নবীজি (সা.) তাঁর দাওয়াতি জীবনে মানুষকে কঠিন ও গভীর বিষয় সহজভাবে বোঝাতে প্রাণী, প্রকৃতি ও দৈনন্দিন জীবনের নানা উপমা ব্যবহার করেছেন। এসব উপমায় যেমন ধর্মীয় ও নৈতিক শিক্ষার দিকনির্দেশনা রয়েছে, তেমনি ফুটে উঠেছে প্রাণ ও প্রকৃতির সঙ্গে মানুষের নিবিড় সম্পর্ক। তাঁর ব্যবহৃত এমনই কিছু উপমায় মুমিনের চরিত্র, আল্লাহর ওপর ভরসা, সম্পদ ও দুনিয়ার প্রতি সতর্কতার শিক্ষা পাওয়া যায়।
নবীজি (সা.) বলেছেন, এমন কিছু মানুষ জান্নাতে যাবে, যাদের হৃদয় পাখির হৃদয়ের মতো। পাখি সামান্য শব্দেও সতর্ক হয়ে উড়ে যায়, যা মুমিনের অন্তরে আল্লাহর ভয় ও পাপ থেকে দূরে থাকার সতর্কতার প্রতীক। একই সঙ্গে পাখি সকালে আল্লাহর ওপর ভরসা করে খাবারের সন্ধানে বের হয়। এতে বোঝা যায়, আল্লাহর ওপর তাওয়াক্কুলের পাশাপাশি নিজের দায়িত্ব অনুযায়ী কর্মপ্রচেষ্টা ও জরুরি।
ভালো চরিত্রের গুরুত্ব বোঝাতে নবীজি (সা.) মধু ও সিরকার উপমা দিয়েছেন। তিনি জানিয়েছেন, মানুষের সবচেয়ে বেশি উপকার করে যে, সে আল্লাহর কাছে সবচেয়ে প্রিয়; আর মুমিনের অন্তরে আনন্দ পৌঁছে দেওয়াও গুরুত্বপূর্ণ আমল। এরপর তিনি সতর্ক করেছেন, খারাপ চরিত্র আমলকে নষ্ট করে দিতে পারে। যেমন সিরকা মধুর স্বাদ ও গুণ নষ্ট করে দেয়, তেমনি অসৎ চরিত্র মানুষের ভালো আমলের মর্যাদা ক্ষুণ্ন করতে পারে।
শাসকদের আচরণ বোঝাতেও নবীজি (সা.) প্রাণীর উপমা ব্যবহার করেছেন। এক হাদিসে এমন শাসকদের কথা এসেছে, যারা মিম্বরে দাঁড়িয়ে কথা বলবে এবং তাদের বক্তব্যের প্রতিবাদ করা যাবে না। তাদের পরিণতিকে বানরের দল হুড়মুড় করে আগুনে ঝাঁপিয়ে পড়ার সঙ্গে তুলনা করা হয়েছে। এতে অন্যায়, স্বৈরাচার ও জবাবদিহিহীন নেতৃত্বের ভয়াবহ পরিণতির বিষয়ে সতর্ক করা হয়েছে।
উম্মতের সম্ভাবনা বোঝাতে নবীজি (সা.) বৃষ্টির উপমা দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, তাঁর উম্মতের উদাহরণ বৃষ্টির মতো এর প্রথম ভাগ ভালো হবে নাকি শেষ ভাগ, তা নিশ্চিতভাবে বলা যায় না। এই উপমা থেকে বোঝা যায়, উম্মতের মধ্যে সবসময় ভালোত্ব ও কল্যাণের সম্ভাবনা রয়েছে। একইভাবে রোগমুক্ত ব্যক্তির অবস্থাকে আকাশ থেকে পড়া শিশিরের স্বচ্ছতার সঙ্গে তুলনা করা হয়েছে।
আলেমদের গুরুত্ব বোঝাতে আকাশের নক্ষত্ররাজির উপমা এসেছে হাদিসে। অন্ধকার রাতে নক্ষত্র দেখে যেমন পথিকরা স্থল ও সমুদ্রপথে দিকনির্দেশনা পেতেন, তেমনি আলেমরা মানুষকে সঠিক পথের সন্ধান দেন। নক্ষত্র অদৃশ্য হয়ে গেলে যেমন পথ হারানোর আশঙ্কা তৈরি হয়, তেমনি জ্ঞানী ও পথপ্রদর্শকদের অনুপস্থিতিতেও সমাজে বিভ্রান্তি দেখা দিতে পারে। এ উপমা জ্ঞান ও জ্ঞানীদের মর্যাদা স্পষ্ট করে।
সাহাবিদের উপমা দেওয়া হয়েছে খাবারের লবণের সঙ্গে। খাবারে লবণ যেমন স্বাদ ও ভারসাম্য বজায় রাখতে গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি সাহাবিরাও ইসলামের শিক্ষা ও সমাজব্যবস্থায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন। অন্যদিকে সম্পদ ও দুনিয়ার বিষয়কে বোঝাতে নবীজি (সা.) সবুজ-শ্যামল ও মিষ্টির উপমা দিয়েছেন। এতে সম্পদকে নিজে মন্দ না বলে লোভ ও অপব্যবহার থেকে সতর্ক থাকার শিক্ষা দেওয়া হয়েছে।
নারীদের চরিত্রের একটি বিশেষ দিক বোঝাতে সাদা ডানা বিশিষ্ট কাকের উপমাও হাদিসে এসেছে। একইভাবে মোনাফেকের স্বভাব বোঝাতে দুই পালের মধ্যে ঘুরে বেড়ানো দলছুট বকরির উপমা দেওয়া হয়েছে। অর্থাৎ কখনো এক দলের দিকে, আবার কখনো অন্য দলের দিকে ঝুঁকে পড়া দ্বিধাগ্রস্ত ও সুবিধাবাদী মানসিকতার প্রতীক। নবীজি (সা.)-এর এসব উপমা মানুষের কাছে জটিল নৈতিক ও ধর্মীয় বিষয়কে সহজ, জীবন্ত ও স্মরণীয় করে তুলেছে।



























