তিন দশক আগে ঢাকাই চলচ্চিত্রের জনপ্রিয় নায়ক সালমান শাহর রহস্যজনক মৃত্যুকে ঘিরে শুরু হওয়া আইনি লড়াই এখনও শেষ হয়নি। ১৯৯৬ সালের ৬ সেপ্টেম্বর মৃত্যুর পর থেকে তাঁর পরিবার দাবি করে আসছে, সালমান শাহ আত্মহত্যা করেননি, তাকে পরিকল্পিতভাবে হত্যা করা হয়েছে। দীর্ঘ ৩০ বছরে একাধিক তদন্ত হলেও মৃত্যুর প্রকৃত কারণ নিয়ে বিতর্কের অবসান হয়নি।
সালমান শাহর মৃত্যুর ঘটনায় পুলিশের একাধিক তদন্ত প্রতিবেদনে আত্মহত্যার কথা বলা হলেও এসব প্রতিবেদন মেনে নেয়নি তাঁর পরিবার। সর্বশেষ দীর্ঘ আইনি প্রক্রিয়ার পর ২০২৫ সালের অক্টোবরে আদালতের নির্দেশে ঘটনাটি হত্যা মামলা হিসেবে নতুন করে তদন্তের আওতায় আসে। এরপর সালমান শাহর মামা মোহাম্মদ আলমগীর কুমকুম বাদী হয়ে রমনা থানায় হত্যা মামলা করেন। মামলায় সালমান শাহর সাবেক স্ত্রী সামিরা হকসহ ১১ জনকে আসামি করা হয়েছে।
১৯৯৬ সালের ৬ সেপ্টেম্বর ঢাকার ইস্কাটনের বাসায় মৃত অবস্থায় পাওয়া যায় চিত্রনায়ক সালমান শাহকে। তাঁর মৃত্যু প্রথমে অপমৃত্যু হিসেবে নথিভুক্ত হয়। পরে ঘটনাটি নিয়ে তদন্ত শুরু হয়। কিন্তু সময় গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে তাঁর মৃত্যু আত্মহত্যা নাকি হত্যাকাণ্ড—এ নিয়ে নানা প্রশ্ন ও বিতর্ক তৈরি হয়।
তদন্ত সংস্থাগুলোর প্রতিবেদনে বারবার আত্মহত্যার কথা উঠে এলেও সালমান শাহর পরিবার তা প্রত্যাখ্যান করে আসছে। পরিবারের পক্ষ থেকে দীর্ঘদিন ধরে দাবি করা হচ্ছে, ঘটনার পেছনে হত্যার ষড়যন্ত্র ছিল এবং সঠিক তদন্ত হলে মৃত্যুর প্রকৃত রহস্য বেরিয়ে আসবে।
সালমান শাহর মৃত্যুর ঘটনায় ১৯৯৭ সালের ৩ নভেম্বর সিআইডি আদালতে চূড়ান্ত প্রতিবেদন দেয়। সেখানে তাঁর মৃত্যুকে আত্মহত্যা হিসেবে উল্লেখ করা হয়। ওই প্রতিবেদনের বিরুদ্ধে সালমান শাহর বাবা রিভিশন আবেদন করেন। পরে ২০০৩ সালে মামলাটি বিচার বিভাগীয় তদন্তে পাঠানো হয়।
দীর্ঘ সময় পর ২০১৪ সালের ৩ আগস্ট বিচার বিভাগীয় তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল করা হয়। সেখানেও সালমান শাহ আত্মহত্যা করেছেন বলে উল্লেখ করা হয় এবং আত্মহত্যার পেছনে কয়েকটি কারণের কথা বলা হয়।
এরপরও বিষয়টির নিষ্পত্তি হয়নি। সালমান শাহর পরিবার তদন্ত প্রতিবেদনের বিরুদ্ধে নারাজি আবেদন করে। পরবর্তী সময়ে মামলাটি র্যাব ও পিবিআইয়ের কাছেও তদন্তের জন্য যায়। পিবিআই ২০২০ সালের ফেব্রুয়ারিতে দেওয়া চূড়ান্ত প্রতিবেদনেও সালমান শাহকে হত্যার প্রমাণ পাওয়া যায়নি বলে উল্লেখ করে।
দীর্ঘ আইনি প্রক্রিয়ার পর ২০২৫ সালের ২০ অক্টোবর ঢাকার ষষ্ঠ অতিরিক্ত মহানগর দায়রা জজ আদালত সালমান শাহর মৃত্যুর ঘটনায় হত্যা মামলা করার নির্দেশ দেন। পরদিন রমনা থানায় হত্যা মামলা করেন তাঁর মামা মোহাম্মদ আলমগীর কুমকুম।
মামলায় দণ্ডবিধির ৩০২ ও ৩৪ ধারায় অভিযোগ আনা হয়েছে। আসামিদের মধ্যে রয়েছেন সালমান শাহর সাবেক স্ত্রী সামিরা হক, সামিরার মা লতিফা হক লুসি, ব্যবসায়ী ও সাবেক চলচ্চিত্র প্রযোজক আজিজ মোহাম্মদ ভাই, খল অভিনেতা আশরাফুল হক ডনসহ মোট ১১ জন।
নতুন হত্যা মামলার তদন্তের মধ্যেই গত আগস্টে বিমানবন্দর থেকে গ্রেপ্তার হন মামলার অন্যতম আসামি খল অভিনেতা মোহাম্মদ আশরাফুল হক ডন। সৌদি আরবে যাওয়ার উদ্দেশ্যে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে গেলে ইমিগ্রেশন পুলিশ তাঁকে আটক করে। পরে তাঁকে সিআইডির কাছে হস্তান্তর করা হয়। তাঁর বিদেশযাত্রায় আগে থেকেই নিষেধাজ্ঞা ছিল।
গ্রেপ্তারের পর ডনকে আদালতে হাজির করা হলে তাঁকে কারাগারে পাঠানোর আদেশ দেওয়া হয়। পরে তদন্তের স্বার্থে তাঁকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য রিমান্ডে নেওয়া হয়। ২৭ আগস্ট আদালত ডনকে পাঁচ দিনের রিমান্ডে পাঠান।
ডন গ্রেপ্তার হলেও মামলার অন্য আসামিদের গ্রেপ্তার না করায় প্রশ্ন তুলেছেন সালমান শাহর মা নীলা চৌধুরী। বর্তমানে তিনি লন্ডনে অবস্থান করছেন।
গণমাধ্যমকে নীলা চৌধুরী বলেন, তিনি এখনও আশায় আছেন যে মামলার তদন্ত শেষ হবে এবং বিচার হবে। তাঁর প্রশ্ন, যেসব আসামির দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞা রয়েছে এবং যারা দেশে অবস্থান করছেন, তাদের কেন গ্রেপ্তার করা হচ্ছে না।
তিনি আরও বলেন, আসামিদের গ্রেপ্তার করে জিজ্ঞাসাবাদ করা হলে সালমান শাহর মৃত্যুর সঙ্গে সম্পর্কিত অনেক তথ্য বেরিয়ে আসতে পারে। তদন্ত সংস্থা দ্রুত অন্য আসামিদের গ্রেপ্তার করে তদন্ত শেষ করবে—এমন প্রত্যাশাও জানিয়েছেন তিনি।
মামলার বাদী ও সালমান শাহর মামা মোহাম্মদ আলমগীর কুমকুমও দ্রুত তদন্ত শেষ করে বিচার প্রক্রিয়া এগিয়ে নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন।
তাঁর মতে, দীর্ঘদিন ধরে সালমান শাহর মৃত্যুর রহস্য নিয়ে মানুষের মধ্যে প্রশ্ন রয়েছে। তাই নতুন করে যে হত্যা মামলা হয়েছে, সেটির নিরপেক্ষ ও সুষ্ঠু তদন্ত হওয়া প্রয়োজন। শুধু পরিবার নয়, দেশের বিপুলসংখ্যক সালমান শাহভক্তও এই ঘটনার প্রকৃত রহস্য জানতে চান।
নতুন হত্যা মামলার তদন্ত এখনও শেষ হয়নি। এর আগে কয়েক দফা তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেওয়ার তারিখ নির্ধারণ করা হলেও তদন্ত কর্মকর্তা প্রতিবেদন দিতে পারেননি।
সর্বশেষ ৩০ আগস্ট তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেওয়ার কথা থাকলেও তা দাখিল করা হয়নি। পরে আদালত আগামী ২৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬ তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলের নতুন তারিখ নির্ধারণ করেন। মামলাটি বর্তমানে সিআইডি তদন্ত করছে।
ফলে তিন দশক ধরে চলা সালমান শাহর মৃত্যুর রহস্যের সমাধানে এখন সবার নজর তদন্ত প্রতিবেদনের দিকে। নতুন তদন্তে কী তথ্য উঠে আসে এবং সালমান শাহর মৃত্যুর ঘটনায় দায় কার—তা আদালতের পরবর্তী কার্যক্রম ও তদন্তের ফলাফলের ওপর নির্ভর করছে।
সালমান শাহর মৃত্যুর ৩০ বছর পূর্ণ হলেও তাঁর পরিবার এখনও বিচারের অপেক্ষায়। একদিকে পুরোনো তদন্ত প্রতিবেদনে আত্মহত্যার কথা বলা হয়েছে, অন্যদিকে পরিবার শুরু থেকেই হত্যার অভিযোগ করে আসছে।
নতুন হত্যা মামলায় একজন আসামি গ্রেপ্তার, রিমান্ড এবং চলমান তদন্তকে ঘিরে সালমান শাহর পরিবার ও ভক্তদের মধ্যে নতুন করে প্রত্যাশা তৈরি হয়েছে। তবে আদালতে অভিযোগ প্রমাণিত না হওয়া পর্যন্ত কোনো আসামিকেই দোষী বলা যাচ্ছে না।
এখন পরিবারের প্রধান প্রত্যাশা—তদন্ত যেন নিরপেক্ষভাবে শেষ হয়, প্রকৃত ঘটনা সামনে আসে এবং আদালতের মাধ্যমে দীর্ঘদিনের এই মৃত্যুরহস্যের আইনগত নিষ্পত্তি হয়।





























