ইরান-সৌদি সম্পর্ক আরও শক্তিশালী করতে প্রস্তুতির কথা জানিয়েছে তেহরান। ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান বলেছেন, সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, পাকিস্তানসহ আশপাশের সব প্রতিবেশী দেশের সঙ্গে সুসম্পর্ক গড়ে তুলতে চায় তাঁর দেশ। আঞ্চলিক উত্তেজনা কমিয়ে আলোচনার মাধ্যমে পারস্পরিক সহযোগিতা বাড়ানোই এখন ইরানের অন্যতম লক্ষ্য বলে জানিয়েছেন তিনি।
ইরানের রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে পেজেশকিয়ান বলেন, মুসলিম দেশগুলোর মধ্যে বিরোধ ও সংঘাতের পরিবর্তে আলোচনা এবং সহযোগিতার পরিবেশ তৈরি হওয়া প্রয়োজন। তাঁর মতে, কোনো দেশেরই অন্য দেশের ওপর প্রভাব বিস্তার বা জোর খাটানোর চেষ্টা করা উচিত নয়।
প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়নের বিষয়ে ইরানের এই বার্তা বিশেষ গুরুত্ব বহন করছে। মধ্যপ্রাচ্যে দীর্ঘদিন ধরেই বিভিন্ন রাজনৈতিক ও নিরাপত্তাগত ইস্যু নিয়ে দেশগুলোর মধ্যে মতপার্থক্য রয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের সঙ্গে সম্পর্ক আরও ভালো করার আগ্রহ প্রকাশ করেছে তেহরান।
ইরান-সৌদি সম্পর্ক উন্নয়নের পাশাপাশি পাকিস্তানসহ অন্যান্য প্রতিবেশীর সঙ্গেও যোগাযোগ বাড়ানোর কথা বলেছেন পেজেশকিয়ান। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, ইরান এমন একটি আঞ্চলিক পরিবেশ চায় যেখানে আলোচনার মাধ্যমে মতবিরোধ সমাধান করা সম্ভব হবে এবং দেশগুলো নিজেদের স্বার্থ রক্ষা করেও সহযোগিতার পথে এগিয়ে যাবে।
সাক্ষাৎকারে বিশ্ববাণিজ্যের গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালি নিয়েও কথা বলেন ইরানের প্রেসিডেন্ট। এই সমুদ্রপথ দিয়ে বিশ্বের জ্বালানি ও বাণিজ্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ পরিবহন করা হয়। তাই হরমুজ প্রণালিতে নৌ চলাচলের বিষয়টি শুধু মধ্যপ্রাচ্য নয়, আন্তর্জাতিক অর্থনীতির জন্যও গুরুত্বপূর্ণ।
পেজেশকিয়ান জানান, হরমুজ প্রণালি সাধারণ নৌ চলাচলের জন্য খুলে দেওয়ার ক্ষেত্রে ইরানের কিছু শর্ত রয়েছে। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রকে ইরানের ওপর আরোপিত অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়া, আটকে রাখা অর্থ ফেরত দেওয়া এবং লেবাননে হামলা বন্ধ করার মতো বিষয়গুলোতে পদক্ষেপ নিতে হবে।
তিনি আরও জানান, ওমানের সহযোগিতা এবং ইরানের সামরিক বাহিনীর অনুমোদনের মাধ্যমে এই গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ পরিচালনা নিয়ে নতুন পরিকল্পনা চূড়ান্ত করা হয়েছে। তবে এই পরিকল্পনা কীভাবে বাস্তবায়িত হবে, সে বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য তিনি প্রকাশ করেননি।
ইরানের প্রেসিডেন্টের বক্তব্যে মার্কিন নিষেধাজ্ঞার অর্থনৈতিক প্রভাবের বিষয়টিও উঠে এসেছে। তাঁর দাবি, নিষেধাজ্ঞার কারণে ইরানের ব্যবসা-বাণিজ্যে প্রায় ৩৫ শতাংশ পর্যন্ত নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে। তবুও দেশের মানুষের ঐক্য এবং অভ্যন্তরীণ সক্ষমতার কারণে ইরান এখনো চাপ মোকাবিলা করে টিকে আছে বলে মন্তব্য করেন তিনি।
ইরান দীর্ঘদিন ধরেই মার্কিন অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞার মুখে রয়েছে। এই নিষেধাজ্ঞার কারণে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য, ব্যাংকিং কার্যক্রম এবং বিভিন্ন অর্থনৈতিক খাতে দেশটি নানা ধরনের সমস্যার মুখোমুখি হয়েছে। পেজেশকিয়ানের বক্তব্যে আবারও স্পষ্ট হয়েছে যে, ইরানের পররাষ্ট্রনীতি ও অর্থনৈতিক পরিস্থিতির সঙ্গে নিষেধাজ্ঞার বিষয়টি ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত।
তবে পেজেশকিয়ান জানিয়েছেন, ইরান আলোচনার পথ পুরোপুরি বন্ধ করতে চায় না। শান্তিপূর্ণ আলোচনা এবং পারস্পরিক সম্মানের ভিত্তিতে সমস্যার সমাধান সম্ভব বলে মনে করে তেহরান। কিন্তু একই সঙ্গে তিনি সতর্ক করে বলেন, শুধু আশ্বাসের ওপর নির্ভর করে ইরান কোনো সিদ্ধান্ত নেবে না।
ইরানের মূল লক্ষ্য হলো নিজেদের জাতীয় স্বার্থ অক্ষুণ্ন রেখে প্রতিবেশীদের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নত করা। সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও পাকিস্তানের মতো গুরুত্বপূর্ণ আঞ্চলিক দেশগুলোর সঙ্গে সুসম্পর্ক গড়ে উঠলে মধ্যপ্রাচ্যের রাজনৈতিক পরিবেশেও ইতিবাচক পরিবর্তন আসতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে।
বিশেষ করে ইরান-সৌদি সম্পর্ক মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। দুই দেশের মধ্যে সহযোগিতা বাড়লে আঞ্চলিক বিভিন্ন ইস্যুতে সংলাপের সুযোগও তৈরি হতে পারে। একইভাবে সংযুক্ত আরব আমিরাতের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়ন বাণিজ্য ও কূটনৈতিক যোগাযোগের ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে।
পেজেশকিয়ানের বক্তব্যে তাই দুটি বিষয় স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। প্রথমত, ইরান প্রতিবেশীদের সঙ্গে বিরোধ কমিয়ে সম্পর্ক উন্নয়নের পথ খুঁজছে। দ্বিতীয়ত, যুক্তরাষ্ট্র ও পশ্চিমা বিশ্বের সঙ্গে আলোচনার ক্ষেত্রে নিজেদের জাতীয় স্বার্থের প্রশ্নে কোনো ছাড় দিতে রাজি নয় তেহরান।
আগামী দিনে ইরান-সৌদি সম্পর্ক কোন দিকে এগোয় এবং হরমুজ প্রণালি নিয়ে ইরানের অবস্থান আন্তর্জাতিক পর্যায়ে কী ধরনের প্রতিক্রিয়া তৈরি করে, সেটিই এখন দেখার বিষয়। তবে প্রেসিডেন্ট পেজেশকিয়ানের সাম্প্রতিক বার্তা থেকে বোঝা যাচ্ছে, আঞ্চলিক সম্পর্ক পুনর্গঠনের মাধ্যমে নতুন কূটনৈতিক সমীকরণ তৈরির চেষ্টা করছে ইরান।




























