শরীয়তপুরের ভেদরগঞ্জ উপজেলার একটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ছুটি নিয়ে বিরোধের জেরে প্রধান শিক্ষককে মারধরের অভিযোগ উঠেছে এক সহকারী শিক্ষকের বিরুদ্ধে। ঘটনার ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর বিষয়টি নিয়ে ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়েছে। অভিযোগের পর প্রশাসন তিন সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করেছে।
ঘটনাটি উপজেলার আব্বাস আলী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ঘটেছে। প্রধান শিক্ষক আলী আসাদ মিয়া এ ঘটনায় থানায় এবং উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) বরাবর লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন।
কীভাবে ঘটনার সূত্রপাত:
বিদ্যালয় ও শিক্ষা বিভাগ সূত্রে জানা যায়, ২০২৪ সালের মে মাসে আলী আসাদ মিয়া ওই বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক হিসেবে যোগ দেন। অন্যদিকে, সহকারী শিক্ষক দেলোয়ার হোসেন ২০২৩ সালের জানুয়ারিতে একই বিদ্যালয়ে যোগদান করেন।
স্থানীয় সূত্র বলছে, ব্যক্তিগত ও পারিবারিক বিভিন্ন বিষয়কে কেন্দ্র করে দীর্ঘদিন ধরেই দুই শিক্ষকের মধ্যে মতবিরোধ চলছিল। একপর্যায়ে দেলোয়ার হোসেনকে ছয় মাসের জন্য পাশের ছুরিরচর বোর্ড সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে প্রেষণে পাঠানো হয়। তবে চলতি বছরের জানুয়ারিতে তিনি আবার আগের কর্মস্থলে ফিরে আসেন।
ছুটির আবেদনকে কেন্দ্র করে উত্তেজনা:
প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্য অনুযায়ী, বৃহস্পতিবার সকাল প্রায় ৯টার দিকে দেলোয়ার হোসেন প্রধান শিক্ষকের কক্ষে গিয়ে ছুটির আবেদন করেন।
সেদিন শিক্ষকদের একটি নির্ধারিত সরকারি সভা থাকায় প্রধান শিক্ষক ছুটি মঞ্জুর করতে অস্বীকৃতি জানান। এরপর দুজনের মধ্যে কথা-কাটাকাটি শুরু হয়। একপর্যায়ে পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠে এবং প্রধান শিক্ষককে শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত করার ঘটনা ঘটে বলে অভিযোগ।
পরে বিদ্যালয়ের অন্যান্য শিক্ষক ও কর্মচারীরা এগিয়ে এসে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনেন।
ভাইরাল ভিডিওতে যা দেখা গেছে:
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ১ মিনিট ৪৪ সেকেন্ডের একটি ভিডিওতে দেখা যায়, প্রধান শিক্ষক তার কক্ষে অন্য শিক্ষক ও অফিস সহকারীকে নিয়ে দাপ্তরিক কাজ করছিলেন।
এ সময় দেলোয়ার হোসেন তার শিশুসন্তানকে সঙ্গে নিয়ে কক্ষে প্রবেশ করেন। কিছুক্ষণ কথাবার্তার পর দুজনের মধ্যে তর্ক শুরু হয়। পরে সহকারী শিক্ষক প্রধান শিক্ষককে শারীরিকভাবে আক্রমণ করেন বলে ভিডিওতে দেখা যায়।
ভিডিওতে আরও দেখা যায়, প্রধান শিক্ষক কক্ষ থেকে বেরিয়ে গেলে অভিযুক্ত শিক্ষক কক্ষের চেয়ার ও কিছু কাগজপত্র ছুড়ে ফেলেন। ভিডিওটি ছড়িয়ে পড়ার পর স্থানীয়দের পাশাপাশি শিক্ষা মহলেও ব্যাপক প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়েছে।
প্রধান শিক্ষকের অভিযোগ:
প্রধান শিক্ষক আলী আসাদ মিয়া দাবি করেন, অভিযুক্ত শিক্ষক প্রায়ই বিভিন্ন অজুহাতে বিদ্যালয়ে অনুপস্থিত থাকতেন এবং সহকর্মীদের সঙ্গে অশোভন আচরণ করতেন।
তার ভাষ্য অনুযায়ী, এসব আচরণের কারণেই আগে তাকে অন্য বিদ্যালয়ে প্রেষণে পাঠানো হয়েছিল। ঘটনার দিন শিক্ষকদের গুরুত্বপূর্ণ সভা থাকায় ছুটি দেওয়া সম্ভব হয়নি। এতে ক্ষুব্ধ হয়ে সহকারী শিক্ষক তার ওপর হামলা চালান।
অভিযুক্ত শিক্ষকের বক্তব্য:
অভিযোগ পুরোপুরি অস্বীকার না করে সহকারী শিক্ষক দেলোয়ার হোসেন বলেন, প্রধান শিক্ষকের সঙ্গে দীর্ঘদিনের বিরোধের কারণে তার পারিবারিক জীবন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
তার দাবি, তিনি স্ত্রী থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে সন্তানদের নিয়ে মানবেতর জীবনযাপন করছেন। ঘটনার দিন অসুস্থ শিশুসন্তানকে চিকিৎসকের কাছে নেওয়ার জন্য ছুটি চেয়েছিলেন। ছুটি না পেয়ে উত্তেজিত হয়ে আত্মনিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলেন।
প্রশাসনের পদক্ষেপ:
উপজেলা সহকারী প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা আল মুজাহিদ জানান, অভিযোগের বিষয়ে সরেজমিন তদন্ত করা হয়েছে। তদন্ত প্রতিবেদন জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তার কাছে পাঠানো হবে। প্রতিবেদনের ভিত্তিতে পরবর্তী প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
এদিকে ভেদরগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) আবুবকর সিদ্দিক বলেন, অভিযোগ পাওয়ার পর তিন সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। তদন্ত প্রতিবেদন হাতে পাওয়ার পর প্রয়োজনীয় বিভাগীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালকের কাছে সুপারিশ পাঠানো হবে।
তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত অভিযোগ প্রমাণিত নয়:
প্রশাসনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, তদন্ত শেষ হওয়ার আগে কারও বিরুদ্ধে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো হচ্ছে না। তদন্ত প্রতিবেদনের ভিত্তিতেই পরবর্তী বিভাগীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।


























