কথা ছিল প্রবাসের কর্মজীবন শেষে দেশে ফিরবেন জামশেদুল ইসলাম আলাউদ্দিন। মায়ের ও ছয় বোনের সঙ্গে কথা বলে বিয়ের পরিকল্পনাও করেছিলেন। নতুন বরের সাজে সাজবেন, ধুমধাম করে বরযাত্রী নিয়ে বিয়ের পিঁড়িতে বসবেন—এমন স্বপ্নই দেখেছিল পরিবার। ছয় বোনের একমাত্র ভাই এবং পরিবারের একমাত্র ছেলে জামশেদুলকে ঘিরে তাই বাড়িতে ছিল আনন্দের অপেক্ষা। কিন্তু সেই অপেক্ষার শেষ হলো কফিনে।
শুক্রবার (৪ সেপ্টেম্বর) সকালে সংযুক্ত আরব আমিরাত থেকে শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে আসে ২৫ বছর বয়সী জামশেদুল ইসলাম আলাউদ্দিনের মরদেহ। পরে জুমার নামাজের সময় তার মরদেহ নেওয়া হয় চট্টগ্রামের বোয়ালখালী উপজেলার শ্রীপুর-খরণদ্বীপ ইউনিয়নের ২ নম্বর ওয়ার্ডের নিজ বাড়িতে। কফিন বাড়িতে পৌঁছানোর পর স্বজনদের কান্নায় ভারী হয়ে ওঠে পুরো পরিবেশ।
কফিনের গাড়ির পাশে দাঁড়িয়ে ছেলের মুখের দিকে তাকিয়ে ছিলেন বাবা মো. নুরুল ইসলাম। চোখ দিয়ে পানি গড়িয়ে পড়ছিল তার। কান্নায় বারবার ভেঙে পড়ছিলেন তিনি। বুক চাপড়ে বিলাপ করতে করতে বলছিলেন, ‘হায়রে পুত, হায়রে পুত।’
পরিবারের স্বজনেরা জানান, প্রায় তিন বছর আগে জীবিকার সন্ধানে সংযুক্ত আরব আমিরাতে পাড়ি জমান জামশেদুল। ছয় বোন ও এক ভাইয়ের মধ্যে তিনি ছিলেন সবার ছোট। পরিবারের একমাত্র ছেলে হওয়ায় বাবা-মা ও বোনদের কাছে তিনি ছিলেন অত্যন্ত আদরের। পরিবারের আর্থিক দায়িত্বের একটি বড় অংশও তার ওপর নির্ভরশীল ছিল।
প্রবাসে যাওয়ার পর পরিবারের ভবিষ্যৎ নিয়ে নানা পরিকল্পনা করেছিলেন জামশেদুল। এবার দেশে ফিরে বিয়ের পিঁড়িতে বসার কথা ছিল তার। ছয় বোনের একমাত্র ভাইকে নতুন বরের সাজে দেখার অপেক্ষায় ছিলেন পরিবারের সদস্যরা। বিয়েকে ঘিরে স্বজনদের মধ্যে ছিল আনন্দের প্রস্তুতি। কিন্তু সেই আনন্দ আর বাস্তবে রূপ নেয়নি।
গত ১৬ আগস্ট সংযুক্ত আরব আমিরাতের আবুধাবির মুসাফফা এলাকা থেকে আল আইন এলাকায় নির্মাণকাজে যান জামশেদুল। সেখানে একটি ভবনে কাজ করার সময় সিঁড়ি থেকে পড়ে গুরুতর আহত হন তিনি। দুর্ঘটনায় তার মাথায় গুরুতর আঘাত লাগে। সহকর্মীরা দ্রুত তাকে স্থানীয় একটি হাসপাতালে নিয়ে ভর্তি করেন।
হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় জামশেদুলের শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে তাকে আইসিইউতে নেওয়া হয়। দীর্ঘদিন চিকিৎসকদের তত্ত্বাবধানে থাকার পর ২৯ আগস্ট বিকেলে চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন।
জামশেদুলের মৃত্যুর খবর দেশে পৌঁছানোর পর থেকেই মরদেহের অপেক্ষায় ছিলেন পরিবারের সদস্যরা। প্রবাসে থাকা একজন স্বজনকে জীবিত অবস্থায় ফিরে পাওয়ার যে প্রত্যাশা ছিল, তা মুহূর্তেই শোকে পরিণত হয়। প্রয়োজনীয় প্রক্রিয়া শেষ করে অবশেষে শুক্রবার সকালে তার মরদেহ শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে পৌঁছায়।
মরদেহ বাড়িতে পৌঁছানোর খবর ছড়িয়ে পড়লে স্বজন ও প্রতিবেশীরা সেখানে জড়ো হতে থাকেন। কফিন দেখেই কান্নায় ভেঙে পড়েন পরিবারের সদস্যরা। বিশেষ করে ছয় বোনের কান্নায় ভারী হয়ে ওঠে বাড়ির পরিবেশ। যে বাড়িতে ভাইয়ের বিয়েকে ঘিরে আনন্দের প্রস্তুতি চলার কথা ছিল, সেই বাড়িতেই নেমে আসে শোকের আবহ।
বাবা মো. নুরুল ইসলাম ছেলের কফিনের পাশে দাঁড়িয়ে বারবার কান্নায় ভেঙে পড়েন। একমাত্র ছেলেকে হারানোর শোক যেন কোনোভাবেই মেনে নিতে পারছিলেন না তিনি। স্বজনেরা তাকে সান্ত্বনা দেওয়ার চেষ্টা করলেও বারবার ছেলের কথা বলে আহাজারি করতে দেখা যায় তাকে।
নিহতের বোনের স্বামী ওসমান জানান, প্রয়োজনীয় প্রক্রিয়া শেষে শুক্রবার সকালে জামশেদুলের মরদেহ শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে পৌঁছায়। এরপর স্বজনদের উপস্থিতিতে তার মরদেহ বাড়িতে নেওয়া হয় এবং দাফন সম্পন্ন করা হয়।
জামশেদুলের স্বজনেরা জানান, পরিবারের জন্য ভালো কিছু করার আশায় তিনি কয়েক বছর আগে প্রবাসে পাড়ি জমিয়েছিলেন। কঠোর পরিশ্রম করে পরিবারের পাশে দাঁড়ানোর চেষ্টা করছিলেন। দেশে ফিরে বিয়ে করে নতুন জীবন শুরু করার পরিকল্পনাও ছিল তার। কিন্তু নির্মাণকাজের একটি দুর্ঘটনা তার সব স্বপ্ন থামিয়ে দিল।
প্রবাসে কর্মরত বাংলাদেশিদের জীবনে কর্মক্ষেত্রে নিরাপত্তার বিষয়টি কতটা গুরুত্বপূর্ণ, জামশেদুলের মৃত্যুর ঘটনাটি আবারও তা সামনে নিয়ে এসেছে। পরিবারের একমাত্র ছেলে ও উপার্জনের অন্যতম ভরসাকে হারিয়ে এখন শোকে কাতর তার পরিবার। আনন্দের অপেক্ষায় থাকা সেই পরিবারে এখন কেবলই স্বজন হারানোর বেদনা।




























