীরে পূর্ণ ফিটনেসে ফিরছেন। প্রস্তুতি ম্যাচে তার পারফরম্যান্স সেই আস্থাকে আরও শক্তিশালী করেছে।
বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনার প্রথম ম্যাচ অনুষ্ঠিত হবে ১৬ জুন। ওই ম্যাচে তাদের প্রতিপক্ষ আলজেরিয়া। শিরোপা ধরে রাখার মিশনে শুরু থেকেই শক্ত অবস্থান নিতে চাইবে স্কালোনির দল।
বিশ্বজুড়ে কোটি কোটি ফুটবলপ্রেমীর নজর থাকবে মেসির দিকে। তিনি শুধু আর্জেন্টিনার অধিনায়ক নন, আধুনিক ফুটবলের অন্যতম সেরা আইকনও। তার প্রতিটি ম্যাচ, প্রতিটি স্পর্শ এবং প্রতিটি গোল নতুন আলোচনার জন্ম দেয়।
বিশ্বকাপের প্রথম ম্যাচে মেসি কি ২০০ আন্তর্জাতিক ম্যাচের মাইলফলক স্পর্শ করবেন, নাকি আরও একটি রেকর্ড নিজের নামে লিখবেন—এটাই এখন ফুটবল বিশ্বের সবচেয়ে বড় কৌতূহল। তবে একটি বিষয় নিশ্চিত, বিশ্বকাপ শুরু হওয়ার আগেই ইতিহাসের পাতায় নিজের নাম আরেকবার স্বর্ণাক্ষরে লিখে ফেলেছেন লিওনেল মেসি।

























