অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে ৯ উইকেটের ঐতিহাসিক জয় তুলে নিয়ে টেস্ট ক্রিকেটের বড় অঘটনের তালিকায় জায়গা করে নিয়েছে বাংলাদেশ। ১৪৯ বছরের টেস্ট ইতিহাসে ম্যাচের আগে দুই দলের অবস্থান ও প্রত্যাশার বিচারে ডারউইনের এই জয়কে অন্যতম বড় চমক হিসেবে দেখছে ইএসপিএন। বাংলাদেশের এই সাফল্যকে আরও নয়টি স্মরণীয় টেস্ট অঘটনের সঙ্গে তুলনা করা হয়েছে।
২৩ বছর পর অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে টেস্ট খেলতে নেমে শুরু থেকেই দারুণ আত্মবিশ্বাস দেখিয়েছে বাংলাদেশ। জিম্বাবুয়ে ও ক্রিকেট অস্ট্রেলিয়া একাদশের বিপক্ষে প্রস্তুতি ম্যাচে ইনিংস ব্যবধানে হারলেও মূল লড়াইয়ে নিজেদের পরিকল্পনা নিখুঁতভাবে কাজে লাগায় দলটি। ম্যাচের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত অস্ট্রেলিয়াকে চাপে রেখে শেষ পর্যন্ত ৯ উইকেটের জয় তুলে নেয় বাংলাদেশ।
ডারউইন টেস্টে বাংলাদেশের জয়ের অন্যতম নায়ক হাসান মাহমুদ। তাঁর দুর্দান্ত বোলিংয়ে অস্ট্রেলিয়া প্রথম ইনিংসে মাত্র ১৯৪ রানে গুটিয়ে যায়। এরপর তানজিদ হাসান ক্যারিয়ারের প্রথম টেস্ট সেঞ্চুরি করে বাংলাদেশকে শক্ত অবস্থানে নিয়ে যান। তৃতীয় ইনিংসে মেহেদী হাসান মিরাজের কার্যকর অফ স্পিন অস্ট্রেলিয়ার ব্যাটিংয়ে শেষ আঘাত হানে।
অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে এই জয়কে আরও তাৎপর্যপূর্ণ করে তুলেছে ম্যাচের আগের পরিস্থিতি। ঘরের মাঠে অস্ট্রেলিয়া বরাবরই শক্তিশালী দল হিসেবে পরিচিত, আর বাংলাদেশ অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে টেস্ট জয়ের স্বাদ পায়নি। সেই প্রেক্ষাপটে পুরো ম্যাচে আধিপত্য দেখিয়ে জয় তুলে নেওয়ায় ডারউইন টেস্টটি বাংলাদেশের ক্রিকেট ইতিহাসের অন্যতম বড় অর্জনে পরিণত হয়েছে।
এর আগে ২০২২ সালে মাউন্ট মঙ্গানুইয়ে নিউজিল্যান্ডকে ৮ উইকেটে হারিয়ে বড় চমক দেখিয়েছিল বাংলাদেশ। সেটিই ছিল ‘সেনা’ দেশগুলোর মাটিতে বাংলাদেশের প্রথম টেস্ট জয়। টিম সাউদি, ট্রেন্ট বোল্ট, কাইল জেমিসন ও নিল ওয়াগনারদের পেস আক্রমণ সামলে প্রথম ইনিংসে লিড নেওয়ার পর ইবাদত হোসেনের দুর্দান্ত বোলিংয়ে ম্যাচ জিতে নেয় বাংলাদেশ।
অঘটনের তালিকায় রয়েছে ২০২৪ সালের বেঙ্গালুরু টেস্টও। ঘরের মাঠে নিউজিল্যান্ডের কাছে ৮ উইকেটে হেরে ভারত ম্যাচের দ্বিতীয় সকালে মাত্র ৪৬ রানে অলআউট হয়েছিল। রাচিন রবীন্দ্রর সেঞ্চুরি ও উইল ও’রোর্কের কার্যকর বোলিংয়ে নিউজিল্যান্ড শেষ পর্যন্ত ১০৭ রানের লক্ষ্য সহজেই পেরিয়ে যায়।
২০২৪ সালের ব্রিসবেন টেস্টে অস্ট্রেলিয়াকে ৮ রানে হারিয়ে আরও একটি ঐতিহাসিক অঘটন ঘটায় ওয়েস্ট ইন্ডিজ। জয়ের জন্য অস্ট্রেলিয়ার প্রয়োজন ছিল মাত্র ১৫৬ রান, পরে লক্ষ্য নেমে আসে ১০৩ রানে। কিন্তু শেমার জোসেফের দুর্দান্ত বোলিংয়ে অস্ট্রেলিয়ার ব্যাটিং ধসে পড়ে এবং ১৯৯৭ সালের পর অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে প্রথম টেস্ট জয় পায় ওয়েস্ট ইন্ডিজ।
২০২১ সালের গ্যাবা টেস্টে অস্ট্রেলিয়াকে ৩ উইকেটে হারিয়েছিল ভারত। অ্যাডিলেডে ৩৬ রানে অলআউট হওয়ার পর একের পর এক চোটে মূল বোলারদের হারিয়েও ভারত ঘুরে দাঁড়ায়। শুভমান গিলের ৯১, চেতেশ্বর পুজারার লড়াকু ব্যাটিং এবং ঋষভ পান্তের অপরাজিত ৮৯ রানের ইনিংসে ৩২৮ রানের লক্ষ্য টপকে যায় তারা।
২০০৩ সালে অ্যান্টিগুয়ায় অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে ওয়েস্ট ইন্ডিজের ৩ উইকেটের জয়ও ছিল অবিশ্বাস্য। ৪১৮ রানের বিশ্বরেকর্ড লক্ষ্য তাড়া করতে নেমে ব্রায়ান লারা, শিবনারায়ণ চন্দপল ও রামনারেশ সারওয়ানের ব্যাটিংয়ে ম্যাচের চিত্র পাল্টে যায়। শেষ পর্যন্ত অসাধারণ দৃঢ়তায় লক্ষ্য পেরিয়ে যায় ওয়েস্ট ইন্ডিজ।
১৯৯৮ সালে হারারেতে ভারতকে ৬১ রানে হারিয়েছিল জিম্বাবুয়ে। রাহুল দ্রাবিড়, শচীন টেন্ডুলকার ও সৌরভ গাঙ্গুলীর মতো তারকায় ভরা ভারতের ব্যাটিং লাইনআপকে চাপে ফেলে ঐতিহাসিক জয় পায় স্বাগতিকরা। এর তিন বছর আগে ১৯৯৫ সালে পাকিস্তানকে ইনিংস ও ৬৪ রানে হারিয়ে টেস্ট ক্রিকেটে নিজেদের প্রথম জয় পেয়েছিল জিম্বাবুয়ে।
১৯৯০ সালে জামাইকায় ওয়েস্ট ইন্ডিজকে ৯ উইকেটে হারিয়েছিল ইংল্যান্ড। দীর্ঘ সময় ধরে ক্যারিবীয়দের বিপক্ষে জয়হীন থাকা ইংল্যান্ড ডেভন ম্যালকম ও অ্যাঙ্গাস ফ্রেজারের বোলিংয়ে ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ নেয়। তালিকার সবচেয়ে পুরোনো অঘটনটি ১৯৫৪ সালের ওভাল টেস্ট, যেখানে ফজল মাহমুদের ১২ উইকেটের নৈপুণ্যে পাকিস্তান ইংল্যান্ডকে ২৪ রানে হারায়।
এই তালিকায় বাংলাদেশের ডারউইন জয় ঠিক কোথায় থাকবে, সেটি নিয়ে ক্রিকেটপ্রেমীদের মতভেদ থাকতেই পারে। তবে অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে ম্যাচের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত নিয়ন্ত্রণ রেখে ৯ উইকেটের জয় নিশ্চিত করায় এটি যে টেস্ট ক্রিকেটের স্মরণীয় অঘটনগুলোর একটি, তা বলার অপেক্ষা রাখে না।


























