সাগর-রুনি হত্যা তদন্ত আবারও আলোচনায় এসেছে নতুন এক কারণে। প্রায় দেড় দশক পেরিয়ে গেলেও দেশের অন্যতম আলোচিত এই হত্যাকাণ্ডের রহস্য এখনো উন্মোচিত হয়নি। এবার তদন্তে নতুন করে বাধা হিসেবে সামনে এসেছে আগের তদন্ত কর্মকর্তাদের অনুপস্থিতি এবং গুরুত্বপূর্ণ নথিপত্রের ঘাটতি।
বুধবার সকালে অ্যাটর্নি জেনারেলের কার্যালয়ে সাংবাদিক দম্পতি সাগর সরওয়ার ও মেহেরুন রুনির ছেলে মেঘ এবং মামলার বাদী নওশের রোমানের সঙ্গে বৈঠক শেষে বিষয়টি নিয়ে কথা বলেন অ্যাটর্নি জেনারেল মোহাম্মদ রুহুল কুদ্দুস কাজল। তিনি জানান, বর্তমান তদন্তকারী টাস্কফোর্স অতীতের তদন্ত কার্যক্রমের সঙ্গে যুক্ত অনেক কর্মকর্তার সন্ধান পাচ্ছে না।
তার ভাষ্য অনুযায়ী, ঘটনার পর যেসব কর্মকর্তা ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য ঘটনাস্থলে কাজ করেছিলেন, তাদের অনেকের অবস্থান সম্পর্কে নিশ্চিত তথ্য পাওয়া যাচ্ছে না। ফলে তদন্তের ধারাবাহিকতা বজায় রাখা কঠিন হয়ে পড়েছে। শুধু তাই নয়, মামলার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কিছু গুরুত্বপূর্ণ আলামত ও নথিও নতুন তদন্ত দলের হাতে পুরোপুরি পৌঁছেনি।
তদন্ত সংশ্লিষ্টদের মতে, যেকোনো বড় অপরাধ তদন্তে ধারাবাহিকতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। প্রাথমিক পর্যায়ের তথ্য, আলামত সংগ্রহের বিবরণ এবং সাক্ষ্য বিশ্লেষণের ওপরই পরবর্তী তদন্তের ভিত্তি দাঁড়িয়ে থাকে। সেই জায়গায় ঘাটতি তৈরি হলে তদন্তের গতি স্বাভাবিকভাবেই বাধাগ্রস্ত হয়।
তবে এসব সীমাবদ্ধতার মধ্যেও তদন্ত কার্যক্রম বন্ধ হয়নি বলে জানিয়েছেন অ্যাটর্নি জেনারেল। তিনি বলেন, বিচারিক প্রক্রিয়া এগিয়ে নিতে টাস্কফোর্স কাজ চালিয়ে যাচ্ছে এবং মামলার অগ্রগতির জন্য প্রয়োজনীয় সহযোগিতা অব্যাহত রয়েছে। এ সময় সাগর-রুনির ছেলে মেঘ তার বাবা-মায়ের হত্যার বিচার দাবি করলে তাকে আশ্বস্ত করা হয়।
অন্যদিকে বাদীপক্ষের আইনজীবী শিশির মনির জানিয়েছেন, অতীতে সংগৃহীত কিছু গুরুত্বপূর্ণ তথ্য এখনো মামলার নথিতে রয়েছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য একটি ডিএনএ পরীক্ষার রিপোর্ট বিদেশের একটি বিশেষায়িত প্রতিষ্ঠানে সম্পন্ন হয়েছিল। এসব তথ্য সঠিকভাবে মূল্যায়ন ও বিশ্লেষণ করা হলে তদন্তে নতুন অগ্রগতি আসতে পারে বলে মনে করছেন তিনি।
তিনি আরও বলেন, তদন্তের বর্তমান অবস্থা সম্পর্কে পরিবার ও জনগণকে নিয়মিত অবহিত করা হলে মামলাটি নিয়ে নতুন করে আস্থা তৈরি হবে। দীর্ঘ সময় ধরে বিচারপ্রক্রিয়া ঝুলে থাকায় ভুক্তভোগী পরিবার যেমন হতাশ, তেমনি সাধারণ মানুষের মধ্যেও নানা প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।
উল্লেখ্য, ২০১২ সালের ১১ ফেব্রুয়ারি রাজধানীর পূর্ব রাজাবাজারের বাসায় নির্মমভাবে খুন হন সাংবাদিক দম্পতি সাগর সরওয়ার ও মেহেরুন রুনি। দেশের গণমাধ্যম জগতে এই হত্যাকাণ্ড ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করেছিল। ঘটনার পর বিভিন্ন সময়ে একাধিক সংস্থা তদন্ত করলেও এখন পর্যন্ত হত্যার উদ্দেশ্য কিংবা প্রকৃত অপরাধীদের শনাক্ত করা সম্ভব হয়নি।
উচ্চ আদালতের নির্দেশে প্রায় এক বছর আগে একটি উচ্চপর্যায়ের টাস্কফোর্স গঠন করা হয়। প্রত্যাশা ছিল, নতুন তদন্ত দল হয়তো মামলার জট খুলতে সক্ষম হবে। তবে সর্বশেষ তথ্য বলছে, পুরোনো তদন্তের নথি, আলামত এবং সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের খুঁজে না পাওয়ায় তাদের কাজও কঠিন হয়ে পড়েছে।
সাগর-রুনি হত্যা তদন্ত মামলাটি শুধু একটি হত্যাকাণ্ডের বিচার নয়, এটি দেশের বিচারব্যবস্থা, তদন্ত সক্ষমতা এবং আইনের শাসনের সঙ্গে জড়িত একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। তাই মামলাটির দ্রুত ও নিরপেক্ষ তদন্ত সম্পন্ন করে প্রকৃত অপরাধীদের বিচারের মুখোমুখি করার দাবি এখনো জোরালোভাবে উঠে আসছে।
পরিবারের সদস্য, সাংবাদিক সমাজ এবং মানবাধিকার কর্মীরা মনে করেন, এই মামলার সুষ্ঠু সমাধান দেশের বিচার ব্যবস্থার প্রতি মানুষের আস্থা আরও শক্তিশালী করবে। দীর্ঘ প্রতীক্ষার পরও তারা এখনো ন্যায়বিচারের আশায় অপেক্ষা করছেন।





















