নেপাল-চীন বন্যায় হিমালয় সীমান্তজুড়ে ভয়াবহ পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। প্রবল বন্যা ও ভূমিধসে দুই দেশে মৃতের সংখ্যা বেড়ে ৫৮৪ জনে দাঁড়িয়েছে। একই সঙ্গে নিখোঁজ রয়েছেন প্রায় আড়াই হাজার মানুষ। শুক্রবার (২৮ আগস্ট) পর্যন্ত পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, নেপালে ৫৭৯ জন এবং চীনের তিব্বত অঞ্চলে আরও পাঁচজনের মৃত্যু নিশ্চিত হয়েছে। উদ্ধারকাজ চলতে থাকায় হতাহতের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
নেপালের সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাগুলোর মধ্যে রয়েছে রসুয়া, নুয়াকোটসহ উত্তরাঞ্চলের বিভিন্ন এলাকা। বন্যার পানির সঙ্গে কাদা ও ধ্বংসাবশেষের প্রবল স্রোত ঘরবাড়ি, সড়ক, সেতু ও গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। নেপালে নিখোঁজ মানুষের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ৯২৪ জনে। চীনের তিব্বত অঞ্চলে আরও ৫৫৮ জন নিখোঁজ থাকায় দুই দেশে মোট নিখোঁজের সংখ্যা ২ হাজার ৪৮২ জনে পৌঁছেছে। নিখোঁজদের তালিকায় বিদেশি নাগরিক ও জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের কর্মীরাও রয়েছেন।
নেপাল-চীন বন্যার পর দুর্গত এলাকায় উদ্ধার তৎপরতা জোরদার করা হয়েছে। নেপালের নিরাপত্তা বাহিনীর হাজারো সদস্য উদ্ধার অভিযানে অংশ নিচ্ছেন। দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় কাদা, ধ্বংসস্তূপ ও যোগাযোগব্যবস্থা ভেঙে পড়ায় উদ্ধারকারীদের কাজ কঠিন হয়ে উঠেছে। একটি জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের সুড়ঙ্গে শতাধিক মানুষ আটকা পড়ার খবরও পাওয়া গেছে। সেনাবাহিনী ও অন্যান্য উদ্ধারকারী দল তাদের বের করে আনার চেষ্টা করছে। এরই মধ্যে কয়েক হাজার মানুষকে উদ্ধার করে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে।
দুর্যোগের ভয়াবহতা আরও বাড়িয়েছে নতুন করে বন্যার আশঙ্কা। পাহাড়ি এলাকায় ধ্বংসাবশেষ জমে একটি প্রাকৃতিক বাঁধের মতো বাধা তৈরি হওয়ায় এর পেছনে পানি জমে হ্রদ সৃষ্টি হয়েছিল। সেই পানি উপচে পড়ার পর কিছু এলাকায় দ্বিতীয় দফায় বন্যার ঝুঁকি তৈরি হয়। এ কারণে একপর্যায়ে কয়েকটি এলাকায় উদ্ধার অভিযান সাময়িকভাবে ব্যাহত হয়। পরে পরিস্থিতি কিছুটা নিয়ন্ত্রণে এলে উদ্ধারকাজ আবার শুরু করা হয়। আন্তর্জাতিক রেডক্রস ও রেড ক্রিসেন্ট ফেডারেশন জানিয়েছে, নেপালে প্রায় ৯৩ হাজার মানুষ এই দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারেন।
নেপাল-চীন বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের পাশে দাঁড়াতে বিভিন্ন দেশ সহযোগিতার প্রস্তাব দিয়েছে। দক্ষিণ কোরিয়া, ভারত, চীন, যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, জাপান, শ্রীলঙ্কা ও বাংলাদেশ উদ্ধার ও সহায়তার প্রস্তাব দিয়েছে বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে। তবে নেপাল সরকার আপাতত নিজস্ব নিরাপত্তা বাহিনীর মাধ্যমে উদ্ধার অভিযান চালাচ্ছে। প্রয়োজন হলে বিশেষায়িত বিদেশি সহায়তা নেওয়ার বিষয়টি বিবেচনা করা হবে বলে জানিয়েছে দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। এদিকে আন্তর্জাতিক রেডক্রস নেপালের জন্য জরুরি সহায়তা তহবিলও ঘোষণা করেছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, হিমালয় অঞ্চলের দ্রুত পরিবর্তনশীল পরিবেশ এবং হিমবাহ ও হিমবাহ-সংলগ্ন হ্রদের ঝুঁকি এ ধরনের আকস্মিক বন্যার আশঙ্কা বাড়াচ্ছে। আন্তর্জাতিক রেডক্রসও জানিয়েছে, দুর্যোগটির পেছনে চীনের তিব্বত অঞ্চল থেকে উৎপত্তি হওয়া একটি হিমবাহ-সংক্রান্ত আকস্মিক বন্যার প্রভাব ছিল। পাহাড়ি এলাকায় ভবিষ্যতে এমন ঝুঁকি মোকাবিলায় আগাম সতর্কতা, নদী পর্যবেক্ষণ এবং দুর্যোগ প্রস্তুতি আরও শক্তিশালী করার প্রয়োজন রয়েছে। নেপাল-চীন বন্যার পর এখন সবচেয়ে বড় অগ্রাধিকার নিখোঁজদের সন্ধান, আহতদের চিকিৎসা এবং দুর্গত মানুষের কাছে জরুরি সহায়তা পৌঁছে দেওয়া।



























