ঢাকা ১০:৫১ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ১৮ জুলাই ২০২৬, ৩ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম :

বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানি কমেছে সবচেয়ে বেশি, কেন বাড়ছে উদ্বেগ?

  • ডেস্ক নিউজ
  • Update Time : ০৮:৫১:৫৩ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ১৮ জুলাই ২০২৬
  • ৫০৬

ইইউ বাজারে প্রতিযোগীদের তুলনায় সবচেয়ে বেশি কমেছে বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানি। ছবি: সংগৃহীত

বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানি ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) বাজারে নতুন করে চাপের মুখে পড়েছে। চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে মে—এই পাঁচ মাসে প্রতিযোগী দেশগুলোর তুলনায় বাংলাদেশের তৈরি পোশাক রপ্তানি সবচেয়ে বেশি কমেছে। ইউরোস্ট্যাটের সর্বশেষ তথ্য বলছে, এ সময়ে বাংলাদেশের রপ্তানি প্রায় ১৮ দশমিক ৯ শতাংশ কমেছে। একই সঙ্গে কমেছে রপ্তানি হওয়া পোশাকের গড় মূল্যও, যা দেশের প্রধান রপ্তানি খাতের জন্য উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

ইইউ বাংলাদেশের তৈরি পোশাকের সবচেয়ে বড় রপ্তানি গন্তব্য। মোট পোশাক রপ্তানির প্রায় অর্ধেকই এই অঞ্চলে যায়। কিন্তু বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা, ইউরোপে ভোক্তাদের ব্যয় কমে যাওয়া এবং আন্তর্জাতিক বাজারে চাহিদা হ্রাস পাওয়ায় পুরো বাজারই সংকুচিত হয়েছে। তবে এই সংকোচনের মধ্যেও বাংলাদেশের রপ্তানি কমেছে প্রতিযোগী দেশগুলোর তুলনায় অনেক বেশি, যা শিল্পসংশ্লিষ্টদের নতুন করে ভাবিয়ে তুলেছে।

পরিসংখ্যান অনুযায়ী, জানুয়ারি থেকে মে পর্যন্ত বাংলাদেশ ইইউতে ৭ দশমিক ২৭ বিলিয়ন ইউরো মূল্যের তৈরি পোশাক রপ্তানি করেছে। একই সময়ে চীনের রপ্তানি কমেছে প্রায় ৪ শতাংশ এবং ভিয়েতনামের মাত্র দেড় শতাংশ। ভারতের রপ্তানি কমেছে ১৩ দশমিক ৩৩ শতাংশ, তুরস্কের ১৫ দশমিক ৬৬ শতাংশ, কম্বোডিয়ার ১০ দশমিক ৭৭ শতাংশ এবং পাকিস্তানের ১৭ শতাংশ। অর্থাৎ শীর্ষ রপ্তানিকারক দেশগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বড় পতনের মুখে পড়েছে বাংলাদেশ।

শুধু রপ্তানির মূল্য নয়, রপ্তানির পরিমাণও কমেছে। চলতি বছরের প্রথম পাঁচ মাসে বাংলাদেশ থেকে ইইউতে প্রায় ৫২ কোটি কেজি তৈরি পোশাক রপ্তানি হয়েছে, যা আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ১০ শতাংশের বেশি কম। একই সঙ্গে প্রতি কেজি পোশাকের গড় রপ্তানি মূল্য দাঁড়িয়েছে ১৩ দশমিক ৯৬ ইউরো, যা আগের বছরের তুলনায় প্রায় ৯ দশমিক ৪১ শতাংশ কম। কম দামে রপ্তানি করতে বাধ্য হওয়ায় উৎপাদকদের লাভের মার্জিনও উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যাচ্ছে।

অন্যদিকে প্রতিযোগী কয়েকটি দেশ তুলনামূলক ভালো অবস্থানে রয়েছে। ভিয়েতনাম প্রতি কেজি পোশাক সবচেয়ে বেশি দামে রপ্তানি করেছে এবং তাদের গড় মূল্য আগের বছরের তুলনায় প্রায় ১২ শতাংশ বেড়েছে। তুরস্ক, কম্বোডিয়া ও ইন্দোনেশিয়াও গড় রপ্তানি মূল্য বাড়াতে সক্ষম হয়েছে। এতে বোঝা যাচ্ছে, আন্তর্জাতিক বাজারে মূল্য সংযোজন ও পণ্যের বৈচিত্র্য বাড়াতে না পারলে বাংলাদেশের প্রতিযোগিতা আরও কঠিন হয়ে উঠবে।

পোশাকশিল্প মালিকদের মতে, বৈশ্বিক পরিস্থিতির পাশাপাশি দেশের অভ্যন্তরীণ নানা সমস্যাও এই পতনের অন্যতম কারণ। ব্যাংকিং খাতের বিধিনিষেধের কারণে অনেক কারখানা সময়মতো কাঁচামাল আমদানির জন্য ঋণপত্র খুলতে পারেনি। পাশাপাশি গ্যাস ও বিদ্যুতের ঘাটতির কারণে উৎপাদন ব্যাহত হয়েছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে আন্তর্জাতিক বাজারে কম দামে ক্রয়াদেশ নেওয়ার তীব্র প্রতিযোগিতা, যা রপ্তানির গড় মূল্য আরও কমিয়ে দিয়েছে।

শিল্পসংশ্লিষ্টদের মতে, একবার বিদেশি ক্রেতার অর্ডার হারিয়ে গেলে তা পুনরুদ্ধার করতে তিন থেকে চার বছর পর্যন্ত সময় লাগতে পারে। তাই শুধু কম দামে অর্ডার নেওয়ার পরিবর্তে উৎপাদন সক্ষমতা বৃদ্ধি, উচ্চমূল্যের পণ্যে গুরুত্ব দেওয়া এবং সময়মতো সরবরাহ নিশ্চিত করার ওপর জোর দেওয়া প্রয়োজন। একই সঙ্গে জ্বালানি সরবরাহ, সহজ ব্যাংকিং সুবিধা এবং রপ্তানিবান্ধব নীতিমালা নিশ্চিত করা হলে শিল্পটি আবারও ঘুরে দাঁড়াতে পারবে।

বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, তৈরি পোশাক খাত বাংলাদেশের অর্থনীতির প্রধান চালিকাশক্তি। তাই এই খাতে দীর্ঘমেয়াদি সংকট তৈরি হলে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ, কর্মসংস্থান এবং সামগ্রিক অর্থনীতিতেও নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। এজন্য সরকার, উদ্যোক্তা ও সংশ্লিষ্ট সব পক্ষকে সমন্বিত উদ্যোগ নিতে হবে, যাতে আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের প্রতিযোগিতা ও আস্থা আবারও শক্তিশালী হয়।

জনপ্রিয় সংবাদ

বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানি কমেছে সবচেয়ে বেশি, কেন বাড়ছে উদ্বেগ?

Update Time : ০৮:৫১:৫৩ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ১৮ জুলাই ২০২৬

বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানি ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) বাজারে নতুন করে চাপের মুখে পড়েছে। চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে মে—এই পাঁচ মাসে প্রতিযোগী দেশগুলোর তুলনায় বাংলাদেশের তৈরি পোশাক রপ্তানি সবচেয়ে বেশি কমেছে। ইউরোস্ট্যাটের সর্বশেষ তথ্য বলছে, এ সময়ে বাংলাদেশের রপ্তানি প্রায় ১৮ দশমিক ৯ শতাংশ কমেছে। একই সঙ্গে কমেছে রপ্তানি হওয়া পোশাকের গড় মূল্যও, যা দেশের প্রধান রপ্তানি খাতের জন্য উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

ইইউ বাংলাদেশের তৈরি পোশাকের সবচেয়ে বড় রপ্তানি গন্তব্য। মোট পোশাক রপ্তানির প্রায় অর্ধেকই এই অঞ্চলে যায়। কিন্তু বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা, ইউরোপে ভোক্তাদের ব্যয় কমে যাওয়া এবং আন্তর্জাতিক বাজারে চাহিদা হ্রাস পাওয়ায় পুরো বাজারই সংকুচিত হয়েছে। তবে এই সংকোচনের মধ্যেও বাংলাদেশের রপ্তানি কমেছে প্রতিযোগী দেশগুলোর তুলনায় অনেক বেশি, যা শিল্পসংশ্লিষ্টদের নতুন করে ভাবিয়ে তুলেছে।

পরিসংখ্যান অনুযায়ী, জানুয়ারি থেকে মে পর্যন্ত বাংলাদেশ ইইউতে ৭ দশমিক ২৭ বিলিয়ন ইউরো মূল্যের তৈরি পোশাক রপ্তানি করেছে। একই সময়ে চীনের রপ্তানি কমেছে প্রায় ৪ শতাংশ এবং ভিয়েতনামের মাত্র দেড় শতাংশ। ভারতের রপ্তানি কমেছে ১৩ দশমিক ৩৩ শতাংশ, তুরস্কের ১৫ দশমিক ৬৬ শতাংশ, কম্বোডিয়ার ১০ দশমিক ৭৭ শতাংশ এবং পাকিস্তানের ১৭ শতাংশ। অর্থাৎ শীর্ষ রপ্তানিকারক দেশগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বড় পতনের মুখে পড়েছে বাংলাদেশ।

আরও পড়ুন  আজকের বিনিময় হার: গুরুত্বপূর্ণ ডলার স্থির, কমল ইউরো-পাউন্ড

শুধু রপ্তানির মূল্য নয়, রপ্তানির পরিমাণও কমেছে। চলতি বছরের প্রথম পাঁচ মাসে বাংলাদেশ থেকে ইইউতে প্রায় ৫২ কোটি কেজি তৈরি পোশাক রপ্তানি হয়েছে, যা আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ১০ শতাংশের বেশি কম। একই সঙ্গে প্রতি কেজি পোশাকের গড় রপ্তানি মূল্য দাঁড়িয়েছে ১৩ দশমিক ৯৬ ইউরো, যা আগের বছরের তুলনায় প্রায় ৯ দশমিক ৪১ শতাংশ কম। কম দামে রপ্তানি করতে বাধ্য হওয়ায় উৎপাদকদের লাভের মার্জিনও উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যাচ্ছে।

আরও পড়ুন  গাবতলীতে জনসভায় রসিকতায় মাতালেন প্রধানমন্ত্রী, কলেজ সরকারি করার ঘোষণা

অন্যদিকে প্রতিযোগী কয়েকটি দেশ তুলনামূলক ভালো অবস্থানে রয়েছে। ভিয়েতনাম প্রতি কেজি পোশাক সবচেয়ে বেশি দামে রপ্তানি করেছে এবং তাদের গড় মূল্য আগের বছরের তুলনায় প্রায় ১২ শতাংশ বেড়েছে। তুরস্ক, কম্বোডিয়া ও ইন্দোনেশিয়াও গড় রপ্তানি মূল্য বাড়াতে সক্ষম হয়েছে। এতে বোঝা যাচ্ছে, আন্তর্জাতিক বাজারে মূল্য সংযোজন ও পণ্যের বৈচিত্র্য বাড়াতে না পারলে বাংলাদেশের প্রতিযোগিতা আরও কঠিন হয়ে উঠবে।

পোশাকশিল্প মালিকদের মতে, বৈশ্বিক পরিস্থিতির পাশাপাশি দেশের অভ্যন্তরীণ নানা সমস্যাও এই পতনের অন্যতম কারণ। ব্যাংকিং খাতের বিধিনিষেধের কারণে অনেক কারখানা সময়মতো কাঁচামাল আমদানির জন্য ঋণপত্র খুলতে পারেনি। পাশাপাশি গ্যাস ও বিদ্যুতের ঘাটতির কারণে উৎপাদন ব্যাহত হয়েছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে আন্তর্জাতিক বাজারে কম দামে ক্রয়াদেশ নেওয়ার তীব্র প্রতিযোগিতা, যা রপ্তানির গড় মূল্য আরও কমিয়ে দিয়েছে।

আরও পড়ুন  ফুসফুসের ক্যানসার: অবাক করা ৭ কারণ, লক্ষণ ও প্রতিরোধের সহজ উপায়

শিল্পসংশ্লিষ্টদের মতে, একবার বিদেশি ক্রেতার অর্ডার হারিয়ে গেলে তা পুনরুদ্ধার করতে তিন থেকে চার বছর পর্যন্ত সময় লাগতে পারে। তাই শুধু কম দামে অর্ডার নেওয়ার পরিবর্তে উৎপাদন সক্ষমতা বৃদ্ধি, উচ্চমূল্যের পণ্যে গুরুত্ব দেওয়া এবং সময়মতো সরবরাহ নিশ্চিত করার ওপর জোর দেওয়া প্রয়োজন। একই সঙ্গে জ্বালানি সরবরাহ, সহজ ব্যাংকিং সুবিধা এবং রপ্তানিবান্ধব নীতিমালা নিশ্চিত করা হলে শিল্পটি আবারও ঘুরে দাঁড়াতে পারবে।

বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, তৈরি পোশাক খাত বাংলাদেশের অর্থনীতির প্রধান চালিকাশক্তি। তাই এই খাতে দীর্ঘমেয়াদি সংকট তৈরি হলে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ, কর্মসংস্থান এবং সামগ্রিক অর্থনীতিতেও নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। এজন্য সরকার, উদ্যোক্তা ও সংশ্লিষ্ট সব পক্ষকে সমন্বিত উদ্যোগ নিতে হবে, যাতে আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের প্রতিযোগিতা ও আস্থা আবারও শক্তিশালী হয়।