বাংলাদেশে এসএসসি ও এইচএসসির মতো গুরুত্বপূর্ণ পাবলিক পরীক্ষার প্রশ্নপত্র কীভাবে তৈরি হয়, তা নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। চলমান এইচএসসি পরীক্ষায় পদার্থবিজ্ঞান প্রথমপত্রের প্রশ্নে একাধিক ভুল ধরা পড়ার পর পরীক্ষার্থী ও অভিভাবকদের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। একই সঙ্গে প্রশ্ন উঠেছে, এত গুরুত্বপূর্ণ একটি পরীক্ষার প্রশ্নপত্র তৈরির পর কীভাবে ভুল থেকে যায়।
শিক্ষা মন্ত্রণালয় ইতোমধ্যে স্বীকার করেছে, এইচএসসি পদার্থবিজ্ঞান প্রথমপত্রের সৃজনশীল অংশের দুটি প্রশ্নে ভুল ছিল। বিষয়টি নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সমালোচনা এবং বিভিন্ন স্থানে প্রতিবাদ দেখা দেওয়ার পর সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ এ বিষয়ে ব্যবস্থা নেওয়ার কথা জানিয়েছে।
শিক্ষামন্ত্রী আ ন ম এহছানুল হক মিলন পরীক্ষার্থীদের ভোগান্তির জন্য দুঃখ প্রকাশ করেছেন। তিনি জানান, প্রশ্নপত্র তৈরির প্রক্রিয়া অনেক আগে শুরু হয় এবং দায়িত্ব পরিবর্তনের আগেই এসব প্রশ্ন প্রস্তুত করা হয়েছিল।
তিনি বলেন, প্রশ্নপত্র তৈরি ও মডারেশনের কাজ সাধারণত দীর্ঘ সময়ের একটি প্রক্রিয়া। দায়িত্ব নেওয়ার পর নতুন কর্তৃপক্ষের পক্ষে আগের ধাপের প্রশ্নপত্র পরিবর্তন করা সম্ভব হয় না। তবে ভুল থাকা প্রশ্নগুলোর ক্ষেত্রে পরীক্ষার্থীদের ক্ষতি পুষিয়ে দিতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, যেসব প্রশ্নে ভুল পাওয়া গেছে সেগুলোর জন্য পরীক্ষার্থীদের পূর্ণ নম্বর দেওয়ার ব্যবস্থা করা হবে। পাশাপাশি প্রশ্নপত্র চূড়ান্ত করার দায়িত্বে থাকা কয়েকজন শিক্ষকের বিরুদ্ধে সাময়িক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।
শিক্ষা বোর্ডের কর্মকর্তাদের মতে, এসএসসি ও এইচএসসির প্রশ্নপত্র তৈরির পুরো প্রক্রিয়া অত্যন্ত গোপনীয় এবং কয়েকটি ধাপে সম্পন্ন হয়। একটি প্রশ্নপত্র পরীক্ষার হলে পৌঁছানোর আগে একাধিক যাচাই-বাছাইয়ের মধ্য দিয়ে যেতে হয়।
সাধারণত বিভিন্ন বিষয়ের অভিজ্ঞ ও নির্বাচিত শিক্ষকদের মাধ্যমে প্রথমে প্রশ্নের খসড়া তৈরি করা হয়। এরপর প্রশ্নগুলো যাচাই, পরিমার্জন এবং মডারেশনের জন্য সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞদের কাছে পাঠানো হয়। এই ধাপে প্রশ্নের মান, পাঠ্যসূচির সঙ্গে মিল এবং ভুল-ত্রুটি পরীক্ষা করা হয়।
যশোর মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ডের পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক এস এম হোসেন আলী জানান, একটি প্রশ্নপত্র চূড়ান্ত হওয়ার আগে বেশ কয়েকটি ধাপ অতিক্রম করে। পুরো প্রক্রিয়ায় নির্বাচিত শিক্ষক ও কর্মকর্তারা যুক্ত থাকেন এবং প্রতিটি পর্যায়ে গোপনীয়তা বজায় রাখা হয়।
প্রশ্নপত্র তৈরির পর সেটি নির্দিষ্ট নিয়ম অনুযায়ী ছাপানোর জন্য পাঠানো হয়। ছাপানোর সময়ও নিরাপত্তার বিষয়টি গুরুত্ব দেওয়া হয়, যাতে কোনো তথ্য বাইরে প্রকাশ না হয়। এরপর তা সংরক্ষণ করে পরীক্ষার নির্ধারিত দিনে কেন্দ্রগুলোতে পাঠানো হয়।
তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এত কঠোর নিয়ম থাকার পরও মানুষের ভুলের কারণে কখনো কখনো প্রশ্নপত্রে ত্রুটি দেখা দিতে পারে। এজন্য প্রতিটি ধাপে আরও কার্যকর যাচাই ব্যবস্থা এবং প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানোর প্রয়োজন রয়েছে।
শিক্ষাবিদদের মতে, পাবলিক পরীক্ষার প্রশ্নপত্রে একটি ছোট ভুলও হাজারো শিক্ষার্থীর ওপর প্রভাব ফেলতে পারে। তাই প্রশ্ন প্রণয়ন থেকে শুরু করে ছাপানো পর্যন্ত প্রতিটি ধাপে দায়িত্বশীলতা ও সতর্কতা নিশ্চিত করা জরুরি।
এসএসসি ও এইচএসসি পরীক্ষার ফলাফল শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যৎ শিক্ষা ও ক্যারিয়ারের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত। ফলে প্রশ্নপত্র তৈরির পুরো প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা, দক্ষতা এবং কঠোর মান নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।



























