ঢাকা ০৬:০০ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ০৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ২০ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

‘জাইন্না-শুইন্না কে লস দিবে’—পাট চাষে অনাগ্রহী কৃষক

উৎপাদন খরচ ও জাগ দেওয়ার সংকটে বাঞ্ছারামপুরে কমছে পাটের আবাদ।

‘পাট চাষ কইরা কি করুম? ১ মণ পাট বেইচ্চা ১ মণ চাইল কিনতে পারি না। জাইন্না-শুইন্না কে লস দিবে?’—কেন পাট চাষ করছেন না, এমন প্রশ্নের জবাবে কথাগুলো বলেন ব্রাহ্মণবাড়িয়ার বাঞ্ছারামপুর উপজেলার হোগলাকান্দি গ্রামের কৃষক ছালে মুছা মিয়া।

একসময় বাঞ্ছারামপুর উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়নের মাঠজুড়ে পাটের আবাদ দেখা গেলেও কয়েক বছর ধরে চিত্র বদলেছে। উৎপাদন খরচ বাড়ার সঙ্গে পাটের বাজারদর প্রত্যাশা অনুযায়ী না থাকায় অনেক কৃষক পাট চাষ থেকে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছেন। পাটের বদলে কেউ ধান, কেউ ভুট্টাসহ অন্যান্য ফসল চাষে ঝুঁকছেন।

উপজেলার ১৩টি ইউনিয়নের বিভিন্ন এলাকায় ঘুরে দেখা গেছে, বর্ষা মৌসুমে যেখানে আগে বিস্তীর্ণ জমিতে পাটের ক্ষেত দেখা যেত, সেখানে এবার অনেক জমিতে ধানের আবাদ হয়েছে। কৃষকদের অভিযোগ, পাট উৎপাদনের পর বিক্রির আগ পর্যন্ত যে খরচ হয়, তা দিন দিন বেড়েই চলেছে।

তেজখালি ইউনিয়নের বিষ্ণারামপুর গ্রামের কৃষক সফর আলী বলেন, এক বিঘা জমিতে পাট চাষ করতে প্রায় ১৬ থেকে ১৭ হাজার টাকা খরচ হয়। প্রতি বিঘায় ১০ থেকে ১২ মণ পর্যন্ত পাট পাওয়া যায়। ভালো দাম পাওয়া গেলে প্রতি মণ সর্বোচ্চ ৩ হাজার ৫০০ টাকা পর্যন্ত বিক্রি করা যায়।

তার ভাষ্য, পাট চাষে জমি প্রস্তুত, বীজ, সার ও কীটনাশকের পাশাপাশি শ্রমিকের খরচও রয়েছে। এর সঙ্গে পাট কাটার পর ক্ষেত থেকে বহন করে জাগ দেওয়ার জায়গায় নেওয়া এবং পরে পাট শুকিয়ে বাজারে নিয়ে যাওয়ার খরচ যোগ হয়।

সফর আলী বলেন, গত বছর তিনি চার কানি জমিতে পাট চাষ করেছিলেন। কিন্তু এবার তা কমিয়ে দুই কানিতে এনেছেন। শুধু তাই নয়, অতিবৃষ্টির কারণে তাঁর প্রায় পাঁচ বিঘা জমির পাট নষ্ট হয়ে গেছে।

পাট চাষিদের আরেকটি বড় সমস্যা হলো পাট জাগ দেওয়ার উপযুক্ত জায়গার সংকট। পাট কাটার পর আঁশ ছাড়ানোর জন্য পানিতে নির্দিষ্ট সময় পাট জাগ দিতে হয়। কিন্তু নদী, খাল, বিল ও পুকুরে পর্যাপ্ত পানি বা জায়গা না থাকায় অনেক কৃষককে বাড়তি খরচ করতে হচ্ছে।

কৃষকদের দাবি, জাগ দেওয়ার জন্য নির্দিষ্ট জলাশয় বা সরকারি ব্যবস্থাপনা থাকলে তাদের খরচ কমত। একই সঙ্গে পাটের মানও ভালো রাখা সম্ভব হতো।

চলতি মৌসুমে বৈরী আবহাওয়ার কারণেও অনেক কৃষক ক্ষতির মুখে পড়েছেন। অতিবৃষ্টি ও পানির সমস্যায় কোথাও পাট নষ্ট হয়েছে, আবার কোথাও পাট জাগ দেওয়ার সমস্যা তৈরি হয়েছে।

কৃষকদের মতে, পাট এমন একটি ফসল যার উৎপাদনের শেষ পর্যায় পর্যন্ত নানা ধরনের ঝুঁকি থাকে। অথচ বাজারে বিক্রির সময় কাঙ্ক্ষিত দাম না পেলে সেই ঝুঁকির পুরো চাপ কৃষকের ওপরই পড়ে।

বাঞ্ছারামপুর উপজেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, গত বছর উপজেলায় ১ হাজার ৩২০ হেক্টর জমিতে পাটের আবাদ হয়েছিল। চলতি মৌসুমে আবাদ হয়েছে ১ হাজার ২৭০ হেক্টর জমিতে।

অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে পাটের আবাদ কমেছে প্রায় ৫০ হেক্টর।

কৃষি বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, বাঞ্ছারামপুর ছাড়াও ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নাসিরনগর, সরাইল, নবীনগর ও বিজয়নগরসহ কয়েকটি উপজেলায় পাটের আবাদ হয়ে থাকে। সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে জেলার এসব এলাকার মোট ৪ হাজার ৫৭৫ হেক্টর জমিতে পাট আবাদ হওয়ার তথ্যও উঠে এসেছে।

কৃষকদের অভিযোগ, পাটের উৎপাদন খরচের সঙ্গে বাজারদরের সামঞ্জস্য না থাকায় তারা কাঙ্ক্ষিত লাভ পাচ্ছেন না। তাই পাটের মৌসুম শুরুর আগেই সরকারকে একটি ন্যূনতম মূল্য নির্ধারণের দাবি জানিয়েছেন তারা।

ব্রাহ্মণবাড়িয়ার পাটচাষিদের পক্ষ থেকেও আগাম পাটের মূল্য নির্ধারণের দাবি ওঠেছে। কৃষকদের মতে, উৎপাদন খরচ বিবেচনা করে ন্যায্য দাম নিশ্চিত করা গেলে তারা আবারও বেশি জমিতে পাট চাষে আগ্রহী হবেন।

পাট চাষে কৃষকদের উৎসাহিত করতে কৃষি বিভাগের পক্ষ থেকে প্রণোদনাও দেওয়া হচ্ছে। বাঞ্ছারামপুর উপজেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরের কৃষি প্রণোদনা কর্মসূচির আওতায় পাট, তিল ও আউশের বীজ বিতরণ করা হয়েছে।

তবে কৃষকদের বক্তব্য, শুধু বীজ ও সার দিয়ে পাট চাষে আগ্রহ ফেরানো সম্ভব নয়। উৎপাদন খরচ কমানো, জাগ দেওয়ার ব্যবস্থা করা এবং বাজারে ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করাও জরুরি।

বাংলাদেশের অর্থনীতি ও কৃষিতে পাটের ঐতিহাসিক গুরুত্ব থাকলেও স্থানীয় পর্যায়ে কৃষকের আগ্রহ কমে গেলে ভবিষ্যতে পাটের আবাদ আরও কমে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

কৃষকদের মতে, পাট চাষ করে যদি উৎপাদন খরচই উঠে না আসে, তাহলে একই জমিতে তুলনামূলক কম ঝুঁকির অন্য ফসল চাষ করাই তাদের জন্য লাভজনক। তাই পাটের আবাদ ধরে রাখতে হলে কৃষকের উৎপাদন খরচ, জাগ দেওয়ার সমস্যা এবং বাজারদর—তিনটি বিষয়কেই গুরুত্ব দিতে হবে।

কৃষক ছালে মুছা মিয়ার প্রশ্নটাই যেন পুরো পরিস্থিতির প্রতিচ্ছবি—‘জাইন্না-শুইন্না কে লস দিবে?’

জনপ্রিয় সংবাদ

‘জাইন্না-শুইন্না কে লস দিবে’—পাট চাষে অনাগ্রহী কৃষক

Update Time : ০৪:৩৭:২২ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬

‘পাট চাষ কইরা কি করুম? ১ মণ পাট বেইচ্চা ১ মণ চাইল কিনতে পারি না। জাইন্না-শুইন্না কে লস দিবে?’—কেন পাট চাষ করছেন না, এমন প্রশ্নের জবাবে কথাগুলো বলেন ব্রাহ্মণবাড়িয়ার বাঞ্ছারামপুর উপজেলার হোগলাকান্দি গ্রামের কৃষক ছালে মুছা মিয়া।

একসময় বাঞ্ছারামপুর উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়নের মাঠজুড়ে পাটের আবাদ দেখা গেলেও কয়েক বছর ধরে চিত্র বদলেছে। উৎপাদন খরচ বাড়ার সঙ্গে পাটের বাজারদর প্রত্যাশা অনুযায়ী না থাকায় অনেক কৃষক পাট চাষ থেকে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছেন। পাটের বদলে কেউ ধান, কেউ ভুট্টাসহ অন্যান্য ফসল চাষে ঝুঁকছেন।

উপজেলার ১৩টি ইউনিয়নের বিভিন্ন এলাকায় ঘুরে দেখা গেছে, বর্ষা মৌসুমে যেখানে আগে বিস্তীর্ণ জমিতে পাটের ক্ষেত দেখা যেত, সেখানে এবার অনেক জমিতে ধানের আবাদ হয়েছে। কৃষকদের অভিযোগ, পাট উৎপাদনের পর বিক্রির আগ পর্যন্ত যে খরচ হয়, তা দিন দিন বেড়েই চলেছে।

তেজখালি ইউনিয়নের বিষ্ণারামপুর গ্রামের কৃষক সফর আলী বলেন, এক বিঘা জমিতে পাট চাষ করতে প্রায় ১৬ থেকে ১৭ হাজার টাকা খরচ হয়। প্রতি বিঘায় ১০ থেকে ১২ মণ পর্যন্ত পাট পাওয়া যায়। ভালো দাম পাওয়া গেলে প্রতি মণ সর্বোচ্চ ৩ হাজার ৫০০ টাকা পর্যন্ত বিক্রি করা যায়।

আরও পড়ুন  বারহাট্টায় ১ হাজার ৯০০ কৃষকের মাঝে বিনা মূল্যে বীজ-সার বিতরণ

তার ভাষ্য, পাট চাষে জমি প্রস্তুত, বীজ, সার ও কীটনাশকের পাশাপাশি শ্রমিকের খরচও রয়েছে। এর সঙ্গে পাট কাটার পর ক্ষেত থেকে বহন করে জাগ দেওয়ার জায়গায় নেওয়া এবং পরে পাট শুকিয়ে বাজারে নিয়ে যাওয়ার খরচ যোগ হয়।

সফর আলী বলেন, গত বছর তিনি চার কানি জমিতে পাট চাষ করেছিলেন। কিন্তু এবার তা কমিয়ে দুই কানিতে এনেছেন। শুধু তাই নয়, অতিবৃষ্টির কারণে তাঁর প্রায় পাঁচ বিঘা জমির পাট নষ্ট হয়ে গেছে।

পাট চাষিদের আরেকটি বড় সমস্যা হলো পাট জাগ দেওয়ার উপযুক্ত জায়গার সংকট। পাট কাটার পর আঁশ ছাড়ানোর জন্য পানিতে নির্দিষ্ট সময় পাট জাগ দিতে হয়। কিন্তু নদী, খাল, বিল ও পুকুরে পর্যাপ্ত পানি বা জায়গা না থাকায় অনেক কৃষককে বাড়তি খরচ করতে হচ্ছে।

কৃষকদের দাবি, জাগ দেওয়ার জন্য নির্দিষ্ট জলাশয় বা সরকারি ব্যবস্থাপনা থাকলে তাদের খরচ কমত। একই সঙ্গে পাটের মানও ভালো রাখা সম্ভব হতো।

চলতি মৌসুমে বৈরী আবহাওয়ার কারণেও অনেক কৃষক ক্ষতির মুখে পড়েছেন। অতিবৃষ্টি ও পানির সমস্যায় কোথাও পাট নষ্ট হয়েছে, আবার কোথাও পাট জাগ দেওয়ার সমস্যা তৈরি হয়েছে।

আরও পড়ুন  জেলা এনএসআইয়ের তথ্যের ভিত্তিতে চন্দনাইশে বেশি দামে সার বিক্রি, ব্যবসায়ীকে জরিমানা!

কৃষকদের মতে, পাট এমন একটি ফসল যার উৎপাদনের শেষ পর্যায় পর্যন্ত নানা ধরনের ঝুঁকি থাকে। অথচ বাজারে বিক্রির সময় কাঙ্ক্ষিত দাম না পেলে সেই ঝুঁকির পুরো চাপ কৃষকের ওপরই পড়ে।

বাঞ্ছারামপুর উপজেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, গত বছর উপজেলায় ১ হাজার ৩২০ হেক্টর জমিতে পাটের আবাদ হয়েছিল। চলতি মৌসুমে আবাদ হয়েছে ১ হাজার ২৭০ হেক্টর জমিতে।

অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে পাটের আবাদ কমেছে প্রায় ৫০ হেক্টর।

কৃষি বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, বাঞ্ছারামপুর ছাড়াও ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নাসিরনগর, সরাইল, নবীনগর ও বিজয়নগরসহ কয়েকটি উপজেলায় পাটের আবাদ হয়ে থাকে। সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে জেলার এসব এলাকার মোট ৪ হাজার ৫৭৫ হেক্টর জমিতে পাট আবাদ হওয়ার তথ্যও উঠে এসেছে।

কৃষকদের অভিযোগ, পাটের উৎপাদন খরচের সঙ্গে বাজারদরের সামঞ্জস্য না থাকায় তারা কাঙ্ক্ষিত লাভ পাচ্ছেন না। তাই পাটের মৌসুম শুরুর আগেই সরকারকে একটি ন্যূনতম মূল্য নির্ধারণের দাবি জানিয়েছেন তারা।

ব্রাহ্মণবাড়িয়ার পাটচাষিদের পক্ষ থেকেও আগাম পাটের মূল্য নির্ধারণের দাবি ওঠেছে। কৃষকদের মতে, উৎপাদন খরচ বিবেচনা করে ন্যায্য দাম নিশ্চিত করা গেলে তারা আবারও বেশি জমিতে পাট চাষে আগ্রহী হবেন।

আরও পড়ুন  ভালো দামে জমে উঠেছে পশ্চিমাঞ্চলের পাটের বাজার, খুশি কৃষক

পাট চাষে কৃষকদের উৎসাহিত করতে কৃষি বিভাগের পক্ষ থেকে প্রণোদনাও দেওয়া হচ্ছে। বাঞ্ছারামপুর উপজেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরের কৃষি প্রণোদনা কর্মসূচির আওতায় পাট, তিল ও আউশের বীজ বিতরণ করা হয়েছে।

তবে কৃষকদের বক্তব্য, শুধু বীজ ও সার দিয়ে পাট চাষে আগ্রহ ফেরানো সম্ভব নয়। উৎপাদন খরচ কমানো, জাগ দেওয়ার ব্যবস্থা করা এবং বাজারে ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করাও জরুরি।

বাংলাদেশের অর্থনীতি ও কৃষিতে পাটের ঐতিহাসিক গুরুত্ব থাকলেও স্থানীয় পর্যায়ে কৃষকের আগ্রহ কমে গেলে ভবিষ্যতে পাটের আবাদ আরও কমে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

কৃষকদের মতে, পাট চাষ করে যদি উৎপাদন খরচই উঠে না আসে, তাহলে একই জমিতে তুলনামূলক কম ঝুঁকির অন্য ফসল চাষ করাই তাদের জন্য লাভজনক। তাই পাটের আবাদ ধরে রাখতে হলে কৃষকের উৎপাদন খরচ, জাগ দেওয়ার সমস্যা এবং বাজারদর—তিনটি বিষয়কেই গুরুত্ব দিতে হবে।

কৃষক ছালে মুছা মিয়ার প্রশ্নটাই যেন পুরো পরিস্থিতির প্রতিচ্ছবি—‘জাইন্না-শুইন্না কে লস দিবে?’