বর্ষাকালে বাতাসে আর্দ্রতা বেড়ে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ত্বকে ছত্রাক সংক্রমণের ঝুঁকিও উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পায়। বৃষ্টিতে ভেজা, অতিরিক্ত ঘাম এবং দীর্ঘ সময় ভেজা কাপড় বা জুতা ব্যবহার করার কারণে শরীরের বিভিন্ন অংশে সহজেই ফাঙ্গাল ইনফেকশন দেখা দিতে পারে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সামান্য কিছু সতর্কতা মেনে চললেই এই অস্বস্তিকর সমস্যা অনেকটাই প্রতিরোধ করা সম্ভব।
বর্ষার সময়ে বাতাসে জলীয় বাষ্পের পরিমাণ বেশি থাকায় শরীর দীর্ঘ সময় স্যাঁতসেঁতে থাকে। বিশেষ করে বগল, কুঁচকি, ঘাড় কিংবা পায়ের আঙুলের ফাঁকের মতো ভাঁজযুক্ত স্থানগুলোতে ছত্রাক দ্রুত বংশবিস্তার করে। ভেজা কাপড় পরে থাকা বা ঘাম শুকানোর সুযোগ না পাওয়াও সংক্রমণের অন্যতম কারণ।
এ সময় সবচেয়ে বেশি দেখা যায় অ্যাথলেটস ফুট। দীর্ঘক্ষণ ভেজা জুতা বা মোজা পরে থাকলে পায়ের আঙুলের ফাঁকে চুলকানি, লালচে ভাব, চামড়া উঠে যাওয়া কিংবা জ্বালাপোড়ার মতো উপসর্গ দেখা দিতে পারে। সময়মতো যত্ন না নিলে সংক্রমণ আরও বিস্তৃত হতে পারে।
আরেকটি পরিচিত সমস্যা হলো দাউদ বা রিংওয়ার্ম। এটি শরীরের যেকোনো স্থানে গোলাকার লালচে দাগ তৈরি করে, যার চারপাশ কিছুটা উঁচু হয়ে থাকে এবং তীব্র চুলকানি অনুভূত হয়। অনেক সময় আক্রান্ত ব্যক্তি অজান্তেই অন্যের মধ্যে এ সংক্রমণ ছড়িয়ে দিতে পারেন।
বর্ষাকালে ছুলি বা টিনিয়া ভার্সিকলার-এর প্রকোপও বাড়ে। সাধারণত বুক, পিঠ কিংবা ঘাড়ে সাদা, বাদামি অথবা কালচে রঙের ছোট ছোট ছোপ দেখা যায়। শুরুতে তেমন অস্বস্তি না হলেও অবহেলা করলে দাগগুলো ধীরে ধীরে বড় হতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ছত্রাক সংক্রমণ এড়াতে ব্যক্তিগত পরিচ্ছন্নতার কোনো বিকল্প নেই। বৃষ্টিতে ভিজে গেলে দ্রুত গোসল করে শরীর ভালোভাবে মুছে শুকিয়ে নিতে হবে। সুতি ও ঢিলেঢালা পোশাক পরলে শরীরে বাতাস চলাচল সহজ হয় এবং আর্দ্রতা কম জমে।
জুতা ও মোজা ব্যবহারের ক্ষেত্রেও সতর্ক থাকতে হবে। ভেজা জুতা বা মোজা পরে থাকা উচিত নয়। বাইরে থেকে ফিরে পা সাবান দিয়ে ধুয়ে ভালোভাবে শুকিয়ে নেওয়ার অভ্যাস সংক্রমণের ঝুঁকি কমাতে সাহায্য করে। একই সঙ্গে প্রতিদিন পরিষ্কার ও শুকনা মোজা ব্যবহার করাও জরুরি।
ছত্রাক যাতে একজনের কাছ থেকে অন্যজনের শরীরে না ছড়ায়, সেজন্য তোয়ালে, পোশাক, চিরুনি কিংবা অন্যান্য ব্যক্তিগত ব্যবহার্য জিনিস আলাদা রাখা প্রয়োজন। পরিবারের কারও সংক্রমণ থাকলে তার ব্যবহৃত জিনিস অন্যদের ব্যবহার না করাই নিরাপদ।
শুধু শরীর নয়, ঘরের পরিবেশও পরিষ্কার ও শুকনা রাখা জরুরি। প্রতিদিন জানালা খুলে আলো-বাতাস চলাচলের ব্যবস্থা করতে হবে। রান্নাঘর ও বাথরুমে অতিরিক্ত আর্দ্রতা কমাতে এক্সহস্ট ফ্যান ব্যবহার করা যেতে পারে। পাশাপাশি কার্পেট, ম্যাট, এয়ার কন্ডিশনার ও ফ্যানের ফিল্টার নিয়মিত পরিষ্কার রাখলে ছত্রাকের বিস্তার কমে।
ত্বকে ছত্রাক সংক্রমণের লক্ষণ দেখা দিলে আক্রান্ত স্থান পরিষ্কার ও শুকনা রাখতে হবে। চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী অ্যান্টিফাঙ্গাল পাউডার, সাবান, ক্রিম বা প্রয়োজন হলে ওষুধ ব্যবহার করা যেতে পারে। তবে নিজে নিজে স্টেরয়েডযুক্ত মলম ব্যবহার না করে চর্মরোগ বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়াই সবচেয়ে নিরাপদ। বর্ষার সৌন্দর্য উপভোগের পাশাপাশি সামান্য সচেতনতাই ছত্রাক সংক্রমণ থেকে সুরক্ষিত থাকতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
সূত্র: ডা. কাকলী হালদার, সহকারী অধ্যাপক, মাইক্রোবায়োলজি বিভাগ, ঢাকা মেডিকেল কলেজ।




























