ঢাকা ১০:৪৭ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ১৮ জুলাই ২০২৬, ৩ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম :

তাজমহল কি একসময় মন্দির ছিল? নতুন বিতর্কে কী বলছে ইতিহাস

  • ডেস্ক নিউজ
  • Update Time : ০৯:৩৩:৫৪ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ১৮ জুলাই ২০২৬
  • ৫০৭

ব্রিটিশ শিল্পী ফ্র্যাঙ্ক ডিনের আঁকা তাজমহল। ছবি: সংগৃহীত

ভারতের ঐতিহাসিক স্থাপনা তাজমহলকে ঘিরে আবারও নতুন বিতর্ক শুরু হয়েছে। এক বিজেপি নেতার আবেদনের পর এলাহাবাদ হাইকোর্ট কেন্দ্রীয় সরকার ও আর্কিওলজিক্যাল সার্ভে অব ইন্ডিয়া (এএসআই)-কে নোটিশ দিয়ে তাজমহলে জরিপ চালানোর বিষয়ে তাদের অবস্থান জানতে চেয়েছে। আবেদনকারীর দাবি, তাজমহল নির্মাণের আগে সেখানে একটি হিন্দু মন্দির ছিল এবং তার প্রমাণ ভবনের বন্ধ কক্ষগুলোতে লুকিয়ে রয়েছে। তবে ইতিহাসবিদরা এই দাবিকে ভিত্তিহীন বলে উল্লেখ করেছেন।

বিশ্বের অন্যতম জনপ্রিয় স্থাপনা তাজমহলকে ভালোবাসার প্রতীক হিসেবে চেনে মানুষ। সাদা মার্বেলে নির্মিত এই সৌধটি প্রতিবছর লাখো পর্যটককে আকর্ষণ করে। কিন্তু গত কয়েক দশক ধরে এটি শুধুই স্থাপত্যের সৌন্দর্যের জন্য নয়, নানা রাজনৈতিক ও ঐতিহাসিক বিতর্কের কারণেও আলোচনায় এসেছে।

ইতিহাসবিদদের মতে, ১৬৩১ সালে মুঘল সম্রাট শাহজাহানের স্ত্রী মমতাজ মহলের মৃত্যু হলে তার স্মৃতিকে অমর করে রাখতে আগ্রার যমুনা নদীর তীরে একটি স্মৃতিসৌধ নির্মাণের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। সেই জমি তখন রাজা জয় সিংয়ের মালিকানায় ছিল। পরে জমির বিনিময়ে অন্য জমি দিয়ে সেখানে তাজমহলের নির্মাণকাজ শুরু করেন শাহজাহান।

মুঘল আমলের সরকারি ইতিহাসগ্রন্থ ‘বাদশাহনামা’-তেও তাজমহলের নির্মাণের বিস্তারিত বিবরণ রয়েছে। গবেষকদের মতে, ১৬৪৮ সালে মূল স্থাপনার কাজ শেষ হলেও অলংকরণ, খোদাই এবং বাগান নির্মাণের কাজ সম্পূর্ণ হতে আরও কয়েক বছর সময় লেগেছিল। এসব তথ্য ঐতিহাসিক দলিলের মাধ্যমে সংরক্ষিত রয়েছে।

বর্তমান বিতর্কের সূত্রপাত হয় এক বিজেপি নেতার আদালতে দায়ের করা আবেদনের মাধ্যমে। তিনি দাবি করেন, তাজমহলের নিচের ২২টি বন্ধ কক্ষ খুলে জরিপ করলে সেখানে একটি প্রাচীন হিন্দু মন্দিরের নিদর্শন পাওয়া যাবে। জেলা আদালত আবেদনটি খারিজ করে দিলেও পরে তিনি এলাহাবাদ হাইকোর্টে যান। আদালত বিষয়টি নিয়ে কেন্দ্রীয় সরকার ও এএসআইয়ের মতামত জানতে নোটিশ জারি করেছে।

তবে ইতিহাসবিদ ড. রুচিকা শর্মা এই দাবিকে প্রত্যাখ্যান করেছেন। তার মতে, তাজমহল নিয়ে এমন বিতর্ক নতুন নয়। বহুবার একই ধরনের দাবি উঠলেও প্রতিবারই তা ঐতিহাসিক প্রমাণের অভাবে খারিজ হয়েছে। তিনি বলেন, আদালত ও সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলো আগেও বিষয়টি পর্যালোচনা করেছে এবং নতুন করে বিতর্ক তৈরির মতো কোনো তথ্য সামনে আসেনি।

তাজমহলকে মন্দির হিসেবে দাবি করার সবচেয়ে পরিচিত তত্ত্ব দেন লেখক পুরুষোত্তম নাগেশ ওক। তিনি ১৯৬৫ সালে প্রকাশিত একটি বইয়ে দাবি করেন, তাজমহল আসলে একটি রাজপুত প্রাসাদ ছিল। পরে আরেকটি বইয়ে তিনি দাবি করেন, এটি মূলত ‘তেজো মহালয়া’ নামে একটি শিব মন্দির, যা পরে শাহজাহান সমাধিতে রূপান্তর করেন।

ঐতিহাসিকরা অবশ্য ওকের দাবিকে কখনোই গ্রহণ করেননি। তাদের মতে, তাজমহলের স্থাপত্যশৈলী, গম্বুজ, খিলান, মার্বেলের কারুকাজ এবং পারস্য ও তৈমুরি নির্মাণরীতির প্রভাব স্পষ্টভাবে মুঘল স্থাপত্যের বৈশিষ্ট্য বহন করে। প্রাক-মুঘল ভারতে এমন প্রযুক্তি ও নকশার কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি।

ড. রুচিকা শর্মা আরও বলেন, ওকের তত্ত্বের পক্ষে কোনো প্রত্নতাত্ত্বিক বা ঐতিহাসিক প্রমাণ নেই। ২০০০ সালে ওক সুপ্রিম কোর্টে একই দাবি নিয়ে আবেদন করলেও তা তাৎক্ষণিকভাবে খারিজ করে দেওয়া হয়। পরবর্তীতেও বিভিন্ন আদালতে একই ধরনের আবেদন করা হলেও সেগুলোও টেকেনি।

২০১৭ সালে আর্কিওলজিক্যাল সার্ভে অব ইন্ডিয়া (এএসআই) স্পষ্ট জানায়, তাজমহল কখনো মন্দির ছিল বা সেখানে কোনো মন্দিরের অস্তিত্ব ছিল—এমন কোনো প্রমাণ তাদের কাছে নেই। সংস্থাটি জানায়, তাজমহলের বন্ধ কক্ষগুলো সংরক্ষণের স্বার্থে বন্ধ রাখা হয়েছে। সেগুলো খুলে দিলে আর্দ্রতা বৃদ্ধি পেয়ে মূল কাঠামোর ক্ষতি হতে পারে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, সাম্প্রতিক সময়ে ভারতের বিভিন্ন ঐতিহাসিক ও ধর্মীয় স্থাপনাকে ঘিরে এমন দাবি রাজনৈতিক ও মতাদর্শগত বিতর্ককে আরও উসকে দিচ্ছে। তাদের মতে, ইতিহাসকে নতুনভাবে ব্যাখ্যা করার প্রবণতা থেকেই এসব প্রশ্ন বারবার সামনে আনা হচ্ছে। তবে ঐতিহাসিক দলিল, প্রত্নতাত্ত্বিক গবেষণা এবং সরকারি নথিপত্র এখনো তাজমহলকে শাহজাহানের নির্মিত মমতাজ মহলের সমাধিসৌধ হিসেবেই স্বীকৃতি দেয়।

সব বিতর্কের পরও তাজমহল বিশ্বের অন্যতম জনপ্রিয় পর্যটনকেন্দ্র এবং ভালোবাসার প্রতীক হিসেবে তার পরিচয় অটুট রয়েছে। প্রতিবছর বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে লাখো পর্যটক এই ঐতিহাসিক স্থাপনাটি দেখতে আগ্রায় যান। ইতিহাসবিদদের মতে, মতভেদ থাকলেও তাজমহলের প্রকৃত ইতিহাস নির্ধারণে নির্ভর করতে হবে প্রমাণভিত্তিক গবেষণা ও নিরপেক্ষ ইতিহাসচর্চার ওপর।

জনপ্রিয় সংবাদ

তাজমহল কি একসময় মন্দির ছিল? নতুন বিতর্কে কী বলছে ইতিহাস

Update Time : ০৯:৩৩:৫৪ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ১৮ জুলাই ২০২৬

ভারতের ঐতিহাসিক স্থাপনা তাজমহলকে ঘিরে আবারও নতুন বিতর্ক শুরু হয়েছে। এক বিজেপি নেতার আবেদনের পর এলাহাবাদ হাইকোর্ট কেন্দ্রীয় সরকার ও আর্কিওলজিক্যাল সার্ভে অব ইন্ডিয়া (এএসআই)-কে নোটিশ দিয়ে তাজমহলে জরিপ চালানোর বিষয়ে তাদের অবস্থান জানতে চেয়েছে। আবেদনকারীর দাবি, তাজমহল নির্মাণের আগে সেখানে একটি হিন্দু মন্দির ছিল এবং তার প্রমাণ ভবনের বন্ধ কক্ষগুলোতে লুকিয়ে রয়েছে। তবে ইতিহাসবিদরা এই দাবিকে ভিত্তিহীন বলে উল্লেখ করেছেন।

বিশ্বের অন্যতম জনপ্রিয় স্থাপনা তাজমহলকে ভালোবাসার প্রতীক হিসেবে চেনে মানুষ। সাদা মার্বেলে নির্মিত এই সৌধটি প্রতিবছর লাখো পর্যটককে আকর্ষণ করে। কিন্তু গত কয়েক দশক ধরে এটি শুধুই স্থাপত্যের সৌন্দর্যের জন্য নয়, নানা রাজনৈতিক ও ঐতিহাসিক বিতর্কের কারণেও আলোচনায় এসেছে।

ইতিহাসবিদদের মতে, ১৬৩১ সালে মুঘল সম্রাট শাহজাহানের স্ত্রী মমতাজ মহলের মৃত্যু হলে তার স্মৃতিকে অমর করে রাখতে আগ্রার যমুনা নদীর তীরে একটি স্মৃতিসৌধ নির্মাণের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। সেই জমি তখন রাজা জয় সিংয়ের মালিকানায় ছিল। পরে জমির বিনিময়ে অন্য জমি দিয়ে সেখানে তাজমহলের নির্মাণকাজ শুরু করেন শাহজাহান।

আরও পড়ুন  ইরানে ফের মার্কিন হামলা, পাল্টা আঘাতে বাড়ল যুদ্ধের আশঙ্কা

মুঘল আমলের সরকারি ইতিহাসগ্রন্থ ‘বাদশাহনামা’-তেও তাজমহলের নির্মাণের বিস্তারিত বিবরণ রয়েছে। গবেষকদের মতে, ১৬৪৮ সালে মূল স্থাপনার কাজ শেষ হলেও অলংকরণ, খোদাই এবং বাগান নির্মাণের কাজ সম্পূর্ণ হতে আরও কয়েক বছর সময় লেগেছিল। এসব তথ্য ঐতিহাসিক দলিলের মাধ্যমে সংরক্ষিত রয়েছে।

বর্তমান বিতর্কের সূত্রপাত হয় এক বিজেপি নেতার আদালতে দায়ের করা আবেদনের মাধ্যমে। তিনি দাবি করেন, তাজমহলের নিচের ২২টি বন্ধ কক্ষ খুলে জরিপ করলে সেখানে একটি প্রাচীন হিন্দু মন্দিরের নিদর্শন পাওয়া যাবে। জেলা আদালত আবেদনটি খারিজ করে দিলেও পরে তিনি এলাহাবাদ হাইকোর্টে যান। আদালত বিষয়টি নিয়ে কেন্দ্রীয় সরকার ও এএসআইয়ের মতামত জানতে নোটিশ জারি করেছে।

তবে ইতিহাসবিদ ড. রুচিকা শর্মা এই দাবিকে প্রত্যাখ্যান করেছেন। তার মতে, তাজমহল নিয়ে এমন বিতর্ক নতুন নয়। বহুবার একই ধরনের দাবি উঠলেও প্রতিবারই তা ঐতিহাসিক প্রমাণের অভাবে খারিজ হয়েছে। তিনি বলেন, আদালত ও সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলো আগেও বিষয়টি পর্যালোচনা করেছে এবং নতুন করে বিতর্ক তৈরির মতো কোনো তথ্য সামনে আসেনি।

আরও পড়ুন  ইসরাইলি নাগরিক নিয়ে তোলপাড়, কঠোর সিদ্ধান্ত মালয়েশিয়ার

তাজমহলকে মন্দির হিসেবে দাবি করার সবচেয়ে পরিচিত তত্ত্ব দেন লেখক পুরুষোত্তম নাগেশ ওক। তিনি ১৯৬৫ সালে প্রকাশিত একটি বইয়ে দাবি করেন, তাজমহল আসলে একটি রাজপুত প্রাসাদ ছিল। পরে আরেকটি বইয়ে তিনি দাবি করেন, এটি মূলত ‘তেজো মহালয়া’ নামে একটি শিব মন্দির, যা পরে শাহজাহান সমাধিতে রূপান্তর করেন।

ঐতিহাসিকরা অবশ্য ওকের দাবিকে কখনোই গ্রহণ করেননি। তাদের মতে, তাজমহলের স্থাপত্যশৈলী, গম্বুজ, খিলান, মার্বেলের কারুকাজ এবং পারস্য ও তৈমুরি নির্মাণরীতির প্রভাব স্পষ্টভাবে মুঘল স্থাপত্যের বৈশিষ্ট্য বহন করে। প্রাক-মুঘল ভারতে এমন প্রযুক্তি ও নকশার কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি।

ড. রুচিকা শর্মা আরও বলেন, ওকের তত্ত্বের পক্ষে কোনো প্রত্নতাত্ত্বিক বা ঐতিহাসিক প্রমাণ নেই। ২০০০ সালে ওক সুপ্রিম কোর্টে একই দাবি নিয়ে আবেদন করলেও তা তাৎক্ষণিকভাবে খারিজ করে দেওয়া হয়। পরবর্তীতেও বিভিন্ন আদালতে একই ধরনের আবেদন করা হলেও সেগুলোও টেকেনি।

২০১৭ সালে আর্কিওলজিক্যাল সার্ভে অব ইন্ডিয়া (এএসআই) স্পষ্ট জানায়, তাজমহল কখনো মন্দির ছিল বা সেখানে কোনো মন্দিরের অস্তিত্ব ছিল—এমন কোনো প্রমাণ তাদের কাছে নেই। সংস্থাটি জানায়, তাজমহলের বন্ধ কক্ষগুলো সংরক্ষণের স্বার্থে বন্ধ রাখা হয়েছে। সেগুলো খুলে দিলে আর্দ্রতা বৃদ্ধি পেয়ে মূল কাঠামোর ক্ষতি হতে পারে।

আরও পড়ুন  ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধে যাবে না ইতালি, জানালেন মেলোনি

বিশেষজ্ঞদের মতে, সাম্প্রতিক সময়ে ভারতের বিভিন্ন ঐতিহাসিক ও ধর্মীয় স্থাপনাকে ঘিরে এমন দাবি রাজনৈতিক ও মতাদর্শগত বিতর্ককে আরও উসকে দিচ্ছে। তাদের মতে, ইতিহাসকে নতুনভাবে ব্যাখ্যা করার প্রবণতা থেকেই এসব প্রশ্ন বারবার সামনে আনা হচ্ছে। তবে ঐতিহাসিক দলিল, প্রত্নতাত্ত্বিক গবেষণা এবং সরকারি নথিপত্র এখনো তাজমহলকে শাহজাহানের নির্মিত মমতাজ মহলের সমাধিসৌধ হিসেবেই স্বীকৃতি দেয়।

সব বিতর্কের পরও তাজমহল বিশ্বের অন্যতম জনপ্রিয় পর্যটনকেন্দ্র এবং ভালোবাসার প্রতীক হিসেবে তার পরিচয় অটুট রয়েছে। প্রতিবছর বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে লাখো পর্যটক এই ঐতিহাসিক স্থাপনাটি দেখতে আগ্রায় যান। ইতিহাসবিদদের মতে, মতভেদ থাকলেও তাজমহলের প্রকৃত ইতিহাস নির্ধারণে নির্ভর করতে হবে প্রমাণভিত্তিক গবেষণা ও নিরপেক্ষ ইতিহাসচর্চার ওপর।