ঢাকা ০১:০১ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ২৯ অগাস্ট ২০২৬, ১৩ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম :

ইমরান খান: কারাবাস নিয়ে ছেলেদের শঙ্কার নেপথ্যে

  • ডেস্ক নিউজ
  • Update Time : ১১:৫৩:২০ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ২৮ অগাস্ট ২০২৬
  • ৫২০

আদিয়ালা কারাগারেই তিন বছর ধরে বন্দী ইমরান খান। ছবি: সংগৃহীত

ইমরান খানকে নিয়ে তাঁর দুই ছেলে সুলাইমান ও কাসিম খানের উদ্বেগ দিন দিন বাড়ছে। প্রায় ছয় মাস ধরে বাবার কণ্ঠ শোনেননি তাঁরা। সর্বশেষ গত মার্চে ঈদুল ফিতরের সময় মাত্র ২০ মিনিট ফোনে কথা হয়েছিল তাঁদের। লন্ডনে আল-জাজিরাকে কাসিম জানিয়েছেন, বাবার সঙ্গে কথা বলার সুযোগ খুব সীমিত। ফোনে ইমরান বরং ছেলেদের খোঁজখবর নেন, নানা পরামর্শ দেন। কিন্তু নিজের শারীরিক ও মানসিক অবস্থার কথা উঠলেই দ্রুত প্রসঙ্গ বদলে ফেলেন। কাসিমের ভাষায়, তাঁর বাবা নিজের কষ্টের কথা বলতে চান না। এই পরিস্থিতিতেই কারাগারে ইমরানের স্বাস্থ্য ও চিকিৎসা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলেছেন তাঁর পরিবার।

ইমরান খান প্রায় তিন বছর ধরে রাওয়ালপিন্ডির আদিয়ালা কারাগারে বন্দী। ২০২২ সালে অনাস্থা ভোটে ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর তাঁর বিরুদ্ধে একের পর এক মামলা হয়। ঘুষ, রাষ্ট্রীয় গোপন তথ্য ফাঁস এবং রাষ্ট্রীয় উপহার বেআইনিভাবে বিক্রির মতো অভিযোগে তাঁকে বিভিন্ন সময়ে সাজাও দেওয়া হয়েছে। তবে ইমরান এসব অভিযোগ অস্বীকার করে আসছেন। তাঁর পরিবার ও পাকিস্তান তেহরিক-ই-ইনসাফের দাবি, রাজনৈতিক উদ্দেশ্যেই এসব মামলা করা হয়েছে। বেশির ভাগ দণ্ড স্থগিত বা বাতিল হলেও একটি সাজা বহাল আছে এবং তাঁর করা আপিলগুলো এখনো বিচারাধীন।

সম্প্রতি ইমরানের দুই বোন উজমা ও নওরিনকে তাঁর সঙ্গে দেখা করার অনুমতি দেওয়া হয়। কয়েক মাস পর সেই সাক্ষাতে তাঁরা ভাইকে অস্থির অবস্থায় দেখেছেন বলে পরিবারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে। সুলাইমানের দাবি, দীর্ঘদিনের নির্জন কারাবাস ইমরানের ওপর মানসিক চাপ তৈরি করেছে। কাসিম জানিয়েছেন, বাবার হৃদ্‌স্পন্দন বেড়ে যায় এবং উদ্বেগের কারণে বুক ধড়ফড় করে। এ ছাড়া তাঁর ডান চোখের দৃষ্টিশক্তি নিয়েও উদ্বেগ রয়েছে। পরিবারের ভাষ্য অনুযায়ী, দীর্ঘ সময় ধরে তাঁকে দর্শনার্থীদের সঙ্গে দেখা করতে দেওয়া হয়নি এবং আদালতের নির্দেশ থাকা সত্ত্বেও যোগাযোগ ও চিকিৎসার সুযোগ যথেষ্ট ছিল না।

তবে পরিবারের অভিযোগের সঙ্গে একমত নয় পাকিস্তান সরকার। দেশটির তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, ইমরানের স্বাস্থ্য নিয়ে যে অভিযোগ করা হচ্ছে, তা কারাগার ও চিকিৎসাসংক্রান্ত নথির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। সরকারের দাবি, কারাবন্দী হওয়ার পর থেকে ইমরানের প্রায় ৩০ বার স্বাস্থ্য পরীক্ষা হয়েছে এবং কারাগারের চিকিৎসকেরাও নিয়মিত তাঁর শারীরিক অবস্থা পর্যবেক্ষণ করছেন। সরকারি চিকিৎসকদের সাম্প্রতিক মূল্যায়ন অনুযায়ী, তাঁর অবস্থা স্থিতিশীল এবং গুরুতর কোনো অবনতির তথ্য নথিতে নেই। সরকারের পক্ষ থেকে আরও বলা হয়েছে, স্বাস্থ্যকে রাজনৈতিক বিতর্কের বিষয় বানানো উচিত নয়।

তবে চিকিৎসা নিয়ে বিরোধ আরও জটিল হয়েছে আদালতের নির্দেশের পর। ১৮ আগস্ট সুপ্রিম কোর্টের তিন বিচারপতির বেঞ্চ ইমরানকে দুই দিনের মধ্যে বেসরকারি শিফা ইন্টারন্যাশনাল হাসপাতালে নেওয়ার নির্দেশ দেন। একই সঙ্গে প্রতি সপ্তাহে পরিবারের সঙ্গে সাক্ষাৎ এবং সপ্তাহে দুবার ছেলেদের সঙ্গে ফোনে কথা বলার সুযোগ দেওয়ার কথা বলা হয়। তাঁর ব্যক্তিগত চিকিৎসক ও চিকিৎসক বোনকেও চিকিৎসায় যুক্ত করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু পরিবারের অভিযোগ, তাঁকে বেসরকারি হাসপাতালে না নিয়ে সরকারি পাকিস্তান ইনস্টিটিউট অব মেডিক্যাল সায়েন্সেসে নেওয়া হয়। সেখানে সংক্ষিপ্ত পরীক্ষা শেষে ২০ আগস্ট তাঁকে আবার কারাগারে ফেরত পাঠানো হয়। এরপর আদালত অবমাননার আবেদন করেছে ইমরানের দল।

ইমরানকে ঘিরে উদ্বেগ এখন পাকিস্তানের সীমানা ছাড়িয়ে আন্তর্জাতিক পর্যায়েও পৌঁছেছে। জাতিসংঘ, অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল এবং বিভিন্ন দেশের রাজনীতিকদের পাশাপাশি সাবেক ক্রিকেট অধিনায়কেরাও তাঁর মুক্তির দাবি জানিয়েছেন। ইমরানের সাবেক স্ত্রী জেমিমা গোল্ডস্মিথও যুক্তরাজ্য সরকারের কাছে বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে দেখার আহ্বান জানিয়েছেন। তাঁর দুই ছেলে ব্রিটিশ নাগরিক হলেও পাকিস্তানে তাঁদের ভিসা দেওয়া হয়নি বলে তিনি দাবি করেছেন। ২০২২ সালের নভেম্বরে বাবার ওপর হামলার পর সর্বশেষ তাঁরা পাকিস্তানে গিয়ে তাঁর সঙ্গে দেখা করেছিলেন। এত কিছুর পরও কাসিম বাবার মানসিক শক্তির ওপর আস্থা রাখছেন। তাঁর বিশ্বাস, পরিস্থিতি যত কঠিনই হোক, ঘুরে দাঁড়ানোর ক্ষমতা ইমরানের আছে। তবে তাঁর প্রশ্নও স্পষ্ট—একজন বন্দীর স্বাধীন চিকিৎসা ও পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগের সুযোগ নিশ্চিত করতে যদি আদালতের নির্দেশও যথেষ্ট না হয়, তাহলে মানবিকতার জায়গাটি কোথায়?

জনপ্রিয় সংবাদ

ইমরান খান: কারাবাস নিয়ে ছেলেদের শঙ্কার নেপথ্যে

ইমরান খান: কারাবাস নিয়ে ছেলেদের শঙ্কার নেপথ্যে

Update Time : ১১:৫৩:২০ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ২৮ অগাস্ট ২০২৬

ইমরান খানকে নিয়ে তাঁর দুই ছেলে সুলাইমান ও কাসিম খানের উদ্বেগ দিন দিন বাড়ছে। প্রায় ছয় মাস ধরে বাবার কণ্ঠ শোনেননি তাঁরা। সর্বশেষ গত মার্চে ঈদুল ফিতরের সময় মাত্র ২০ মিনিট ফোনে কথা হয়েছিল তাঁদের। লন্ডনে আল-জাজিরাকে কাসিম জানিয়েছেন, বাবার সঙ্গে কথা বলার সুযোগ খুব সীমিত। ফোনে ইমরান বরং ছেলেদের খোঁজখবর নেন, নানা পরামর্শ দেন। কিন্তু নিজের শারীরিক ও মানসিক অবস্থার কথা উঠলেই দ্রুত প্রসঙ্গ বদলে ফেলেন। কাসিমের ভাষায়, তাঁর বাবা নিজের কষ্টের কথা বলতে চান না। এই পরিস্থিতিতেই কারাগারে ইমরানের স্বাস্থ্য ও চিকিৎসা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলেছেন তাঁর পরিবার।

ইমরান খান প্রায় তিন বছর ধরে রাওয়ালপিন্ডির আদিয়ালা কারাগারে বন্দী। ২০২২ সালে অনাস্থা ভোটে ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর তাঁর বিরুদ্ধে একের পর এক মামলা হয়। ঘুষ, রাষ্ট্রীয় গোপন তথ্য ফাঁস এবং রাষ্ট্রীয় উপহার বেআইনিভাবে বিক্রির মতো অভিযোগে তাঁকে বিভিন্ন সময়ে সাজাও দেওয়া হয়েছে। তবে ইমরান এসব অভিযোগ অস্বীকার করে আসছেন। তাঁর পরিবার ও পাকিস্তান তেহরিক-ই-ইনসাফের দাবি, রাজনৈতিক উদ্দেশ্যেই এসব মামলা করা হয়েছে। বেশির ভাগ দণ্ড স্থগিত বা বাতিল হলেও একটি সাজা বহাল আছে এবং তাঁর করা আপিলগুলো এখনো বিচারাধীন।

আরও পড়ুন  মোদির বিদেশি পুরস্কার ঘিরে নতুন বিতর্ক, কী নিয়ে প্রশ্ন?

সম্প্রতি ইমরানের দুই বোন উজমা ও নওরিনকে তাঁর সঙ্গে দেখা করার অনুমতি দেওয়া হয়। কয়েক মাস পর সেই সাক্ষাতে তাঁরা ভাইকে অস্থির অবস্থায় দেখেছেন বলে পরিবারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে। সুলাইমানের দাবি, দীর্ঘদিনের নির্জন কারাবাস ইমরানের ওপর মানসিক চাপ তৈরি করেছে। কাসিম জানিয়েছেন, বাবার হৃদ্‌স্পন্দন বেড়ে যায় এবং উদ্বেগের কারণে বুক ধড়ফড় করে। এ ছাড়া তাঁর ডান চোখের দৃষ্টিশক্তি নিয়েও উদ্বেগ রয়েছে। পরিবারের ভাষ্য অনুযায়ী, দীর্ঘ সময় ধরে তাঁকে দর্শনার্থীদের সঙ্গে দেখা করতে দেওয়া হয়নি এবং আদালতের নির্দেশ থাকা সত্ত্বেও যোগাযোগ ও চিকিৎসার সুযোগ যথেষ্ট ছিল না।

তবে পরিবারের অভিযোগের সঙ্গে একমত নয় পাকিস্তান সরকার। দেশটির তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, ইমরানের স্বাস্থ্য নিয়ে যে অভিযোগ করা হচ্ছে, তা কারাগার ও চিকিৎসাসংক্রান্ত নথির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। সরকারের দাবি, কারাবন্দী হওয়ার পর থেকে ইমরানের প্রায় ৩০ বার স্বাস্থ্য পরীক্ষা হয়েছে এবং কারাগারের চিকিৎসকেরাও নিয়মিত তাঁর শারীরিক অবস্থা পর্যবেক্ষণ করছেন। সরকারি চিকিৎসকদের সাম্প্রতিক মূল্যায়ন অনুযায়ী, তাঁর অবস্থা স্থিতিশীল এবং গুরুতর কোনো অবনতির তথ্য নথিতে নেই। সরকারের পক্ষ থেকে আরও বলা হয়েছে, স্বাস্থ্যকে রাজনৈতিক বিতর্কের বিষয় বানানো উচিত নয়।

আরও পড়ুন  তেলের দামে ধস, শেয়ারবাজারে উল্লম্ফন—যুদ্ধবিরতির প্রভাব

তবে চিকিৎসা নিয়ে বিরোধ আরও জটিল হয়েছে আদালতের নির্দেশের পর। ১৮ আগস্ট সুপ্রিম কোর্টের তিন বিচারপতির বেঞ্চ ইমরানকে দুই দিনের মধ্যে বেসরকারি শিফা ইন্টারন্যাশনাল হাসপাতালে নেওয়ার নির্দেশ দেন। একই সঙ্গে প্রতি সপ্তাহে পরিবারের সঙ্গে সাক্ষাৎ এবং সপ্তাহে দুবার ছেলেদের সঙ্গে ফোনে কথা বলার সুযোগ দেওয়ার কথা বলা হয়। তাঁর ব্যক্তিগত চিকিৎসক ও চিকিৎসক বোনকেও চিকিৎসায় যুক্ত করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু পরিবারের অভিযোগ, তাঁকে বেসরকারি হাসপাতালে না নিয়ে সরকারি পাকিস্তান ইনস্টিটিউট অব মেডিক্যাল সায়েন্সেসে নেওয়া হয়। সেখানে সংক্ষিপ্ত পরীক্ষা শেষে ২০ আগস্ট তাঁকে আবার কারাগারে ফেরত পাঠানো হয়। এরপর আদালত অবমাননার আবেদন করেছে ইমরানের দল।

আরও পড়ুন  ইমরান খানের যথাযথ চিকিৎসা নিশ্চিতের আহ্বান জানিয়েছেন সাবেক অধিনায়করা

ইমরানকে ঘিরে উদ্বেগ এখন পাকিস্তানের সীমানা ছাড়িয়ে আন্তর্জাতিক পর্যায়েও পৌঁছেছে। জাতিসংঘ, অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল এবং বিভিন্ন দেশের রাজনীতিকদের পাশাপাশি সাবেক ক্রিকেট অধিনায়কেরাও তাঁর মুক্তির দাবি জানিয়েছেন। ইমরানের সাবেক স্ত্রী জেমিমা গোল্ডস্মিথও যুক্তরাজ্য সরকারের কাছে বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে দেখার আহ্বান জানিয়েছেন। তাঁর দুই ছেলে ব্রিটিশ নাগরিক হলেও পাকিস্তানে তাঁদের ভিসা দেওয়া হয়নি বলে তিনি দাবি করেছেন। ২০২২ সালের নভেম্বরে বাবার ওপর হামলার পর সর্বশেষ তাঁরা পাকিস্তানে গিয়ে তাঁর সঙ্গে দেখা করেছিলেন। এত কিছুর পরও কাসিম বাবার মানসিক শক্তির ওপর আস্থা রাখছেন। তাঁর বিশ্বাস, পরিস্থিতি যত কঠিনই হোক, ঘুরে দাঁড়ানোর ক্ষমতা ইমরানের আছে। তবে তাঁর প্রশ্নও স্পষ্ট—একজন বন্দীর স্বাধীন চিকিৎসা ও পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগের সুযোগ নিশ্চিত করতে যদি আদালতের নির্দেশও যথেষ্ট না হয়, তাহলে মানবিকতার জায়গাটি কোথায়?