স্বাস্থ্যখাতে দুর্নীতি ও অবহেলার বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানের ঘোষণা দিয়েছেন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণমন্ত্রী সরদার সাখাওয়াত হোসেন। তিনি স্পষ্টভাবে বলেছেন, যেখানে অবহেলা ও দুর্নীতির প্রমাণ মিলবে, সেখানে শুধু বদলি বা ট্রান্সফার নয়, সরাসরি চাকরিচ্যুত করা হবে। সরকার স্বাস্থ্যসেবায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ করবে বলেও জানান তিনি।
শনিবার (৪ জুলাই) দুপুরে নরসিংদীর শিশু একাডেমি মিলনায়তে আয়োজিত নরসিংদী ডায়াবেটিক সমিতির ৩১তম বার্ষিক সাধারণ সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে এসব কথা বলেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী। অনুষ্ঠানে স্বাস্থ্যখাতের বর্তমান অবস্থা, ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা এবং দুর্নীতিবিরোধী নানা উদ্যোগের কথা তুলে ধরেন তিনি।
মন্ত্রী বলেন, স্বাস্থ্যসেবার সঙ্গে জড়িত কোনো ব্যক্তি যদি দায়িত্ব পালনে অবহেলা করেন কিংবা দুর্নীতির সঙ্গে জড়িত থাকেন, তাহলে তার বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। শুধুমাত্র অন্যত্র বদলি করে দায় এড়ানোর সংস্কৃতি থেকে সরকার বেরিয়ে আসতে চায়।
সরদার সাখাওয়াত হোসেন বলেন, “আমি ট্রান্সফারে বিশ্বাস করি না। যেখানে অবহেলা ও দুর্নীতি, সেখানেই চাকরিচ্যুত করা হবে। সবাইকে সততার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করতে হবে। দুর্নীতি ও ঘুষের কোনো সুযোগ থাকবে না।”
তিনি আরও বলেন, স্বাস্থ্যখাতে ঘুষ ও অনিয়ম বন্ধে সরকার জিরো টলারেন্স নীতি অনুসরণ করছে। জনগণের চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করতে প্রশাসনিক তদারকি আরও জোরদার করা হবে।
স্বাস্থ্যমন্ত্রী জানান, দেশের প্রতিটি মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ৫০ শয্যার আধুনিক ডায়ালাইসিস সেন্টার স্থাপনের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। এতে কিডনি রোগীদের উন্নত চিকিৎসা সহজলভ্য হবে এবং বড় শহরের ওপর চাপও কমবে।
তিনি বলেন, ইউনিয়ন পর্যায়ের কমিউনিটি ক্লিনিকগুলোকে আধুনিকায়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। সংস্কারের পাশাপাশি সেখানে নতুন চিকিৎসক, নার্স ও স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগ দেওয়া হবে, যাতে গ্রামের মানুষ নিজ এলাকায় মানসম্মত চিকিৎসাসেবা পান।
ফ্যামিলি প্ল্যানিং সেন্টারগুলোর সেবার মান বাড়ানোর বিষয়েও সরকারের পরিকল্পনার কথা তুলে ধরেন মন্ত্রী। তিনি বলেন, পরিবার পরিকল্পনা কার্যক্রমকে আরও কার্যকর ও আধুনিক করতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হবে।
সরকার চলতি বছরেই স্বাস্থ্যখাতে একটি বড় পরিবর্তনের সূচনা করতে চায় উল্লেখ করে তিনি বলেন, জনগণের চিকিৎসাসেবা সহজলভ্য করতে একের পর এক নতুন কর্মসূচি গ্রহণ করা হচ্ছে। স্বাস্থ্যসেবাকে আরও আধুনিক, স্বচ্ছ ও জনবান্ধব করার লক্ষ্যে কাজ চলছে।
মন্ত্রী বলেন, বর্তমান বাজেট শুধু অর্থ বরাদ্দের বাজেট নয়, এটি আদর্শ বাস্তবায়নের বাজেট। জনগণের অর্থের সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করে স্বাস্থ্যখাতে দৃশ্যমান উন্নয়ন ঘটানো হবে।
তিনি আরও বলেন, স্বাস্থ্যসেবা জনগণের মৌলিক অধিকার। তাই সরকারি হাসপাতাল ও স্বাস্থ্যকেন্দ্রগুলোতে চিকিৎসা নিতে এসে কোনো রোগী যেন হয়রানির শিকার না হন, সে বিষয়েও কঠোর নজরদারি থাকবে।
অনুষ্ঠানে নরসিংদী জেলা প্রশাসক ও নরসিংদী ডায়াবেটিক সমিতির সভাপতি ইসরাত জাহান কেয়ার সভাপতিত্ব করেন। সভার উদ্বোধন করেন নরসিংদী সদর আসনের সংসদ সদস্য খায়রুল কবির খোকন।
বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন নরসিংদী-৩ শিবপুর আসনের সংসদ সদস্য মঞ্জুর এলাহী, নরসিংদী-৫ রায়পুরা আসনের সংসদ সদস্য আশরাফ উদ্দিন বকুল, জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান তোফাজ্জল হোসেনসহ বিভিন্ন সরকারি কর্মকর্তা ও স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিরা।
এ ছাড়া অনুষ্ঠানে নরসিংদী ডায়াবেটিক সমিতির সদস্য, চিকিৎসক, স্বাস্থ্যকর্মী এবং বিভিন্ন সামাজিক সংগঠনের প্রতিনিধিরাও অংশ নেন। স্বাস্থ্যখাতের উন্নয়ন এবং ডায়াবেটিস চিকিৎসা সম্প্রসারণ নিয়ে মতবিনিময় অনুষ্ঠিত হয়।
স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, দুর্নীতির বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান এবং ইউনিয়ন পর্যায়ে স্বাস্থ্যসেবা সম্প্রসারণের উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে দেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থায় ইতিবাচক পরিবর্তন আসতে পারে। বিশেষ করে গ্রামীণ জনগোষ্ঠী উন্নত চিকিৎসাসেবা পাওয়ার সুযোগ বাড়বে।
বিশ্লেষকদের মতে, দুর্নীতির বিরুদ্ধে কঠোর প্রশাসনিক ব্যবস্থা, আধুনিক চিকিৎসা অবকাঠামো গড়ে তোলা এবং নতুন জনবল নিয়োগ—এই তিনটি উদ্যোগ সফলভাবে বাস্তবায়ন করা গেলে দেশের স্বাস্থ্যখাতে দীর্ঘদিনের নানা সমস্যা অনেকটাই কমে আসবে।
সরকারের ঘোষিত পরিকল্পনাগুলো বাস্তবায়িত হলে সরকারি হাসপাতালের সেবার মান উন্নত হবে, রোগীদের ভোগান্তি কমবে এবং স্বাস্থ্যখাত আরও স্বচ্ছ, জবাবদিহিমূলক ও কার্যকর হয়ে উঠবে বলে আশা করা হচ্ছে।





























