সুন্দরবনে বন্যপ্রাণী রক্ষায় নিয়মিত অভিযানের অংশ হিসেবে খুলনার কয়রা থেকে উদ্ধার করা ১৪৫ কেজি হরিণের মাংস মাটিতে পুঁতে বিনষ্ট করা হয়েছে। আদালতের নির্দেশনায় রোববার (৬ সেপ্টেম্বর) বিকেলে কয়রা উপজেলা আদালত চত্বরে উদ্ধার করা মাংসগুলো ধ্বংস করা হয়।
এর আগে শনিবার সুন্দরবনের নলিয়ান ফরেস্ট রেঞ্জের আওতাধীন বোতলখালী খাল এলাকায় অভিযান চালিয়ে এসব হরিণের মাংস জব্দ করে বন বিভাগ। অভিযানের সময় পাচারকারীরা পালিয়ে গেলেও ঘটনাস্থল থেকে বিপুল পরিমাণ হরিণের মাংসসহ একটি ডিঙ্গি নৌকা, হরিণের মাথা ও পা উদ্ধার করা হয়।
বন বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, শনিবার সুন্দরবনের নলিয়ান ফরেস্ট রেঞ্জের রেঞ্জার আল আমিন ইসলামের নেতৃত্বে হড্ডা টহল ফাঁড়ির একটি দল বোতলখালী খাল এলাকায় অভিযান পরিচালনা করে।
অভিযানে হড্ডা টহল ফাঁড়ির ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) শাহাদাৎ হোসেনসহ বন বিভাগের সদস্যরা অংশ নেন। অভিযানের উপস্থিতি টের পেয়ে ঘটনাস্থলে থাকা পাচারকারীরা পালিয়ে যায়।
পরে ওই এলাকায় তল্লাশি চালিয়ে ১৪৫ কেজি হরিণের মাংস উদ্ধার করা হয়। একই সঙ্গে একটি ডিঙ্গি নৌকা এবং হরিণের মাথা ও পা জব্দ করেন বন বিভাগের সদস্যরা।
বন বিভাগের ধারণা, সুন্দরবন থেকে শিকার করা হরিণের মাংস পাচারের উদ্দেশ্যে ওই এলাকায় রাখা হয়েছিল। তবে এ ঘটনায় জড়িতদের তাৎক্ষণিকভাবে আটক করা সম্ভব হয়নি।
অভিযানে উদ্ধার করা হরিণের মাংস রোববার বিকেলে কয়রা উপজেলা আদালত চত্বরে নেওয়া হয়। পরে আদালতের নির্দেশনা অনুযায়ী বিকেল ৪টার দিকে মাংসগুলো মাটিতে পুঁতে বিনষ্ট করা হয়।
বন্যপ্রাণীর মাংস দীর্ঘ সময় সংরক্ষণ করা সম্ভব না হওয়ায় এবং আইনগত প্রক্রিয়া অনুসরণ করে আলামত ব্যবস্থাপনার অংশ হিসেবে আদালতের নির্দেশে তা ধ্বংস করা হয়েছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।
মাংস বিনষ্টের সময় বন বিভাগের কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
হড্ডা টহল ফাঁড়ির ওসি শাহাদাৎ হোসেন জানান, এ ঘটনায় জড়িত ব্যক্তিদের শনাক্ত করার চেষ্টা চলছে। তাঁদের শনাক্ত করা গেলে বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ আইনে মামলা দায়ের করা হবে।
তিনি বলেন, সুন্দরবনে হরিণ শিকার ও মাংস পাচারের সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে বন বিভাগ নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করছে। এ ধরনের অপরাধে জড়িতদের আইনের আওতায় আনতে তদন্ত অব্যাহত রয়েছে।
অভিযান চলাকালে পাচারকারীরা পালিয়ে যাওয়ায় তাঁদের পরিচয় শনাক্ত করতে জব্দ করা নৌকাসহ অন্যান্য আলামতও তদন্তে কাজে লাগানো হচ্ছে।
নলিয়ান স্টেশন কর্মকর্তা ও ফরেস্ট রেঞ্জার আল আমিন ইসলাম বলেন, সুন্দরবনে বন্যপ্রাণী নিধন এবং অবৈধভাবে বন্যপ্রাণীর মাংস পাচার বন্ধে বন বিভাগ নিয়মিত অভিযান চালাচ্ছে।
তিনি বলেন, সুন্দরবন বাংলাদেশের গুরুত্বপূর্ণ প্রাকৃতিক সম্পদ। এখানকার বন্যপ্রাণী ও বনজ সম্পদ রক্ষায় আইনবিরোধী কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে অভিযান অব্যাহত থাকবে।
বন বিভাগের কর্মকর্তারা জানান, সুন্দরবনে হরিণ শিকার একটি দীর্ঘদিনের উদ্বেগের বিষয়। শিকারিরা বিভিন্ন কৌশলে বনের ভেতরে প্রবেশ করে হরিণ শিকার করে থাকে। পরে সেই মাংস নৌপথে বিভিন্ন এলাকায় পাচারের চেষ্টা করা হয়।
এ ধরনের কর্মকাণ্ড সুন্দরবনের জীববৈচিত্র্যের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। বিশেষ করে অতিরিক্ত হরিণ শিকার সুন্দরবনের বন্যপ্রাণীর স্বাভাবিক ভারসাম্য নষ্ট করতে পারে।
সুন্দরবনের বিভিন্ন খাল ও নদীপথ ব্যবহার করে বন্যপ্রাণী পাচারের চেষ্টা ঠেকাতে বন বিভাগের পাশাপাশি স্থানীয় বাসিন্দাদেরও সচেতন হওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে।
বন বিভাগের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, বনের ভেতরে সন্দেহজনক নৌযান চলাচল বা বন্যপ্রাণী শিকারের কোনো তথ্য পাওয়া গেলে দ্রুত সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে জানাতে হবে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, সুন্দরবনের জীববৈচিত্র্য রক্ষায় শুধু অভিযান পরিচালনা করলেই হবে না; শিকারিদের বিকল্প জীবিকার সুযোগ তৈরি, স্থানীয় জনগোষ্ঠীর সম্পৃক্ততা এবং নিয়মিত নজরদারি আরও জোরদার করা প্রয়োজন।
কয়রায় ১৪৫ কেজি হরিণের মাংস উদ্ধারের ঘটনা সুন্দরবনে বন্যপ্রাণী শিকার ও পাচারের বিষয়টি আবারও সামনে এনেছে। বন বিভাগ জানিয়েছে, সুন্দরবনের প্রাণী ও প্রাকৃতিক সম্পদ রক্ষায় এ ধরনের অভিযান ভবিষ্যতেও অব্যাহত থাকবে।




























