শরীয়তপুরের নড়িয়া উপজেলায় পদ্মা নদী থেকে পলিব্যাগে মোড়ানো অবস্থায় অজ্ঞাত এক ব্যক্তির খণ্ডিত হাত-পা উদ্ধার করেছে পুলিশ। শুক্রবার দুপুরে উপজেলার কেদারপুর ইউনিয়নের ওয়াপদা সংলগ্ন নদীতীরে ভেসে আসা একটি সাদা পলিব্যাগ ঘিরে স্থানীয়দের মধ্যে চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়। পরে পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে পলিব্যাগ খুলে দুটি হাত ও দুটি পা উদ্ধার করে।
পুলিশ জানিয়েছে, উদ্ধার হওয়া অঙ্গ-প্রত্যঙ্গগুলো অর্ধগলিত অবস্থায় ছিল। প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে, কয়েকদিন আগে হত্যার পর মরদেহের অংশগুলো নদীতে ফেলে দেওয়া হয়েছিল। পরিচয় শনাক্ত ও ঘটনার রহস্য উদ্ঘাটনে ইতোমধ্যে সিআইডির ফরিদপুর টিমকে অবহিত করা হয়েছে।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, শুক্রবার দুপুর আনুমানিক ৩টার দিকে কয়েকজন জেলে ও স্থানীয় বাসিন্দা পদ্মা নদীর তীরে একটি সাদা রঙের পলিব্যাগ দেখতে পান। পলিব্যাগটি নদীর পাড়ের একটি কংক্রিট ব্লকের সঙ্গে আটকে ছিল। প্রথমে বিষয়টি সাধারণ কিছু মনে হলেও পরে ব্যাগটি থেকে দুর্গন্ধ বের হতে থাকলে তাদের সন্দেহ হয়।
এরপর স্থানীয়রা দ্রুত নড়িয়া থানা পুলিশকে খবর দেন। খবর পেয়ে পুলিশ ও সুরেশ্বর নৌ পুলিশ ফাঁড়ির সদস্যরা ঘটনাস্থলে পৌঁছান। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা পলিব্যাগটি উদ্ধার করে খুললে ভেতরে মানুষের হাত ও পা দেখতে পান। ঘটনাটি মুহূর্তেই এলাকায় আতঙ্ক ছড়িয়ে দেয়।
উদ্ধার হওয়া হাত দুটি কনুই পর্যন্ত এবং পা দুটি হাঁটু পর্যন্ত ছিল বলে জানিয়েছে পুলিশ। অঙ্গগুলোতে পচন ধরেছিল, যা দেখে ধারণা করা হচ্ছে বেশ কিছুদিন আগে সেগুলো পানিতে ফেলা হয়েছিল। পানির স্রোতে ভেসে এসে সেগুলো ওয়াপদা এলাকার তীরে আটকে যায়।
সুরেশ্বর নৌ পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ আব্দুল জলিল জানান, স্থানীয়দের তথ্যের ভিত্তিতে ঘটনাস্থলে গিয়ে খণ্ডিত অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ উদ্ধার করা হয়েছে। বিষয়টি অত্যন্ত স্পর্শকাতর হওয়ায় গুরুত্ব সহকারে তদন্ত শুরু করা হয়েছে। মরদেহের বাকি অংশ উদ্ধারে আশপাশের এলাকায়ও তল্লাশি চালানো হচ্ছে।
তিনি আরও বলেন, ঘটনাস্থলে সুরতহাল প্রতিবেদন প্রস্তুত করা হয়েছে। উদ্ধার হওয়া অঙ্গগুলো ময়নাতদন্তের জন্য পাঠানোর প্রক্রিয়া চলছে। ডিএনএ পরীক্ষার মাধ্যমে নিহত ব্যক্তির পরিচয় শনাক্তের বিষয়টিও বিবেচনায় রাখা হচ্ছে।
পুলিশের ধারণা, এটি একটি পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড হতে পারে। হত্যার পর পরিচয় গোপন করতে মরদেহ খণ্ডিত করে নদীতে ফেলে দেওয়া হয়েছে বলে প্রাথমিকভাবে সন্দেহ করা হচ্ছে। তবে তদন্তের আগে নিশ্চিতভাবে কিছু বলা সম্ভব নয় বলে জানিয়েছে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।
স্থানীয় বাসিন্দাদের ভাষ্য, পদ্মা নদীতে মাঝেমধ্যে দুর্ঘটনায় লাশ ভেসে আসলেও এভাবে খণ্ডিত অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ উদ্ধারের ঘটনা খুবই বিরল। এমন নৃশংস ঘটনার খবর এলাকায় ছড়িয়ে পড়ার পর সাধারণ মানুষের মধ্যে আতঙ্ক ও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে নারী ও শিশুদের নিরাপত্তা নিয়ে অনেকে শঙ্কা প্রকাশ করেছেন।
ঘটনাস্থলে ভিড় করা কয়েকজন স্থানীয় বলেন, পলিব্যাগের ভেতরে মানুষের হাত-পা রয়েছে—এমন দৃশ্য তারা আগে কখনও দেখেননি। ঘটনাটি অত্যন্ত ভয়ংকর এবং অমানবিক। দ্রুত ঘটনার সঙ্গে জড়িতদের শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনার দাবি জানান তারা।
এদিকে তদন্ত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, পদ্মা নদী বিভিন্ন জেলার সঙ্গে সংযুক্ত হওয়ায় মরদেহের অংশ অন্য কোথাও থেকে ভেসে আসার সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না। তাই শুধু শরীয়তপুর নয়, আশপাশের জেলাগুলোতেও সাম্প্রতিক সময়ে নিখোঁজ ব্যক্তিদের তথ্য খতিয়ে দেখা হবে।
সিআইডির ফরিদপুর জোনের একটি টিমকে বিষয়টি জানানো হয়েছে বলে নিশ্চিত করেছে পুলিশ। প্রয়োজনীয় আলামত সংগ্রহ করে ফরেনসিক পরীক্ষার মাধ্যমে হত্যার সময়, পদ্ধতি ও ভিকটিমের পরিচয় সম্পর্কে তথ্য বের করার চেষ্টা করা হবে। তদন্তে আধুনিক প্রযুক্তির সহায়তা নেওয়ার কথাও জানিয়েছেন কর্মকর্তারা।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা বলছেন, নদীপথ ব্যবহার করে অপরাধীরা অনেক সময় আলামত গোপনের চেষ্টা করে থাকে। বিশেষ করে খণ্ডিত মরদেহ পানিতে ফেলে দিলে তা দ্রুত শনাক্ত করা কঠিন হয়ে পড়ে। তবে প্রযুক্তিগত তদন্ত ও ডিএনএ পরীক্ষার মাধ্যমে রহস্য উদ্ঘাটন সম্ভব হবে বলে আশা করছেন তারা।
এ ঘটনায় এখনো কোনো মামলা দায়ের হয়নি। তবে পুলিশ বলছে, আইনগত প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে এবং তদন্তের অগ্রগতির ভিত্তিতে পরবর্তী ব্যবস্থা নেওয়া হবে। নিহত ব্যক্তির পরিচয় শনাক্ত হলে তার পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে যোগাযোগ করা হবে।
অপরাধ বিশ্লেষকদের মতে, সাম্প্রতিক সময়ে দেশে কিছু নৃশংস হত্যাকাণ্ডের ঘটনা জনমনে উদ্বেগ বাড়িয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দ্রুত তদন্ত শেষ করে দোষীদের বিচারের আওতায় আনতে পারলে সাধারণ মানুষের মধ্যে আস্থা ফিরে আসবে। একই সঙ্গে এমন অপরাধ প্রতিরোধে নজরদারি বাড়ানোর পরামর্শও দিয়েছেন তারা।
পদ্মা নদী তীরবর্তী এলাকায় আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি জোরদার করতে স্থানীয় প্রশাসনের পক্ষ থেকেও পদক্ষেপ নেওয়া হতে পারে বলে জানা গেছে। নৌপুলিশ ও থানা পুলিশ যৌথভাবে নদীপথে নজরদারি বাড়ানোর পরিকল্পনা করছে। অপরাধীদের শনাক্তে আশপাশের সিসিটিভি ফুটেজ ও মোবাইল তথ্যও বিশ্লেষণ করা হতে পারে।
স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরাও ঘটনাটিকে উদ্বেগজনক বলে মন্তব্য করেছেন। তারা বলেন, এমন নৃশংস হত্যাকাণ্ড সমাজে ভয় ও অনিশ্চয়তা তৈরি করে। দ্রুত ঘটনার রহস্য উদ্ঘাটন এবং জড়িতদের শাস্তি নিশ্চিত করা জরুরি।
এদিকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও ঘটনাটি নিয়ে ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়েছে। অনেকে হত্যাকাণ্ডের পেছনে অপরাধচক্রের সংশ্লিষ্টতা থাকতে পারে বলে ধারণা করছেন। তবে পুলিশ বলছে, গুজব না ছড়িয়ে তদন্ত শেষ হওয়া পর্যন্ত সবাইকে ধৈর্য ধরতে হবে।
বর্তমানে উদ্ধার হওয়া অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ পুলিশ হেফাজতে রয়েছে। ময়নাতদন্ত ও ফরেনসিক পরীক্ষার প্রতিবেদন হাতে পাওয়ার পর তদন্তে নতুন তথ্য মিলতে পারে বলে আশা করা হচ্ছে। রহস্যজনক এই ঘটনায় পুরো শরীয়তপুর জুড়েই চাঞ্চল্য বিরাজ করছে।






















