ইতালির প্রধানমন্ত্রী জর্জিয়া মেলোনি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর দেশটির ইতিহাসে একই সরকারের অধীনে সবচেয়ে দীর্ঘসময় ক্ষমতায় থাকার রেকর্ড গড়েছেন। তার নেতৃত্বাধীন সরকার শুক্রবার (৪ সেপ্টেম্বর) টানা ১ হাজার ৪১৩ দিন দায়িত্ব পালন করে সাবেক প্রধানমন্ত্রী সিলভিও বারলুসকোনির দ্বিতীয় সরকারের ১ হাজার ৪১২ দিনের রেকর্ড ছাড়িয়ে গেছে।
মেলোনির এই ঐতিহাসিক সাফল্যে তাকে শুভেচ্ছা জানিয়েছেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক বার্তায় তিনি মেলোনিকে নিজের ‘বন্ধু’ হিসেবে উল্লেখ করে তার নেতৃত্বের প্রতি ইতালির জনগণের আস্থার কথা তুলে ধরেন।
ভারতের প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, মোদী লিখেছেন, ইতালির যুদ্ধোত্তর ইতিহাসে সবচেয়ে দীর্ঘসময় ধারাবাহিকভাবে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালনের মাইলফলক অর্জন করায় তিনি মেলোনিকে অভিনন্দন জানাচ্ছেন।
মোদীর ভাষায়, এই অর্জন মেলোনির নেতৃত্বের প্রতি ইতালির জনগণের আস্থা ও বিশ্বাসের প্রতিফলন। একই সঙ্গে তিনি ভারত ও ইতালির মধ্যকার বিশেষ কৌশলগত অংশীদারত্ব আরও শক্তিশালী করার ক্ষেত্রে মেলোনির বন্ধুত্বপূর্ণ ভূমিকার প্রশংসা করেন।
মোদী আরও জানান, দুই দেশের জনগণের সমৃদ্ধ ভবিষ্যৎ গড়ে তুলতে তিনি মেলোনির সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সহযোগিতা অব্যাহত রাখার প্রত্যাশা করছেন। বার্তার শেষে মেলোনির আগামী দিনের সাফল্য কামনা করেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী।
জর্জিয়া মেলোনি ২০২২ সালের ২২ অক্টোবর ইতালির প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নেন। তিনি ইতালির প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী। তার নেতৃত্বাধীন সরকার শুক্রবার ১ হাজার ৪১৩ দিন পূর্ণ করে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী ইতালিতে একই সরকারের সবচেয়ে দীর্ঘ ধারাবাহিক মেয়াদের রেকর্ড তৈরি করেছে।
এর আগে এই রেকর্ড ছিল সিলভিও বারলুসকোনির দ্বিতীয় সরকারের দখলে। ২০০১ সালের ১১ জুন থেকে ২০০৫ সালের ২৩ এপ্রিল পর্যন্ত ওই সরকার ১ হাজার ৪১২ দিন দায়িত্বে ছিল। মেলোনির সরকার সেই রেকর্ড একদিনের ব্যবধানে ছাড়িয়ে যায়।
তবে এখানে একটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ—বারলুসকোনি বিভিন্ন মেয়াদ মিলিয়ে ইতালির প্রধানমন্ত্রীর পদে মোট যে সময় ছিলেন, সেটি আলাদা হিসাব। মেলোনি যে রেকর্ডটি ভেঙেছেন, সেটি হলো একটানা একই সরকারের সবচেয়ে দীর্ঘসময় ক্ষমতায় থাকা।
ইতালির রাজনীতিতে সরকার পরিবর্তনের ইতিহাস দীর্ঘদিন ধরেই আলোচিত। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর দেশটিতে একাধিকবার সরকার পরিবর্তন হয়েছে। ফলে একই সরকারের প্রায় চার বছর টানা ক্ষমতায় থাকা দেশটির রাজনৈতিক বাস্তবতায় একটি উল্লেখযোগ্য ঘটনা।
মেলোনির নেতৃত্বাধীন জোট ২০২২ সালের নির্বাচনের পর সরকার গঠন করে। এরপর বিভিন্ন রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জের মধ্যেও জোটটি ক্ষমতায় টিকে আছে। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলোর বিশ্লেষণে তার সরকারের স্থায়িত্বকে ইতালির ঐতিহ্যগত রাজনৈতিক অস্থিরতার বিপরীতে একটি ব্যতিক্রমী ঘটনা হিসেবে দেখা হচ্ছে।
রেকর্ড অর্জনের পর মেলোনি নিজেও রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার গুরুত্ব তুলে ধরেছেন। তিনি বলেছেন, স্থিতিশীলতা শুধু প্রদর্শনের মতো কোনো রেকর্ড নয়; বরং এটি একটি দেশের পরিকল্পনা করা, সিদ্ধান্ত নেওয়া এবং প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজনীয় শর্ত।
মোদীর শুভেচ্ছাবার্তায় শুধু মেলোনির রাজনৈতিক রেকর্ডের বিষয়টি ছিল না; ভারত-ইতালি সম্পর্কের কথাও বিশেষভাবে উঠে এসেছে।
ভারতের প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, মোদী বলেছেন, মেলোনির সঙ্গে বন্ধুত্ব ভারত ও ইতালির বিশেষ কৌশলগত অংশীদারত্ব শক্তিশালী করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। ভবিষ্যতেও দুই দেশের মধ্যে ঘনিষ্ঠ সহযোগিতা অব্যাহত রাখার প্রত্যাশা ব্যক্ত করেছেন তিনি।
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে মোদী ও মেলোনির মধ্যে একাধিক দ্বিপক্ষীয় ও বহুপক্ষীয় বৈঠক হয়েছে। দুই দেশের সম্পর্কের ক্ষেত্রে বাণিজ্য, প্রযুক্তি, প্রতিরক্ষা, জ্বালানি, শিক্ষা ও কৌশলগত সহযোগিতা গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হিসেবে সামনে এসেছে।
ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী ও জর্জিয়া মেলোনির ব্যক্তিগত বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক নিয়েও আন্তর্জাতিক অঙ্গনে আলোচনা রয়েছে। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সম্মেলন ও দ্বিপক্ষীয় বৈঠকে তাদের হাস্যোজ্জ্বল মুহূর্ত সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপকভাবে আলোচিত হয়েছে।
এর মধ্যে ‘মেলোডি’ নামের চকোলেট উপহারের ঘটনাটিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আলোচনায় আসে। মোদী ও মেলোনির নামের সঙ্গে মিল রেখে তৈরি হওয়া এই শব্দ নিয়ে অনলাইনে বিভিন্ন পোস্ট ও ভিডিও ছড়িয়ে পড়ে।
তবে দুই নেতার সম্পর্ককে শুধু ব্যক্তিগত বন্ধুত্বের জায়গা থেকে দেখার পাশাপাশি ভারত ও ইতালির ক্রমবর্ধমান কৌশলগত সম্পর্কের দিকটিও গুরুত্বপূর্ণ। মোদীর সর্বশেষ শুভেচ্ছাবার্তাতেও সেই দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক আরও শক্তিশালী করার বিষয়টি স্পষ্টভাবে উঠে এসেছে।
সব মিলিয়ে, জর্জিয়া মেলোনির ১ হাজার ৪১৩ দিনের রেকর্ড ইতালির রাজনৈতিক ইতিহাসে একটি নতুন অধ্যায় তৈরি করেছে। আর এই মাইলফলকে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর অভিনন্দন দুই দেশের রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক সম্পর্কের গুরুত্বও সামনে এনেছে।


























