নারায়ণগঞ্জের আড়াইহাজার উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে এক স্বাস্থ্যকর্মীকে মারধরের অভিযোগকে কেন্দ্র করে চরম উত্তেজনার সৃষ্টি হয়েছে। অভিযোগ উঠেছে, উপজেলা বিএনপির সভাপতি ইউসুফ আলী ভূঁইয়ার ছোট ভাই বিল্লাল হোসেন ও তাঁর সঙ্গে থাকা কয়েকজন হাসপাতালের জরুরি বিভাগের দায়িত্বে থাকা এক স্বাস্থ্যকর্মীর ওপর হামলা চালান। ঘটনার প্রতিবাদে চিকিৎসকেরা কয়েক ঘণ্টা কর্মবিরতি পালন করলে হাসপাতালের বহির্বিভাগসহ বিভিন্ন সেবা ব্যাহত হয়।
কীভাবে ঘটনার সূত্রপাত?
হাসপাতাল সূত্রে জানা যায়, রোববার (৫ জুলাই) সকাল সাড়ে ৮টার দিকে উপজেলার চামুরকান্দি এলাকার বাসিন্দা ফিরোজা বেগম পেটব্যথার সমস্যা নিয়ে আড়াইহাজার উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের জরুরি বিভাগে আসেন। তিনি বিল্লাল হোসেনের স্ত্রী।
জরুরি বিভাগের দায়িত্বে থাকা উপসহকারী কমিউনিটি মেডিক্যাল কর্মকর্তা আবদুল্লাহ আল কামাল রোগীকে প্রাথমিকভাবে পরীক্ষা করে প্রয়োজনীয় ইনজেকশন বাইরে থেকে কিনে আনতে বলেন। বিল্লাল হোসেন ইনজেকশন সংগ্রহ করতে গেলে এ সময় জরুরি বিভাগে আরেকজন গুরুতর অসুস্থ রোগী এসে পৌঁছান।
স্বাস্থ্যকর্মী আবদুল্লাহ আল কামাল গুরুতর রোগীর চিকিৎসা শুরু করলে বিল্লাল হোসেন ফিরে এসে অপেক্ষা করতে হয়। অভিযোগ অনুযায়ী, এ নিয়ে উভয়ের মধ্যে বাকবিতণ্ডা শুরু হয় এবং একপর্যায়ে তা হাতাহাতিতে রূপ নেয়।
মারধরের অভিযোগ
চিকিৎসকদের দাবি, কথাকাটাকাটির একপর্যায়ে বিল্লাল হোসেন ও তাঁর সঙ্গে থাকা কয়েকজন আবদুল্লাহ আল কামালের ওপর হামলা চালান। তাঁকে কিল-ঘুষি ও লাথি মেরে গুরুতর আহত করা হয়।
সহকর্মীরা আহত স্বাস্থ্যকর্মীকে উদ্ধার করে প্রথমে হাসপাতালেই চিকিৎসা দেন। পরে তাঁর শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে তাঁকে জাতীয় নিউরোসায়েন্স ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালে নেওয়া হয়। সেখানে শয্যা খালি না থাকায় পরবর্তীতে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়।
চিকিৎসকদের কর্মবিরতি
ঘটনার পর হাসপাতালের চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীরা নিরাপত্তাহীনতার অভিযোগ তুলে তাৎক্ষণিক কর্মবিরতি শুরু করেন।
তবে জরুরি বিভাগের সেবা চালু রাখা হলেও বহির্বিভাগ, সাধারণ চিকিৎসাসেবা এবং অন্যান্য বিভাগে রোগী দেখা সাময়িকভাবে বন্ধ রাখা হয়। ফলে সকাল থেকে চিকিৎসা নিতে আসা শতাধিক রোগী চরম ভোগান্তিতে পড়েন। অনেকে চিকিৎসা না পেয়েই বাড়ি ফিরে যেতে বাধ্য হন, আবার কেউ কেউ অন্য হাসপাতালে চলে যান।
প্রশাসনের হস্তক্ষেপ
ঘটনার খবর পেয়ে আড়াইহাজার উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) আসাদুর রহমান এবং আড়াইহাজার থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) সবজেল হোসেন হাসপাতালে যান।
তারা চিকিৎসকদের সঙ্গে বৈঠক করে ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত এবং জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস দেন। প্রশাসনের এই আশ্বাসের পর চিকিৎসকেরা দুপুর ১টার দিকে কর্মবিরতি প্রত্যাহার করেন এবং হাসপাতালের চিকিৎসাসেবা ধীরে ধীরে স্বাভাবিক হয়।
পুলিশের বক্তব্য
আড়াইহাজার থানার ওসি সবজেল হোসেন বলেন, হাসপাতালের একজন স্বাস্থ্যকর্মীকে মারধরের বিষয়টি পুলিশ জেনেছে।
তিনি জানান, এখন পর্যন্ত থানায় কোনো লিখিত অভিযোগ জমা পড়েনি। অভিযোগ পাওয়ার পর তদন্ত করে আইন অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
বিএনপি নেতার পরিবারের দাবি
অন্যদিকে অভিযোগ অস্বীকার করেছেন আড়াইহাজার উপজেলা বিএনপির সভাপতি ইউসুফ আলী ভূঁইয়া।
তিনি দাবি করেন, তাঁর ছোট ভাইয়ের স্ত্রী ফিরোজা বেগমকে অচেতন অবস্থায় হাসপাতালে নেওয়া হয়েছিল। কিন্তু সেখানে দায়িত্বপ্রাপ্ত চিকিৎসক উপস্থিত ছিলেন না এবং চিকিৎসকের সহকারী যথাযথ চিকিৎসা না দিয়ে তাঁদের বের করে দেন।
তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, এ নিয়ে উভয় পক্ষের মধ্যে ধাক্কাধাক্কির ঘটনা ঘটে। তবে কোনো মারধর করা হয়নি। পরে চিকিৎসকেরা মারধরের অভিযোগ তুলে কর্মবিরতি শুরু করেন।
তিনি আরও জানান, বর্তমানে তাঁর ভাইয়ের স্ত্রী একই হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন এবং হাসপাতালের চিকিৎসাসেবা স্বাভাবিকভাবে চলছে।
হাসপাতালের নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন
এই ঘটনার পর সরকারি হাসপাতালের চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীদের নিরাপত্তা নিয়ে আবারও উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। চিকিৎসকদের মতে, হাসপাতালের জরুরি বিভাগে প্রতিদিন বিপুলসংখ্যক রোগী আসায় অনেক সময় রোগীর স্বজনদের সঙ্গে ভুল বোঝাবুঝি তৈরি হয়। কিন্তু সেই পরিস্থিতি যেন কখনোই হামলা বা সহিংসতায় রূপ না নেয়, সে জন্য হাসপাতালগুলোতে আরও কার্যকর নিরাপত্তা ব্যবস্থা প্রয়োজন।
আইনি দিক
আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, সরকারি দায়িত্ব পালনরত কোনো চিকিৎসক বা স্বাস্থ্যকর্মীর ওপর হামলার অভিযোগ প্রমাণিত হলে দণ্ডবিধির পাশাপাশি সরকারি কাজে বাধা প্রদান, সরকারি কর্মচারীর ওপর হামলা এবং সংশ্লিষ্ট অন্যান্য ধারায় মামলা হতে পারে। লিখিত অভিযোগ পাওয়ার পর পুলিশ তদন্ত করে পরবর্তী আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।
বর্তমান পরিস্থিতি
- আহত স্বাস্থ্যকর্মী আবদুল্লাহ আল কামাল ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন।
- কয়েক ঘণ্টার কর্মবিরতির পর আড়াইহাজার উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চিকিৎসাসেবা পুনরায় স্বাভাবিক হয়েছে।
- পুলিশ এখনো লিখিত অভিযোগের অপেক্ষায় রয়েছে।
- ঘটনার দুটি ভিন্ন বক্তব্য সামনে এসেছে—একদিকে স্বাস্থ্যকর্মী ও চিকিৎসকদের মারধরের অভিযোগ, অন্যদিকে অভিযুক্ত পক্ষ ধাক্কাধাক্কির কথা স্বীকার করলেও মারধরের অভিযোগ অস্বীকার করেছে।
- প্রশাসন ঘটনার তদন্ত করে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস দিয়েছে।




























