ঢাকা ০১:১০ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ০৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১৮ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

ঘুমের মধ্যে পড়ে যাওয়ার অনুভূতি কেন হয়? জানুন কারণ

ঘুমের সময় হিপনিক জার্ক একটি সাধারণ অভিজ্ঞতা। ছবি: সংগৃহীত

ঘুমের মধ্যে হঠাৎ মনে হয় যেন অনেক উঁচু জায়গা থেকে নিচে পড়ে যাচ্ছেন, আর সেই অনুভূতিতে চমকে উঠে ঘুম ভেঙে যায়। অনেকের হাত-পা বা পুরো শরীর হঠাৎ ঝাঁকুনি দিয়েও ওঠে। চিকিৎসাবিজ্ঞানে এই ঘটনাকে বলা হয় হিপনিক জার্ক। বিশেষজ্ঞদের মতে, এটি বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই স্বাভাবিক শারীরবৃত্তীয় প্রতিক্রিয়া হলেও কিছু ক্ষেত্রে এটি স্নায়বিক সমস্যার ইঙ্গিতও হতে পারে।

স্নায়ুরোগ বিশেষজ্ঞ ডা. সিন্ধুজা জানিয়েছেন, এই অভিজ্ঞতা খুবই সাধারণ। গবেষণায় দেখা গেছে, জীবনের কোনো না কোনো সময়ে প্রায় ৬০ থেকে ৭০ শতাংশ মানুষ হিপনিক জার্ক অনুভব করেন। কারও ক্ষেত্রে এটি খুব হালকা হয়, আবার কারও ক্ষেত্রে এতটাই তীব্র হতে পারে যে ঘুম ভেঙে যায়।

হিপনিক জার্ক মূলত ঘুমের শুরুতে ঘটে যাওয়া একটি অনিচ্ছাকৃত পেশী সংকোচন। যখন একজন মানুষ জেগে থাকা অবস্থা থেকে ধীরে ধীরে ঘুমে প্রবেশ করেন, তখন শরীরের পেশী শিথিল হতে শুরু করে। এই পরিবর্তনের সময়ই হঠাৎ শরীর কেঁপে ওঠা বা পড়ে যাওয়ার অনুভূতি তৈরি হতে পারে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, এই অনুভূতি সাধারণত ঘুমের প্রথম বা দ্বিতীয় ধাপে দেখা যায়। এ সময় অনেকেই হঠাৎ শূন্যে পড়ে যাওয়ার অনুভূতি, বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হওয়ার মতো ঝাঁকুনি, অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ শক্ত হয়ে যাওয়া কিংবা পড়ে যাওয়ার সঙ্গে সম্পর্কিত স্বপ্নও দেখতে পারেন। কারও কারও ক্ষেত্রে ঘুমের মধ্যে কথা বলার ঘটনাও ঘটতে পারে।

মানুষের ঘুম সাধারণত চারটি ধাপে বিভক্ত। প্রথম ধাপে শরীর জাগ্রত অবস্থা থেকে ঘুমে প্রবেশ করে, দ্বিতীয় ধাপে হৃদস্পন্দন ও শরীরের তাপমাত্রা কমতে থাকে। তৃতীয় ধাপটি গভীর ঘুমের, যা শরীরের পুনরুদ্ধার ও রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতার জন্য গুরুত্বপূর্ণ। আর শেষ ধাপ হলো আরইএম, যেখানে বেশিরভাগ স্বপ্ন দেখা হয়।

চিকিৎসকদের মতে, বেশিরভাগ ক্ষেত্রে হিপনিক জার্কের পেছনে নির্দিষ্ট কোনো রোগ থাকে না। তবে কয়েকটি কারণ এই ঝাঁকুনির মাত্রা বাড়িয়ে দিতে পারে। অতিরিক্ত ক্লান্তি, অনিদ্রা, মানসিক চাপ, উদ্বেগ, অতিরিক্ত ক্যাফেইন বা নিকোটিন গ্রহণ এবং অনিয়মিত ঘুমের অভ্যাস এ সমস্যার ঝুঁকি বাড়ায়।

ডা. সিন্ধুজা বলেন, শরীর যখন অতিরিক্ত ক্লান্ত থাকে অথবা দীর্ঘ সময় মানসিক চাপে থাকে, তখন মস্তিষ্ক পুরোপুরি শিথিল হতে পারে না। ফলে জেগে থাকা থেকে ঘুমে যাওয়ার স্বাভাবিক প্রক্রিয়া ব্যাহত হয়। এর ফলেই হঠাৎ পেশীতে ঝাঁকুনি বা পড়ে যাওয়ার অনুভূতি সৃষ্টি হতে পারে।

মার্কিন ন্যাশনাল স্লিপ ফাউন্ডেশন এবং ন্যাশনাল সেন্টার ফর বায়োটেকনোলজি ইনফরমেশনের তথ্য অনুযায়ী, হিপনিক জার্ক সাধারণত ক্ষতিকর নয়। তবে যদি এটি ঘন ঘন ঘটে, প্রতিদিন হয় অথবা খিঁচুনির মতো লক্ষণের সঙ্গে দেখা দেয়, তাহলে তা অন্য কোনো স্নায়বিক সমস্যার ইঙ্গিত হতে পারে।

বিশেষজ্ঞরা জানিয়েছেন, ঘুমের সময় মুখ থেকে ফেনা বের হওয়া, পেশী দীর্ঘ সময় শক্ত হয়ে থাকা, অনিয়ন্ত্রিত প্রস্রাব, অতিরিক্ত নাক ডাকা বা বারবার খিঁচুনির মতো সমস্যা থাকলে অবহেলা করা উচিত নয়। এসব লক্ষণ মৃগীরোগ, নিউরোডিজেনারেটিভ রোগ বা অন্য কোনো স্নায়বিক জটিলতার সঙ্গে সম্পর্কিত হতে পারে।

হিপনিক জার্কের ঝুঁকি কমাতে নিয়মিত ঘুমের অভ্যাস গড়ে তোলা, ক্যাফেইন ও ধূমপান কমানো, মানসিক চাপ নিয়ন্ত্রণ এবং পর্যাপ্ত বিশ্রাম নেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন চিকিৎসকরা। তবে যদি ঘুমের সময় ঝাঁকুনি বারবার হয় বা এর সঙ্গে অস্বাভাবিক উপসর্গ দেখা দেয়, তাহলে দ্রুত একজন স্নায়ুরোগ বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়াই সবচেয়ে নিরাপদ সিদ্ধান্ত।

জনপ্রিয় সংবাদ

ঘুমের মধ্যে পড়ে যাওয়ার অনুভূতি কেন হয়? জানুন কারণ

Update Time : ১০:২৭:৪২ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ১৮ জুলাই ২০২৬

ঘুমের মধ্যে হঠাৎ মনে হয় যেন অনেক উঁচু জায়গা থেকে নিচে পড়ে যাচ্ছেন, আর সেই অনুভূতিতে চমকে উঠে ঘুম ভেঙে যায়। অনেকের হাত-পা বা পুরো শরীর হঠাৎ ঝাঁকুনি দিয়েও ওঠে। চিকিৎসাবিজ্ঞানে এই ঘটনাকে বলা হয় হিপনিক জার্ক। বিশেষজ্ঞদের মতে, এটি বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই স্বাভাবিক শারীরবৃত্তীয় প্রতিক্রিয়া হলেও কিছু ক্ষেত্রে এটি স্নায়বিক সমস্যার ইঙ্গিতও হতে পারে।

স্নায়ুরোগ বিশেষজ্ঞ ডা. সিন্ধুজা জানিয়েছেন, এই অভিজ্ঞতা খুবই সাধারণ। গবেষণায় দেখা গেছে, জীবনের কোনো না কোনো সময়ে প্রায় ৬০ থেকে ৭০ শতাংশ মানুষ হিপনিক জার্ক অনুভব করেন। কারও ক্ষেত্রে এটি খুব হালকা হয়, আবার কারও ক্ষেত্রে এতটাই তীব্র হতে পারে যে ঘুম ভেঙে যায়।

হিপনিক জার্ক মূলত ঘুমের শুরুতে ঘটে যাওয়া একটি অনিচ্ছাকৃত পেশী সংকোচন। যখন একজন মানুষ জেগে থাকা অবস্থা থেকে ধীরে ধীরে ঘুমে প্রবেশ করেন, তখন শরীরের পেশী শিথিল হতে শুরু করে। এই পরিবর্তনের সময়ই হঠাৎ শরীর কেঁপে ওঠা বা পড়ে যাওয়ার অনুভূতি তৈরি হতে পারে।

আরও পড়ুন  স্ট্রোকের পর বাস্তবে নেই এমন মানুষকেও কেন দেখেন রোগী?

বিশেষজ্ঞদের মতে, এই অনুভূতি সাধারণত ঘুমের প্রথম বা দ্বিতীয় ধাপে দেখা যায়। এ সময় অনেকেই হঠাৎ শূন্যে পড়ে যাওয়ার অনুভূতি, বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হওয়ার মতো ঝাঁকুনি, অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ শক্ত হয়ে যাওয়া কিংবা পড়ে যাওয়ার সঙ্গে সম্পর্কিত স্বপ্নও দেখতে পারেন। কারও কারও ক্ষেত্রে ঘুমের মধ্যে কথা বলার ঘটনাও ঘটতে পারে।

মানুষের ঘুম সাধারণত চারটি ধাপে বিভক্ত। প্রথম ধাপে শরীর জাগ্রত অবস্থা থেকে ঘুমে প্রবেশ করে, দ্বিতীয় ধাপে হৃদস্পন্দন ও শরীরের তাপমাত্রা কমতে থাকে। তৃতীয় ধাপটি গভীর ঘুমের, যা শরীরের পুনরুদ্ধার ও রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতার জন্য গুরুত্বপূর্ণ। আর শেষ ধাপ হলো আরইএম, যেখানে বেশিরভাগ স্বপ্ন দেখা হয়।

আরও পড়ুন  বেশি কফি খেলে ঘুম কমে, বাড়তে পারে হৃদস্পন্দনের ঝুঁকি

চিকিৎসকদের মতে, বেশিরভাগ ক্ষেত্রে হিপনিক জার্কের পেছনে নির্দিষ্ট কোনো রোগ থাকে না। তবে কয়েকটি কারণ এই ঝাঁকুনির মাত্রা বাড়িয়ে দিতে পারে। অতিরিক্ত ক্লান্তি, অনিদ্রা, মানসিক চাপ, উদ্বেগ, অতিরিক্ত ক্যাফেইন বা নিকোটিন গ্রহণ এবং অনিয়মিত ঘুমের অভ্যাস এ সমস্যার ঝুঁকি বাড়ায়।

ডা. সিন্ধুজা বলেন, শরীর যখন অতিরিক্ত ক্লান্ত থাকে অথবা দীর্ঘ সময় মানসিক চাপে থাকে, তখন মস্তিষ্ক পুরোপুরি শিথিল হতে পারে না। ফলে জেগে থাকা থেকে ঘুমে যাওয়ার স্বাভাবিক প্রক্রিয়া ব্যাহত হয়। এর ফলেই হঠাৎ পেশীতে ঝাঁকুনি বা পড়ে যাওয়ার অনুভূতি সৃষ্টি হতে পারে।

মার্কিন ন্যাশনাল স্লিপ ফাউন্ডেশন এবং ন্যাশনাল সেন্টার ফর বায়োটেকনোলজি ইনফরমেশনের তথ্য অনুযায়ী, হিপনিক জার্ক সাধারণত ক্ষতিকর নয়। তবে যদি এটি ঘন ঘন ঘটে, প্রতিদিন হয় অথবা খিঁচুনির মতো লক্ষণের সঙ্গে দেখা দেয়, তাহলে তা অন্য কোনো স্নায়বিক সমস্যার ইঙ্গিত হতে পারে।

আরও পড়ুন  পিআইসিইউ সংকট ও হাম চিকিৎসা সেবার বাস্তবতা

বিশেষজ্ঞরা জানিয়েছেন, ঘুমের সময় মুখ থেকে ফেনা বের হওয়া, পেশী দীর্ঘ সময় শক্ত হয়ে থাকা, অনিয়ন্ত্রিত প্রস্রাব, অতিরিক্ত নাক ডাকা বা বারবার খিঁচুনির মতো সমস্যা থাকলে অবহেলা করা উচিত নয়। এসব লক্ষণ মৃগীরোগ, নিউরোডিজেনারেটিভ রোগ বা অন্য কোনো স্নায়বিক জটিলতার সঙ্গে সম্পর্কিত হতে পারে।

হিপনিক জার্কের ঝুঁকি কমাতে নিয়মিত ঘুমের অভ্যাস গড়ে তোলা, ক্যাফেইন ও ধূমপান কমানো, মানসিক চাপ নিয়ন্ত্রণ এবং পর্যাপ্ত বিশ্রাম নেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন চিকিৎসকরা। তবে যদি ঘুমের সময় ঝাঁকুনি বারবার হয় বা এর সঙ্গে অস্বাভাবিক উপসর্গ দেখা দেয়, তাহলে দ্রুত একজন স্নায়ুরোগ বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়াই সবচেয়ে নিরাপদ সিদ্ধান্ত।