২০২৭ শিক্ষাবর্ষের বিনা মূল্যের পাঠ্যবই ছাপানোর ক্ষেত্রে প্রতি ফর্মার মূল্য ৩০ পয়সা বাড়ানোর কারণে সরকারের প্রায় ৩০০ কোটি টাকা অতিরিক্ত ব্যয় হতে পারে বলে অভিযোগ উঠেছে। দেশীয় ও আন্তর্জাতিক বাজারে কাগজের দামে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন না থাকলেও জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড (এনসিটিবি) সর্বোচ্চ দর বৃদ্ধি করেছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো দাবি করেছে। বিষয়টি নিয়ে শিক্ষা খাতে নতুন করে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।
পাঠ্যবই ছাপার হিসাব করা হয় ‘ফর্মা’ অনুযায়ী, যেখানে ১৬ পৃষ্ঠা সমান এক ফর্মা। ২০২৬ শিক্ষাবর্ষে প্রতি ফর্মার সর্বোচ্চ দর ছিল ৩ টাকা ১০ পয়সা। অভিযোগ অনুযায়ী, ২০২৭ সালের ই-টেন্ডারেও প্রথমে একই দর নির্ধারণ করা হয়েছিল। তবে টেন্ডার চলমান অবস্থায় তা বাড়িয়ে ৩ টাকা ৪০ পয়সা করা হয়। প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তরের প্রায় ৩০ কোটি ৬১ লাখ বইয়ে মোট প্রায় এক হাজার কোটি ফর্মা থাকায় এই মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব বড় অঙ্কের অতিরিক্ত ব্যয়ে রূপ নিতে পারে।
এনসিটিবির সাবেক এক চেয়ারম্যান নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, টেন্ডার প্রকাশের পর প্রাক্কলিত মূল্য পরিবর্তন করা নিয়মসঙ্গত নয়। তার মতে, এমন সিদ্ধান্ত নেওয়া হলে তা স্বচ্ছতা ও প্রতিযোগিতামূলক দরপত্র ব্যবস্থার সঙ্গে সাংঘর্ষিক হতে পারে। ফলে পুরো প্রক্রিয়া নিয়ে প্রশ্ন ওঠার সুযোগ তৈরি হয়েছে।
অভিযোগের বিষয়ে এনসিটিবির চেয়ারম্যান অধ্যাপক মোহাম্মদ ফখরুল মাওলা বলেন, আগের বছরের তুলনায় এবার পর্যালোচনা কমিটির সুপারিশে কিছুটা দর বৃদ্ধি করা হয়েছে। তবে টেন্ডার লাইভে থাকা অবস্থায় মূল্য পরিবর্তনের বিষয়টি সম্পর্কে তিনি অবগত নন বলে জানান। অন্যদিকে এনসিটিবির সদস্য (পাঠ্যপুস্তক) অধ্যাপক আবু নাসের টুকু দাবি করেন, সব ধরনের নিয়ম অনুসরণ করেই দর সমন্বয় করা হয়েছে। এনসিটিবির সচিবও কয়েকটি বইয়ের ক্ষেত্রে ব্যয় বৃদ্ধির বিষয়টি স্বীকার করেছেন।
বাংলাদেশ মুদ্রণ শিল্প সমিতির এক শীর্ষ কর্মকর্তা অভিযোগ করেন, পাঠ্যবই ছাপানোর পুরো প্রক্রিয়ায় বিভিন্ন পর্যায়ে অতিরিক্ত অর্থ ব্যয়ের চাপ থাকে। তার দাবি, এ কারণে অনেক ছাপাখানাকে নিম্নমানের কাগজ ব্যবহার করতে বাধ্য হতে হয়। যদিও এসব অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের আনুষ্ঠানিক বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
এদিকে কাগজ কেনা নিয়েও নতুন বিতর্ক তৈরি হয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, বর্তমানে বাজারে প্রতি টন কাগজের দাম প্রায় ১ লাখ ১৫ হাজার টাকা হলেও কিছু ছাপাখানাকে ১ লাখ ৩০ হাজার টাকা দরে কাগজ কেনার চুক্তি করতে চাপ দেওয়া হচ্ছে। এনসিটিবির এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে এমন অভিযোগের সত্যতা নিশ্চিত করেছেন বলে দাবি করা হয়েছে।
অন্যদিকে পেপার মিল মালিক ও ছাপাখানা মালিকদের মধ্যে কাগজ সরবরাহ এবং মূল্য নির্ধারণ নিয়ে মতবিরোধ চলছে। ছাপাখানা মালিকরা বিদেশ থেকে কাগজ আমদানির সুযোগ চাইলেও পেপার মিল মালিকরা স্থানীয়ভাবে সরবরাহ নিশ্চিত করার পক্ষে অবস্থান নিয়েছেন। বিষয়টি সমাধানে শিক্ষা মন্ত্রণালয় একাধিক বৈঠক করলেও এখনো কোনো সমঝোতায় পৌঁছানো যায়নি।
শিক্ষা-সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মতে, বিনা মূল্যের পাঠ্যবই কর্মসূচি দেশের অন্যতম বড় সামাজিক উদ্যোগ। তাই এ খাতে ব্যয় বৃদ্ধি, দরপত্র প্রক্রিয়া ও কাগজ কেনা নিয়ে ওঠা অভিযোগ নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করে শিক্ষার্থীদের হাতে সময়মতো মানসম্মত বই পৌঁছে দেওয়ার ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন তারা।



























