মাইক হেসনের সামনে এখন কঠিন এক পরীক্ষা। পাকিস্তান দলের টিম হোটেলে গত কয়েক দিনে যেন থামছেই না স্যুটকেসের চাকা। কেউ দল ছাড়ছেন, কেউ নতুন করে যোগ দিচ্ছেন, আবার কেউ সুযোগ পেয়ে ফিরছেন। সাধারণত একটি টেস্ট দলের প্রস্তুতির সময় যেখানে থাকে পরিকল্পনা ও স্থিরতা, পাকিস্তানের চিত্র সেখানে একেবারেই আলাদা। ইংল্যান্ডের বিপক্ষে সিরিজের প্রথম দুই টেস্ট হেরে ২-০ ব্যবধানে পিছিয়ে থাকা দলটির ওপর এমনিতেই চাপ ছিল। তার ওপর একসঙ্গে সাত ক্রিকেটারের বাদ পড়া সেই চাপ আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। এই পরিস্থিতিতেই লাল বলের দলের অন্তর্বর্তীকালীন প্রধান কোচ হিসেবে দায়িত্ব নিতে হয়েছে মাইক হেসনকে।
হঠাৎ করে দায়িত্ব পাওয়া মাইক হেসনের কাজটা যে সহজ নয়, সেটি বুঝতে খুব বেশি সময় লাগার কথা নয়। তিনি মূলত পাকিস্তানের সাদা বলের দলের সঙ্গে কাজ করছিলেন। টেস্ট দলের সাম্প্রতিক পরিকল্পনা, দল নির্বাচন কিংবা ভেতরের সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়ায় তাঁর সরাসরি সম্পৃক্ততাও ছিল না। তাই দায়িত্ব পাওয়ার পর তাঁকে একদিকে নতুন ক্রিকেটারদের সঙ্গে মানিয়ে নিতে হচ্ছে, অন্যদিকে ভেঙে পড়া দলের আত্মবিশ্বাসও ফিরিয়ে আনতে হচ্ছে। এর মধ্যে টিম হোটেলে একের পর এক পরিবর্তন। হেসনের ভাষায়, গত কয়েক দিন ছিল বেশ চ্যালেঞ্জিং। খেলোয়াড়দের মধ্যেও হতাশা রয়েছে, আর সেই হতাশা লুকানোর চেষ্টা করছেন না তাঁরা।
পাকিস্তান ক্রিকেটে সাম্প্রতিক সময়ে দল নির্বাচন নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। নির্বাচকদের কাছে ব্যাখ্যা চেয়ে নোটিশ পাঠিয়েছে পাকিস্তান ক্রিকেট বোর্ড। ইমাম-উল-হক ও মোহাম্মদ রিজওয়ানকে দলে নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েও আলোচনা হয়েছে। ফলে মাঠের পারফরম্যান্সের সঙ্গে মাঠের বাইরের অস্থিরতাও যোগ হয়েছে। এমন অবস্থায় নতুন করে দল সাজানোর দায়িত্ব পাওয়া মাইক হেসন স্পষ্ট করে দিয়েছেন, তাঁর প্রথম লক্ষ্য হবে ভারসাম্য তৈরি করা। শুধু একাদশে কয়েকজন নতুন মুখ ঢোকালেই সমস্যার সমাধান হবে না; দলের বোলিং আক্রমণেও বৈচিত্র্য আনতে হবে। কারণ ইংল্যান্ডের বিপক্ষে আগের দুই ম্যাচে পাকিস্তানের বোলিংয়ে সেই পরিচিত ধার দেখা যায়নি।
পাকিস্তানের ক্রিকেটের সবচেয়ে বড় শক্তিগুলোর একটি ঐতিহাসিকভাবেই তাদের বোলিং। দ্রুতগতির পেসার, অস্বাভাবিক বোলিং অ্যাকশন কিংবা ব্যাটারকে ধাঁধায় ফেলে দেওয়া স্পিন—এসবই পাকিস্তানের ক্রিকেটের পরিচিত বৈশিষ্ট্য। কিন্তু চলতি সিরিজে সেই চিত্র অনেকটাই ফিকে। প্রথম টেস্টে ইনিংস ও ১০৩ রানে এবং দ্বিতীয় টেস্টে ১৯৪ রানে হারের পর সেটিই সবচেয়ে বড় দুশ্চিন্তার জায়গা হয়ে দাঁড়িয়েছে। মাইক হেসন তাই বোলিংয়ে নতুন সমীকরণ খুঁজছেন। তাঁর ভাবনায় শুধু উইকেট নেওয়ার ক্ষমতা নয়, ভিন্ন ধরনের বোলারকে একসঙ্গে ব্যবহার করে ইংল্যান্ডের ব্যাটিং লাইনআপের ওপর চাপ তৈরি করাও গুরুত্বপূর্ণ।
এই কঠিন সময়ে পাকিস্তানের জন্য কিছুটা স্বস্তির নাম মোহাম্মদ আব্বাস। অভিজ্ঞ এই পেসার এখন পর্যন্ত সিরিজে নিয়েছেন ১০ উইকেট। তাঁর বোলিং গড়ও ২০.৮০, যা দলের অন্য বোলারদের তুলনায় অনেক বেশি কার্যকর। মাইক হেসন তাই আব্বাসকে ঘিরেই আক্রমণ সাজানোর কথা ভাবছেন। তবে শুধু একজন বোলারের ওপর নির্ভর করে ইংল্যান্ডের মতো শক্তিশালী দলের বিপক্ষে ম্যাচ জেতা কঠিন। হেসনের প্রয়োজন এমন কয়েকজন বোলার, যারা আব্বাসকে সহযোগিতা করার পাশাপাশি নিজেদের দিক থেকেও সুযোগ তৈরি করতে পারবেন। তাঁর ভাষায়, পাকিস্তানের বোলিংয়ে একটু ‘এক্স-ফ্যাক্টর’ দরকার—এমন কিছু, যা ম্যাচের গতিপথ বদলে দিতে পারে।
এখন সামনে এজবাস্টনে সিরিজের শেষ টেস্ট। ৯ সেপ্টেম্বর শুরু হতে যাওয়া ম্যাচটি পাকিস্তানের জন্য শুধু আরেকটি টেস্ট নয়, বরং আত্মবিশ্বাস ফেরানোর শেষ সুযোগও। সিরিজ ইতিমধ্যে হাতছাড়া হয়েছে, তাই এই ম্যাচে অন্তত লড়াইয়ের চেহারায় ফিরতে চাইবে দলটি। নতুন ক্রিকেটারদের নিয়ে তৈরি একাদশ কতটা কার্যকর হয়, বোলিং আক্রমণে কতটা বৈচিত্র্য আসে এবং ব্যাটিং বিভাগ নিজেদের সামলাতে পারে কি না—সবকিছুর দিকেই থাকবে নজর। সবচেয়ে বড় প্রশ্ন, এত অস্থিরতার মধ্যেও মাইক হেসন কি পাকিস্তানকে একটি সংগঠিত দল হিসেবে মাঠে নামাতে পারবেন? উত্তর মিলবে এজবাস্টনের মাঠেই। পাকিস্তান ক্রিকেটের এই কঠিন সময়ে তাই কোচের পাশাপাশি খেলোয়াড়দেরও নিজেদের সেরাটা দিতে হবে।



























