ঢাকা ০৯:০১ অপরাহ্ন, রবিবার, ০৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ২২ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

রংপুরে ৪ খুনের রহস্যে নতুন মোড়, আদালতে সাক্ষী শান্তের জবানবন্দি

রংপুরে ৪ খুনের ঘটনায় আদালতে শান্ত দাসের ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি

রংপুর নগরের মাছুয়াপাড়ার (দাসপাড়া) আলোচিত চার খুনের ঘটনায় তদন্তে নতুন তথ্য সামনে এসেছে। হত্যাকাণ্ডের আগে ও পরে আসামিদের সঙ্গে মাদক ব্যবসায়ী শান্ত দাসের যোগাযোগ ছিল বলে তদন্তে উঠে এসেছে। এ ঘটনায় শান্ত দাস আদালতে ১৬৪ ধারায় সাক্ষী হিসেবে জবানবন্দি দিয়েছেন। তাঁর জবানবন্দিতে ইয়াবা কেনা, মোবাইল ফোন বন্ধক রাখা এবং হত্যাকাণ্ডের পর সেই মোবাইল ছাড়িয়ে নেওয়ার বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য উঠে এসেছে।

রোববার (৬ সেপ্টেম্বর) বিকেলে রংপুর মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালত-২-এর বিচারক মো. রফিকুল ইসলামের আদালতে শান্ত দাসের জবানবন্দি রেকর্ড করা হয়। বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা রংপুর মেট্রোপলিটন পুলিশের গোয়েন্দা শাখার (ডিবি) পরিদর্শক জিন্নাত আলী।

তদন্তকারী কর্মকর্তার ভাষ্য অনুযায়ী, হত্যাকাণ্ডের আগে সিদ্ধার্থ দাস ও মুগ্ধ দাসের সঙ্গে শান্ত দাসের যোগাযোগ হয়। ইয়াবা কেনার সময় সিদ্ধার্থের শরীরে আঁচড়ের দাগ দেখতে পান শান্ত। বিষয়টি অস্বাভাবিক মনে হওয়ায় তিনি সিদ্ধার্থের কাছে আঁচড়ের কারণ জানতে চান।

শান্তের জবানবন্দি অনুযায়ী, এ সময় সিদ্ধার্থ তাঁকে জানান, তিনি গণপতি চক্রবর্তীসহ চারজনকে হত্যা করেছেন। সিদ্ধার্থের মুখে এমন কথা শুনে শান্ত উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েন। পরে তদন্তে তাঁর বক্তব্যকে গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষ্য হিসেবে বিবেচনা করা হয়।

নতুন জবানবন্দিতে ইয়াবা কেনার বিষয়েও বিস্তারিত তথ্য পাওয়া গেছে। একটি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২১ আগস্ট রাতে সিদ্ধার্থ ও মুগ্ধ তিন ধাপে মোট পাঁচটি ইয়াবা কেনেন বলে শান্ত আদালতে জানিয়েছেন। ইয়াবার বিনিময়ে সিদ্ধার্থ তাঁর মোবাইল ফোনটি শান্তের কাছে বন্ধক রাখেন।

শান্তের ভাষ্য অনুযায়ী, মোবাইলের বিপরীতে ৩ হাজার ৫০০ টাকা নেওয়া হয়েছিল। পরে হত্যাকাণ্ডের পরদিন সিদ্ধার্থ সেই টাকা পরিশোধ করে মোবাইল ফোনটি ফেরত নেন। তদন্তে পুলিশের কাছে এ অর্থের উৎস নিয়েও প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।

শান্তের জবানবন্দিতে দাবি করা হয়েছে, সিদ্ধার্থ যে টাকা দিয়ে মোবাইল ফোনটি ছাড়িয়ে নেন, সেই টাকা গণপতি চক্রবর্তীর বাড়ি থেকে নেওয়া অর্থের অংশ ছিল। তবে এ বক্তব্য তদন্তে যাচাই করা হচ্ছে।

গত ২১ আগস্ট ভোরে রংপুর নগরের মাছুয়াপাড়ায় নিজ বাড়ি থেকে অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তী, তাঁর স্ত্রী প্রীতিলতা চক্রবর্তী, মেয়ে আগামী চক্রবর্তী এবং ছেলে আয়ুশ চক্রবর্তী প্রিয়মের মরদেহ উদ্ধার করা হয়।

ঘটনার পর এলাকায় ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়। প্রথমদিকে হত্যাকাণ্ডের কারণ নিয়ে নানা প্রশ্ন ওঠে। পরে পুলিশ সিদ্ধার্থ দাস ও মুগ্ধ দাসকে গ্রেপ্তার করে।

পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, গ্রেপ্তারের পর জিজ্ঞাসাবাদে দুজন হত্যাকাণ্ডে জড়িত থাকার কথা স্বীকার করেন। পরে তাঁরা আদালতে ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারায় জবানবন্দিও দেন।

পুলিশের তদন্তে উঠে আসে, হত্যাকাণ্ডের আগে সিদ্ধার্থ ও মুগ্ধ ইয়াবা সেবন করেছিলেন। তদন্তসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বরাত দিয়ে বিভিন্ন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, রাতের কোনো এক সময় তাঁরা গণপতি চক্রবর্তীর বাড়ির ছাদে অবস্থান নেন এবং সেখানে ইয়াবা সেবন করেন।

পরে ভোরের দিকে গণপতি চক্রবর্তী ছাদে গেলে তাঁদের দেখতে পান বলে তদন্তে উঠে এসেছে। এ সময় তিনি তাঁদের ধমক দেন। এরপর নিজেদের পরিচয় প্রকাশ পাওয়ার আশঙ্কায় তাঁরা গণপতিকে হত্যা করেন বলে পুলিশের ভাষ্য।

তদন্তে বলা হয়েছে, গণপতিকে হত্যার পর তাঁর স্ত্রী ও মেয়ে ছাদে এলে তাঁদেরও হত্যা করা হয়। পরে পরিবারের ছোট ছেলেকেও হত্যা করা হয়। হত্যাকাণ্ডের পর ঘটনাটিকে চুরি বা ডাকাতির মতো দেখানোর চেষ্টা করা হয় বলে তদন্তে উঠে এসেছে।

পুলিশের তদন্তে আরও বলা হয়েছে, হত্যাকাণ্ডের পর ঘরের জিনিসপত্র এলোমেলো করা হয়। কিছু স্বর্ণালংকার ও নগদ টাকা নিয়ে যায় আসামিরা। স্বর্ণালংকারের একটি অংশ পরে মাটির নিচে পুঁতে রাখার তথ্যও তদন্তে পাওয়া যায় বলে পুলিশ জানিয়েছে।

তদন্তকারীদের মতে, হত্যাকাণ্ডের প্রকৃত কারণ আড়াল করতেই ঘটনাস্থলে চুরি বা ডাকাতির চিত্র তৈরি করা হয়ে থাকতে পারে। এ বিষয়ে আসামিদের আদালতে দেওয়া জবানবন্দির তথ্যও তদন্তের সঙ্গে মিলিয়ে দেখা হচ্ছে।

হত্যাকাণ্ডের পর সিদ্ধার্থ ও মুগ্ধ মাদক সেবন করেছিলেন কি না, তা নিশ্চিত করতে তাঁদের ডোপ টেস্ট করা হয়। পুলিশের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, দুই আসামির ডোপ টেস্টে মাদকের উপস্থিতি পাওয়া যায়নি।

এ কারণে হত্যাকাণ্ডের সময় তাঁদের শারীরিক অবস্থাসহ ইয়াবা সেবনের বিষয়টি নিয়ে তদন্তে আরও যাচাইয়ের প্রয়োজন দেখা দিয়েছে। আদালতের জবানবন্দি, ময়নাতদন্ত প্রতিবেদন, ফরেনসিক আলামত এবং অন্যান্য সাক্ষ্যের সঙ্গে এসব তথ্য মিলিয়ে দেখছে তদন্তকারী সংস্থা।

শান্ত দাসের ভূমিকা নিয়ে তদন্তে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—তিনি হত্যাকাণ্ডের সরাসরি প্রত্যক্ষদর্শী নন বলে জানা গেছে। তবে হত্যাকাণ্ডের আগে আসামিদের সঙ্গে তাঁর যোগাযোগ ছিল এবং তাঁদের ইয়াবা সরবরাহের বিষয়ে তিনি তথ্য দিয়েছেন। একই সঙ্গে হত্যাকাণ্ডের পর সিদ্ধার্থ তাঁর কাছে চারজনকে হত্যার কথা বলেছেন—এমন দাবিও করেছেন শান্ত।

তাঁর শরীরে থাকা আঁচড়ের দাগ দেখে প্রশ্ন করার পর সিদ্ধার্থের কাছ থেকে হত্যার কথা জানতে পারেন বলে শান্ত আদালতে জানিয়েছেন। ফলে তদন্তে তাঁর বক্তব্যকে গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষ্য হিসেবে দেখা হচ্ছে।

পুলিশ জানিয়েছে, শান্তের বিরুদ্ধে মাদক ব্যবসার অভিযোগ থাকলেও তাঁর নামে কোনো মামলা নেই। তাঁকে আটকের সময়ও কোনো মাদক পাওয়া যায়নি। ফলে এ ঘটনায় তাঁকে গ্রেপ্তার দেখানো হয়নি। তবে তাঁর সঙ্গে আসামিদের যোগাযোগ ও ইয়াবা লেনদেনের বিষয়টি তদন্তের আওতায় রয়েছে।

রংপুরের এই চার খুনের ঘটনায় শুরু থেকেই হত্যার কারণ নিয়ে একাধিক প্রশ্ন রয়েছে। প্রথমদিকে ইয়াবা সেবনের বিষয়টি সামনে এলেও পরবর্তী তদন্তে জমি-সংক্রান্ত বিরোধ, পুরোনো ক্ষোভ এবং পারিবারিক বা সামাজিক বিরোধের বিষয়ও খতিয়ে দেখার কথা জানিয়েছে পুলিশ।

গণপতি চক্রবর্তীর বাড়ি যে জমিতে নির্মাণ করা হয়েছিল, সেটি আগে সিদ্ধার্থদের পূর্বপুরুষদের মালিকানাধীন ছিল বলে তদন্তে তথ্য উঠে এসেছে। এই বিষয়টিও হত্যাকাণ্ডের সম্ভাব্য কারণ হিসেবে তদন্তকারীরা যাচাই করছেন।

এ ছাড়া ঘটনাস্থল থেকে পাওয়া আলামত, ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন, আসামিদের জবানবন্দি এবং সাক্ষীদের বক্তব্য পরস্পরের সঙ্গে মিলিয়ে দেখা হচ্ছে।

শান্ত দাসের ১৬৪ ধারার জবানবন্দি মামলার তদন্তে নতুন একটি মাত্রা যোগ করেছে। বিশেষ করে হত্যাকাণ্ডের আগে আসামিদের ইয়াবা কেনা এবং হত্যাকাণ্ডের পর মোবাইল ফোন ছাড়িয়ে নেওয়ার অর্থের উৎস সম্পর্কে তাঁর বক্তব্য তদন্তকারীদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে।

তবে আদালতে কোনো সাক্ষীর দেওয়া বক্তব্য বা আসামির জবানবন্দি একাই মামলার চূড়ান্ত সত্য প্রমাণ করে না। এসব তথ্যের সঙ্গে ফরেনসিক আলামত, ময়নাতদন্ত, অন্যান্য সাক্ষ্য ও তদন্তের ফলাফল মিলিয়ে ঘটনার প্রকৃত চিত্র নির্ধারণ করা হবে।

রংপুর নগরের মাছুয়াপাড়ার এই চার হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় ইতোমধ্যে গ্রেপ্তার দুই আসামিকে জেলগেটে জিজ্ঞাসাবাদও করেছে পুলিশ। নতুন তথ্য পাওয়ার পর তদন্ত আরও এগিয়ে নিতে তাঁদের জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে।

ফলে শান্ত দাসের জবানবন্দির পর এখন তদন্তকারীদের সামনে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো—হত্যাকাণ্ডের আগে ও পরে আসামিদের গতিবিধি, ইয়াবা কেনাবেচা, লুট করা অর্থের ব্যবহার এবং চার হত্যার প্রকৃত উদ্দেশ্য পরস্পরের সঙ্গে কতটা সম্পর্কিত। এসব প্রশ্নের উত্তর মিললেই আলোচিত এই চার খুনের রহস্য আরও পরিষ্কার হবে।

জনপ্রিয় সংবাদ

রংপুরে ৪ খুনের রহস্যে নতুন মোড়, আদালতে সাক্ষী শান্তের জবানবন্দি

Update Time : ০৭:৪৩:২৭ অপরাহ্ন, রবিবার, ৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬

রংপুর নগরের মাছুয়াপাড়ার (দাসপাড়া) আলোচিত চার খুনের ঘটনায় তদন্তে নতুন তথ্য সামনে এসেছে। হত্যাকাণ্ডের আগে ও পরে আসামিদের সঙ্গে মাদক ব্যবসায়ী শান্ত দাসের যোগাযোগ ছিল বলে তদন্তে উঠে এসেছে। এ ঘটনায় শান্ত দাস আদালতে ১৬৪ ধারায় সাক্ষী হিসেবে জবানবন্দি দিয়েছেন। তাঁর জবানবন্দিতে ইয়াবা কেনা, মোবাইল ফোন বন্ধক রাখা এবং হত্যাকাণ্ডের পর সেই মোবাইল ছাড়িয়ে নেওয়ার বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য উঠে এসেছে।

রোববার (৬ সেপ্টেম্বর) বিকেলে রংপুর মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালত-২-এর বিচারক মো. রফিকুল ইসলামের আদালতে শান্ত দাসের জবানবন্দি রেকর্ড করা হয়। বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা রংপুর মেট্রোপলিটন পুলিশের গোয়েন্দা শাখার (ডিবি) পরিদর্শক জিন্নাত আলী।

তদন্তকারী কর্মকর্তার ভাষ্য অনুযায়ী, হত্যাকাণ্ডের আগে সিদ্ধার্থ দাস ও মুগ্ধ দাসের সঙ্গে শান্ত দাসের যোগাযোগ হয়। ইয়াবা কেনার সময় সিদ্ধার্থের শরীরে আঁচড়ের দাগ দেখতে পান শান্ত। বিষয়টি অস্বাভাবিক মনে হওয়ায় তিনি সিদ্ধার্থের কাছে আঁচড়ের কারণ জানতে চান।

শান্তের জবানবন্দি অনুযায়ী, এ সময় সিদ্ধার্থ তাঁকে জানান, তিনি গণপতি চক্রবর্তীসহ চারজনকে হত্যা করেছেন। সিদ্ধার্থের মুখে এমন কথা শুনে শান্ত উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েন। পরে তদন্তে তাঁর বক্তব্যকে গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষ্য হিসেবে বিবেচনা করা হয়।

নতুন জবানবন্দিতে ইয়াবা কেনার বিষয়েও বিস্তারিত তথ্য পাওয়া গেছে। একটি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২১ আগস্ট রাতে সিদ্ধার্থ ও মুগ্ধ তিন ধাপে মোট পাঁচটি ইয়াবা কেনেন বলে শান্ত আদালতে জানিয়েছেন। ইয়াবার বিনিময়ে সিদ্ধার্থ তাঁর মোবাইল ফোনটি শান্তের কাছে বন্ধক রাখেন।

শান্তের ভাষ্য অনুযায়ী, মোবাইলের বিপরীতে ৩ হাজার ৫০০ টাকা নেওয়া হয়েছিল। পরে হত্যাকাণ্ডের পরদিন সিদ্ধার্থ সেই টাকা পরিশোধ করে মোবাইল ফোনটি ফেরত নেন। তদন্তে পুলিশের কাছে এ অর্থের উৎস নিয়েও প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।

আরও পড়ুন  চব্বিশের আন্দোলনে শহীদদের আত্মত্যাগ বৃথা যেতে দেবো না, মির্জা ফখরুল

শান্তের জবানবন্দিতে দাবি করা হয়েছে, সিদ্ধার্থ যে টাকা দিয়ে মোবাইল ফোনটি ছাড়িয়ে নেন, সেই টাকা গণপতি চক্রবর্তীর বাড়ি থেকে নেওয়া অর্থের অংশ ছিল। তবে এ বক্তব্য তদন্তে যাচাই করা হচ্ছে।

গত ২১ আগস্ট ভোরে রংপুর নগরের মাছুয়াপাড়ায় নিজ বাড়ি থেকে অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তী, তাঁর স্ত্রী প্রীতিলতা চক্রবর্তী, মেয়ে আগামী চক্রবর্তী এবং ছেলে আয়ুশ চক্রবর্তী প্রিয়মের মরদেহ উদ্ধার করা হয়।

ঘটনার পর এলাকায় ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়। প্রথমদিকে হত্যাকাণ্ডের কারণ নিয়ে নানা প্রশ্ন ওঠে। পরে পুলিশ সিদ্ধার্থ দাস ও মুগ্ধ দাসকে গ্রেপ্তার করে।

পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, গ্রেপ্তারের পর জিজ্ঞাসাবাদে দুজন হত্যাকাণ্ডে জড়িত থাকার কথা স্বীকার করেন। পরে তাঁরা আদালতে ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারায় জবানবন্দিও দেন।

পুলিশের তদন্তে উঠে আসে, হত্যাকাণ্ডের আগে সিদ্ধার্থ ও মুগ্ধ ইয়াবা সেবন করেছিলেন। তদন্তসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বরাত দিয়ে বিভিন্ন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, রাতের কোনো এক সময় তাঁরা গণপতি চক্রবর্তীর বাড়ির ছাদে অবস্থান নেন এবং সেখানে ইয়াবা সেবন করেন।

পরে ভোরের দিকে গণপতি চক্রবর্তী ছাদে গেলে তাঁদের দেখতে পান বলে তদন্তে উঠে এসেছে। এ সময় তিনি তাঁদের ধমক দেন। এরপর নিজেদের পরিচয় প্রকাশ পাওয়ার আশঙ্কায় তাঁরা গণপতিকে হত্যা করেন বলে পুলিশের ভাষ্য।

তদন্তে বলা হয়েছে, গণপতিকে হত্যার পর তাঁর স্ত্রী ও মেয়ে ছাদে এলে তাঁদেরও হত্যা করা হয়। পরে পরিবারের ছোট ছেলেকেও হত্যা করা হয়। হত্যাকাণ্ডের পর ঘটনাটিকে চুরি বা ডাকাতির মতো দেখানোর চেষ্টা করা হয় বলে তদন্তে উঠে এসেছে।

পুলিশের তদন্তে আরও বলা হয়েছে, হত্যাকাণ্ডের পর ঘরের জিনিসপত্র এলোমেলো করা হয়। কিছু স্বর্ণালংকার ও নগদ টাকা নিয়ে যায় আসামিরা। স্বর্ণালংকারের একটি অংশ পরে মাটির নিচে পুঁতে রাখার তথ্যও তদন্তে পাওয়া যায় বলে পুলিশ জানিয়েছে।

আরও পড়ুন  রাজশাহীতে ৩১ কেজি গাঁজাসহ মাদক কারবারি গ্রেপ্তার

তদন্তকারীদের মতে, হত্যাকাণ্ডের প্রকৃত কারণ আড়াল করতেই ঘটনাস্থলে চুরি বা ডাকাতির চিত্র তৈরি করা হয়ে থাকতে পারে। এ বিষয়ে আসামিদের আদালতে দেওয়া জবানবন্দির তথ্যও তদন্তের সঙ্গে মিলিয়ে দেখা হচ্ছে।

হত্যাকাণ্ডের পর সিদ্ধার্থ ও মুগ্ধ মাদক সেবন করেছিলেন কি না, তা নিশ্চিত করতে তাঁদের ডোপ টেস্ট করা হয়। পুলিশের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, দুই আসামির ডোপ টেস্টে মাদকের উপস্থিতি পাওয়া যায়নি।

এ কারণে হত্যাকাণ্ডের সময় তাঁদের শারীরিক অবস্থাসহ ইয়াবা সেবনের বিষয়টি নিয়ে তদন্তে আরও যাচাইয়ের প্রয়োজন দেখা দিয়েছে। আদালতের জবানবন্দি, ময়নাতদন্ত প্রতিবেদন, ফরেনসিক আলামত এবং অন্যান্য সাক্ষ্যের সঙ্গে এসব তথ্য মিলিয়ে দেখছে তদন্তকারী সংস্থা।

শান্ত দাসের ভূমিকা নিয়ে তদন্তে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—তিনি হত্যাকাণ্ডের সরাসরি প্রত্যক্ষদর্শী নন বলে জানা গেছে। তবে হত্যাকাণ্ডের আগে আসামিদের সঙ্গে তাঁর যোগাযোগ ছিল এবং তাঁদের ইয়াবা সরবরাহের বিষয়ে তিনি তথ্য দিয়েছেন। একই সঙ্গে হত্যাকাণ্ডের পর সিদ্ধার্থ তাঁর কাছে চারজনকে হত্যার কথা বলেছেন—এমন দাবিও করেছেন শান্ত।

তাঁর শরীরে থাকা আঁচড়ের দাগ দেখে প্রশ্ন করার পর সিদ্ধার্থের কাছ থেকে হত্যার কথা জানতে পারেন বলে শান্ত আদালতে জানিয়েছেন। ফলে তদন্তে তাঁর বক্তব্যকে গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষ্য হিসেবে দেখা হচ্ছে।

পুলিশ জানিয়েছে, শান্তের বিরুদ্ধে মাদক ব্যবসার অভিযোগ থাকলেও তাঁর নামে কোনো মামলা নেই। তাঁকে আটকের সময়ও কোনো মাদক পাওয়া যায়নি। ফলে এ ঘটনায় তাঁকে গ্রেপ্তার দেখানো হয়নি। তবে তাঁর সঙ্গে আসামিদের যোগাযোগ ও ইয়াবা লেনদেনের বিষয়টি তদন্তের আওতায় রয়েছে।

আরও পড়ুন  চার খুনের আসামিদের বাইরে আনা হয়নি, কারাগারেই ডোপ টেস্ট

রংপুরের এই চার খুনের ঘটনায় শুরু থেকেই হত্যার কারণ নিয়ে একাধিক প্রশ্ন রয়েছে। প্রথমদিকে ইয়াবা সেবনের বিষয়টি সামনে এলেও পরবর্তী তদন্তে জমি-সংক্রান্ত বিরোধ, পুরোনো ক্ষোভ এবং পারিবারিক বা সামাজিক বিরোধের বিষয়ও খতিয়ে দেখার কথা জানিয়েছে পুলিশ।

গণপতি চক্রবর্তীর বাড়ি যে জমিতে নির্মাণ করা হয়েছিল, সেটি আগে সিদ্ধার্থদের পূর্বপুরুষদের মালিকানাধীন ছিল বলে তদন্তে তথ্য উঠে এসেছে। এই বিষয়টিও হত্যাকাণ্ডের সম্ভাব্য কারণ হিসেবে তদন্তকারীরা যাচাই করছেন।

এ ছাড়া ঘটনাস্থল থেকে পাওয়া আলামত, ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন, আসামিদের জবানবন্দি এবং সাক্ষীদের বক্তব্য পরস্পরের সঙ্গে মিলিয়ে দেখা হচ্ছে।

শান্ত দাসের ১৬৪ ধারার জবানবন্দি মামলার তদন্তে নতুন একটি মাত্রা যোগ করেছে। বিশেষ করে হত্যাকাণ্ডের আগে আসামিদের ইয়াবা কেনা এবং হত্যাকাণ্ডের পর মোবাইল ফোন ছাড়িয়ে নেওয়ার অর্থের উৎস সম্পর্কে তাঁর বক্তব্য তদন্তকারীদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে।

তবে আদালতে কোনো সাক্ষীর দেওয়া বক্তব্য বা আসামির জবানবন্দি একাই মামলার চূড়ান্ত সত্য প্রমাণ করে না। এসব তথ্যের সঙ্গে ফরেনসিক আলামত, ময়নাতদন্ত, অন্যান্য সাক্ষ্য ও তদন্তের ফলাফল মিলিয়ে ঘটনার প্রকৃত চিত্র নির্ধারণ করা হবে।

রংপুর নগরের মাছুয়াপাড়ার এই চার হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় ইতোমধ্যে গ্রেপ্তার দুই আসামিকে জেলগেটে জিজ্ঞাসাবাদও করেছে পুলিশ। নতুন তথ্য পাওয়ার পর তদন্ত আরও এগিয়ে নিতে তাঁদের জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে।

ফলে শান্ত দাসের জবানবন্দির পর এখন তদন্তকারীদের সামনে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো—হত্যাকাণ্ডের আগে ও পরে আসামিদের গতিবিধি, ইয়াবা কেনাবেচা, লুট করা অর্থের ব্যবহার এবং চার হত্যার প্রকৃত উদ্দেশ্য পরস্পরের সঙ্গে কতটা সম্পর্কিত। এসব প্রশ্নের উত্তর মিললেই আলোচিত এই চার খুনের রহস্য আরও পরিষ্কার হবে।