জাইসমিন লাম্বোরিয়া এখন ভারতের সবচেয়ে আলোচিত নারী বক্সারদের একজন। বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন হওয়ার পর এবার তার লক্ষ্য কমনওয়েলথ গেমসে স্বর্ণপদক জয়। ২০২২ সালের বার্মিংহাম কমনওয়েলথ গেমসে ব্রোঞ্জ জিতেছিলেন তিনি। এবার গ্লাসগোতে সেই ব্রোঞ্জকে স্বর্ণে রূপ দিতে দৃঢ় প্রতিজ্ঞ এই ভারতীয় তারকা।
মাত্র ২৪ বছর বয়সেই জাইসমিন লাম্বোরিয়া বিশ্ব বক্সিংয়ে নিজের শক্ত অবস্থান তৈরি করেছেন। ২০২৫ সালে কাজাখস্তানের আস্তানা ও ভারতের দিল্লিতে বিশ্বকাপ স্বর্ণ জয়ের পর লিভারপুলে অনুষ্ঠিত বিশ্ব চ্যাম্পিয়নশিপেও ৫৭ কেজি বিভাগে স্বর্ণপদক জিতে সাড়া ফেলেন তিনি। সেই আত্মবিশ্বাস নিয়েই এবার কমনওয়েলথ গেমসে রিংয়ে নামছেন।
তবে এই সাফল্যের পথ মোটেও সহজ ছিল না। প্যারিস অলিম্পিকে নিজের প্রথম অংশগ্রহণেই প্রথম রাউন্ডে বিদায় নিতে হয় জাইসমিন লাম্বোরিয়াকে। ফিলিপাইনের অলিম্পিক রৌপ্যজয়ী নেস্টি পেটেসিওর কাছে হারলেও সেই পরাজয়কে তিনি জীবনের বড় শিক্ষা হিসেবে দেখেন। এরপর নিজের ফিটনেস, কৌশল ও মানসিক প্রস্তুতিতে বড় পরিবর্তন এনে আবারও বিশ্বসেরার আসনে ফিরেছেন।
নিজের মানসিক শক্তির জন্য ভারতীয় ক্রিকেট কিংবদন্তি মাহেন্দ্র সিং ধোনিকে অনুপ্রেরণা মনে করেন জাইসমিন লাম্বোরিয়া। তার ভাষায়, ধোনির মতো কঠিন পরিস্থিতিতেও শান্ত থাকতে পারাই একজন সফল ক্রীড়াবিদের সবচেয়ে বড় গুণ। সেই মানসিকতা নিয়েই তিনি প্রতিটি বড় প্রতিযোগিতায় অংশ নেন।
জাইসমিন লাম্বোরিয়া ভারতের প্রথম নারী বক্সার হিসেবে ভারতীয় সেনাবাহিনীতে যোগ দিয়েছেন। ২০২২ সালের কমনওয়েলথ গেমসে ব্রোঞ্জ জয়ের পর তাকে কর্পস অব মিলিটারি পুলিশের অধীনে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। বর্তমানে তিনি আর্মি স্পোর্টস ইনস্টিটিউটের ‘মিশন অলিম্পিকস’ কর্মসূচির অধীনে প্রশিক্ষণ নিচ্ছেন। তার মতে, সেনাবাহিনীর শৃঙ্খলা ও উন্নত প্রশিক্ষণই তাকে আরও শক্তিশালী বক্সার হিসেবে গড়ে তুলেছে।
ভারতের হরিয়ানা রাজ্যের ভিওয়ানিতে জন্ম নেওয়া জাইসমিন লাম্বোরিয়া এমন এক পরিবারে বড় হয়েছেন, যেখানে বক্সিংয়ের ঐতিহ্য দীর্ঘদিনের। তার প্রপিতামহ হাওয়া সিং ছিলেন ভারতের কিংবদন্তি বক্সার এবং দুইবারের এশিয়ান গেমস স্বর্ণজয়ী। পরিবারের সেই উত্তরাধিকারই ছোটবেলা থেকেই তাকে বক্সিংয়ের প্রতি আকৃষ্ট করে।
মাত্র ১৪ বছর বয়সে বক্সিংকে পেশা হিসেবে বেছে নেন জাইসমিন লাম্বোরিয়া। প্রথমদিকে পরিবারের সদস্যদের কাছেই প্রশিক্ষণ নেন। পরে ধীরে ধীরে জাতীয় পর্যায়ে নিজের প্রতিভা প্রমাণ করে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে পৌঁছে যান। অর্থনৈতিকভাবে সাধারণ পরিবার থেকে উঠে এলেও বাবা-মায়ের সমর্থন কখনো কম পাননি তিনি।
শুধু নিজের সাফল্য নয়, ভবিষ্যৎ নারী ক্রীড়াবিদদের জন্যও অনুপ্রেরণা হতে চান জাইসমিন লাম্বোরিয়া। ভারতীয় সেনাবাহিনী সম্প্রতি ১২ থেকে ১৬ বছর বয়সী মেয়েদের জন্য বিশেষ ক্রীড়া প্রশিক্ষণ কর্মসূচি চালু করেছে। তিনি বিশ্বাস করেন, এই উদ্যোগ থেকে ভবিষ্যতে আরও অনেক নারী বক্সার উঠে আসবেন এবং আন্তর্জাতিক পর্যায়ে দেশের প্রতিনিধিত্ব করবেন।
ভারতের কিংবদন্তি বক্সার এমসি মেরি কম, বিজেন্দর সিং, নিখাত জারিন, লাভলিনা বরগোহাঁই এবং অলিম্পিক চ্যাম্পিয়ন নীরজ চোপড়াকে নিজের অনুপ্রেরণা হিসেবে উল্লেখ করেন জাইসমিন লাম্বোরিয়া। তাদের সাফল্যই তাকে আরও বড় স্বপ্ন দেখতে শিখিয়েছে।
গ্লাসগো কমনওয়েলথ গেমসের ফাইনাল সামনে রেখে আত্মবিশ্বাসী জাইসমিন লাম্বোরিয়া। তার একটাই লক্ষ্য—ভারতের হয়ে স্বর্ণপদক জিতে জাতীয় সংগীত বাজানোর সেই বিশেষ মুহূর্ত আবারও উপভোগ করা। বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন হওয়ার পর এবার কমনওয়েলথ গেমসেও নিজের শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণ করতে মুখিয়ে আছেন ভারতের এই সেনা বক্সার।





























