ফুসফুসের ক্যানসার বর্তমানে বিশ্বজুড়ে সবচেয়ে প্রাণঘাতী ক্যানসারগুলোর একটি। প্রতি বছর লাখ লাখ মানুষ এই রোগে আক্রান্ত হচ্ছেন এবং অনেকেই প্রাণ হারাচ্ছেন। বিশেষজ্ঞদের মতে, পুরুষদের মধ্যে এই ক্যানসারে আক্রান্ত হওয়ার হার তুলনামূলক বেশি। এর প্রধান কারণ দীর্ঘদিনের ধূমপান, তামাকজাত পণ্যের ব্যবহার এবং ক্ষতিকর পরিবেশগত প্রভাব। তবে সচেতনতা ও সময়মতো পরীক্ষা করলে এই রোগের ঝুঁকি অনেকটাই কমানো সম্ভব।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, প্রতি বছর বিশ্বে প্রায় ২৫ লাখ মানুষ নতুন করে ফুসফুসের ক্যানসারে আক্রান্ত হন। বাংলাদেশেও ক্যানসারে আক্রান্ত রোগীদের উল্লেখযোগ্য একটি অংশ এই রোগে ভুগছেন। চিকিৎসকদের মতে, অধিকাংশ রোগী তখনই হাসপাতালে আসেন, যখন রোগটি অনেক দূর এগিয়ে যায়। ফলে চিকিৎসা জটিল হয়ে পড়ে।
চিকিৎসকদের ভাষ্য, ফুসফুসের ক্যানসার হওয়ার সবচেয়ে বড় কারণ ধূমপান। সিগারেট, বিড়ি কিংবা অন্যান্য তামাকজাত পণ্যের ধোঁয়ায় থাকা ক্ষতিকর রাসায়নিক ফুসফুসের কোষকে ধীরে ধীরে ক্ষতিগ্রস্ত করে। শুধু ধূমপায়ীরাই নন, যারা নিয়মিত অন্যের সিগারেটের ধোঁয়ার মধ্যে থাকেন, তারাও সমানভাবে ঝুঁকিতে থাকেন। এছাড়া বায়ুদূষণ, রেডন গ্যাস, অ্যাসবেস্টস এবং পারিবারিক ইতিহাসও এই রোগের ঝুঁকি বাড়ায়।
রোগটির সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো, শুরুতে সাধারণত কোনো লক্ষণ দেখা যায় না। তবে দীর্ঘদিন ধরে কাশি, কাশির সঙ্গে রক্ত আসা, শ্বাস নিতে কষ্ট হওয়া, বুক বা পিঠে ব্যথা, বারবার নিউমোনিয়া বা ব্রঙ্কাইটিস হওয়া, অকারণে ওজন কমে যাওয়া এবং অতিরিক্ত দুর্বলতা দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত। এসব লক্ষণকে অবহেলা করলে রোগটি জটিল পর্যায়ে পৌঁছে যেতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ফুসফুসের ক্যানসার মূলত দুই ধরনের হয়ে থাকে। এর মধ্যে নন-স্মল সেল ক্যানসার সবচেয়ে বেশি দেখা যায় এবং এটি তুলনামূলক ধীরে বৃদ্ধি পায়। অন্যদিকে স্মল সেল ক্যানসার দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে এবং এটি সাধারণত দীর্ঘদিন ধূমপানকারীদের মধ্যে বেশি দেখা যায়। তাই রোগ শনাক্ত হওয়ার পর দ্রুত চিকিৎসা শুরু করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
রোগ নির্ণয়ের জন্য চিকিৎসক প্রথমে রোগীর ইতিহাস ও শারীরিক অবস্থা মূল্যায়ন করেন। এরপর প্রয়োজন অনুযায়ী বুকের এক্স-রে, সিটি স্ক্যান, কফ পরীক্ষা, ব্রঙ্কোস্কপি, বায়োপসি কিংবা পিইটি স্ক্যানের মতো পরীক্ষা করা হয়। এসব পরীক্ষার মাধ্যমে ক্যানসারের ধরন ও বিস্তারের মাত্রা নির্ণয় করা সম্ভব হয় এবং সেই অনুযায়ী চিকিৎসা পরিকল্পনা করা হয়।
বর্তমানে ফুসফুসের ক্যানসার চিকিৎসায় বিভিন্ন আধুনিক পদ্ধতি ব্যবহার করা হচ্ছে। রোগের ধরন ও অবস্থার ওপর নির্ভর করে কেমোথেরাপি, রেডিওথেরাপি, টার্গেটেড থেরাপি, ইমিউনোথেরাপি কিংবা প্রয়োজন হলে অস্ত্রোপচার করা হয়। অনেক ক্ষেত্রেই একাধিক চিকিৎসা একসঙ্গে প্রয়োগ করা হয়, যাতে রোগ নিয়ন্ত্রণে ভালো ফল পাওয়া যায়।
চিকিৎসকদের মতে, এই রোগ প্রতিরোধের সবচেয়ে কার্যকর উপায় হলো ধূমপান সম্পূর্ণভাবে ছেড়ে দেওয়া। পাশাপাশি পরোক্ষ ধূমপান থেকেও দূরে থাকতে হবে। বায়ুদূষণ এড়িয়ে চলা, কর্মস্থলে প্রয়োজনীয় সুরক্ষা সরঞ্জাম ব্যবহার, পুষ্টিকর খাবার খাওয়া, নিয়মিত ব্যায়াম করা এবং ওজন নিয়ন্ত্রণে রাখা ফুসফুস সুস্থ রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। যাদের দীর্ঘদিন ধূমপানের অভ্যাস রয়েছে বা পারিবারিকভাবে ঝুঁকি আছে, তাদের নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা করানো উচিত।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ফুসফুসের ক্যানসার হলেও দ্রুত শনাক্ত করা গেলে সফল চিকিৎসার সম্ভাবনা অনেক বেড়ে যায়। তাই দীর্ঘদিনের কাশি বা শ্বাসকষ্টকে সাধারণ সমস্যা ভেবে অবহেলা না করে দ্রুত বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি। সচেতনতা, ধূমপান বর্জন এবং সময়মতো স্ক্রিনিংয়ের মাধ্যমেই এই প্রাণঘাতী রোগের ঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো সম্ভব।

























