ঢাকা ০৬:২৯ অপরাহ্ন, শনিবার, ২৭ জুন ২০২৬, ১৩ আষাঢ় ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

বেলুচিস্তানে পৃথক সেনা অভিযানে নিহত ৮

মাস্তুংয়ে নিরাপত্তা অভিযান পরিচালনা করছে বাহিনী। ছবি: সংগৃহীত

পাকিস্তানের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলীয় প্রদেশ বেলুচিস্তানে নিরাপত্তা বাহিনীর দুটি পৃথক গোয়েন্দাভিত্তিক অভিযানে আটজন সশস্ত্র ব্যক্তি নিহত হয়েছে বলে জানিয়েছে দেশটির সেনাবাহিনী। পাকিস্তান সেনাবাহিনীর আন্তঃবাহিনী জনসংযোগ পরিদপ্তর (আইএসপিআর) জানায়, ২৫ ও ২৬ জুন পরিচালিত এই অভিযানে নিরাপত্তা বাহিনী খারান ও মাস্তুং জেলায় সন্ত্রাসী উপস্থিতির ভিত্তিতে অভিযান চালায়। অভিযানের সময় নিরাপত্তা বাহিনীর সঙ্গে গোলাগুলিতে আটজন নিহত হয়। ঘটনাস্থল থেকে অস্ত্র, গোলাবারুদ, হাতে তৈরি বিস্ফোরক (আইইডি) এবং মোটরসাইকেল উদ্ধার করা হয়েছে বলেও দাবি করা হয়েছে।

এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে আবারও আলোচনায় এসেছে বেলুচিস্তানের দীর্ঘদিনের নিরাপত্তা সংকট, বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলন এবং পাকিস্তানের সন্ত্রাসবিরোধী অভিযান। যদিও পাকিস্তান সরকার নিহতদের “সন্ত্রাসী” হিসেবে উল্লেখ করেছে, তবে স্বাধীনভাবে এই দাবির সত্যতা তাৎক্ষণিকভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি। এ ধরনের ঘটনার ক্ষেত্রে বিভিন্ন পক্ষের বক্তব্যে ভিন্নতা থাকতে পারে।

আইএসপিআরের প্রকাশিত বিবৃতিতে বলা হয়েছে, গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে নিরাপত্তা বাহিনী দুটি পৃথক স্থানে অভিযান পরিচালনা করে। প্রথম অভিযানটি চালানো হয় খারান জেলায়, যেখানে নিরাপত্তা বাহিনী সন্দেহভাজন সশস্ত্র গোষ্ঠীর সদস্যদের অবস্থান শনাক্ত করে। পরবর্তীতে সেখানে অভিযান পরিচালনা করলে উভয় পক্ষের মধ্যে গোলাগুলি হয় এবং কয়েকজন নিহত হয়।

দ্বিতীয় অভিযানটি মাস্তুং জেলায় পরিচালিত হয়। সেনাবাহিনীর ভাষ্যমতে, সেখানে অবস্থানরত সশস্ত্র ব্যক্তিরাও নিরাপত্তা বাহিনীর ওপর গুলি চালায়। পাল্টা জবাবে আটজন নিহত হয়।

আইএসপিআর জানায়, অভিযান শেষে এলাকায় তল্লাশি চালিয়ে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ অস্ত্র, গোলাবারুদ, আইইডি তৈরির সরঞ্জাম এবং মোটরসাইকেল উদ্ধার করা হয়েছে। এসব সামগ্রী ভবিষ্যতে হামলার উদ্দেশ্যে ব্যবহার করা হতে পারত বলে দাবি করা হয়েছে।

পাকিস্তানের নিরাপত্তা বাহিনী প্রায়ই গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে বেলুচিস্তানসহ বিভিন্ন অঞ্চলে অভিযান পরিচালনা করে। তাদের দাবি, এসব অভিযানের উদ্দেশ্য হলো সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর ঘাঁটি ধ্বংস করা এবং ভবিষ্যৎ হামলার পরিকল্পনা নস্যাৎ করা।

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে পাকিস্তানে সন্ত্রাসী হামলার সংখ্যা বৃদ্ধি পাওয়ার পর নিরাপত্তা বাহিনী আরও সক্রিয় হয়েছে। বিশেষ করে বেলুচিস্তান এবং খাইবার পাখতুনখোয়ায় নিয়মিত অভিযান চালানো হচ্ছে।

বেলুচিস্তান পাকিস্তানের সবচেয়ে বড় প্রদেশ হলেও জনসংখ্যার দিক থেকে তুলনামূলকভাবে কম। প্রাকৃতিক গ্যাস, তামা, সোনা ও অন্যান্য খনিজ সম্পদে সমৃদ্ধ এই অঞ্চল বহু বছর ধরেই নিরাপত্তা সংকটে রয়েছে।

এ অঞ্চলে বিভিন্ন বিচ্ছিন্নতাবাদী সংগঠন সক্রিয়। এসব সংগঠন দীর্ঘদিন ধরে অধিক স্বায়ত্তশাসন কিংবা স্বাধীনতার দাবি জানিয়ে আসছে। পাকিস্তান সরকার তাদের সশস্ত্র বিদ্রোহী বা সন্ত্রাসী হিসেবে বিবেচনা করে এবং নিয়মিত সামরিক অভিযান পরিচালনা করে।

একই সঙ্গে কিছু জঙ্গিগোষ্ঠীও বেলুচিস্তানে সক্রিয় রয়েছে, যারা নিরাপত্তা বাহিনী, সরকারি স্থাপনা এবং অবকাঠামোকে লক্ষ্য করে হামলা চালিয়ে থাকে।

খারান জেলা বেলুচিস্তানের পশ্চিম অংশে অবস্থিত এবং এটি ইরানের সীমান্তের কাছাকাছি। বিশাল মরুভূমি ও দুর্গম পাহাড়ি এলাকা হওয়ায় দীর্ঘদিন ধরেই এটি নিরাপত্তা বাহিনীর জন্য একটি চ্যালেঞ্জপূর্ণ এলাকা হিসেবে পরিচিত।

অনেক সময় নিরাপত্তা বাহিনীর দাবি অনুযায়ী, সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলো এসব দুর্গম এলাকায় আশ্রয় নেয় এবং সেখানে প্রশিক্ষণ বা পরিকল্পনা পরিচালনা করে।

এই কারণেই খারানে নিয়মিত গোয়েন্দাভিত্তিক অভিযান পরিচালিত হয়।

মাস্তুং জেলা বেলুচিস্তানের অন্যতম সংবেদনশীল এলাকা। অতীতে এখানে বহু আত্মঘাতী হামলা, বোমা বিস্ফোরণ এবং নিরাপত্তা বাহিনীর ওপর হামলার ঘটনা ঘটেছে।

প্রদেশের রাজধানী কোয়েটার সঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ সড়ক যোগাযোগ থাকার কারণে মাস্তুং কৌশলগতভাবেও গুরুত্বপূর্ণ।

নিরাপত্তা বাহিনীর দাবি, বিভিন্ন উগ্রপন্থী গোষ্ঠী এই এলাকাকে ব্যবহার করে চলাচল ও হামলার পরিকল্পনা করে থাকে।

আইএসপিআরের বিবৃতিতে বলা হয়েছে, নিহতদের কাছ থেকে উদ্ধার হয়েছে—

  • আধুনিক আগ্নেয়াস্ত্র
  • বিপুল পরিমাণ গোলাবারুদ
  • হাতে তৈরি বিস্ফোরক (IED)
  • বিস্ফোরক তৈরির সরঞ্জাম
  • মোটরসাইকেল

নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মতে, মোটরসাইকেল ব্যবহার করে দ্রুত স্থান পরিবর্তন এবং ছোট আকারের হামলা চালানো অনেক সশস্ত্র গোষ্ঠীর পরিচিত কৌশল।

সাম্প্রতিক সময়ে পাকিস্তান সেনাবাহিনী প্রচলিত বড় আকারের সামরিক অভিযানের পাশাপাশি গোয়েন্দাভিত্তিক ছোট ও লক্ষ্যভিত্তিক অভিযানকে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে।

এই ধরনের অভিযানের বৈশিষ্ট্য হলো—

  • নির্দিষ্ট তথ্যের ভিত্তিতে পরিচালনা
  • সীমিত সময়ে অভিযান সম্পন্ন করা
  • বেসামরিক ক্ষয়ক্ষতি কমানোর চেষ্টা
  • নির্দিষ্ট লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানা

নিরাপত্তা বাহিনীর দাবি, এতে সন্ত্রাসী নেটওয়ার্ক দ্রুত দুর্বল করা সম্ভব হয়।

গত কয়েক বছরে পাকিস্তানে নিরাপত্তা বাহিনীর ওপর হামলা বৃদ্ধি পেয়েছে। বিশেষ করে সীমান্তবর্তী এলাকাগুলোতে সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর কার্যক্রম নতুন করে মাথাচাড়া দিয়েছে।

বেলুচিস্তান ছাড়াও খাইবার পাখতুনখোয়া প্রদেশেও প্রায়ই সংঘর্ষ, বিস্ফোরণ এবং নিরাপত্তা অভিযান পরিচালিত হচ্ছে।

এ অবস্থায় পাকিস্তান সরকার সন্ত্রাসবিরোধী অভিযানে আরও জোর দিয়েছে।

বেলুচিস্তানের সংঘাতের পেছনে রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক এবং সামাজিক নানা কারণ রয়েছে।

বিভিন্ন বেলুচ জাতীয়তাবাদী সংগঠন অভিযোগ করে, প্রদেশের বিপুল প্রাকৃতিক সম্পদের সুফল স্থানীয় জনগণ পায় না। তারা আরও অভিযোগ করে যে উন্নয়ন প্রকল্পে স্থানীয়দের অংশগ্রহণ সীমিত।

অন্যদিকে পাকিস্তান সরকার বলছে, তারা উন্নয়ন, অবকাঠামো নির্মাণ এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টির মাধ্যমে বেলুচিস্তানের উন্নয়নে কাজ করছে।

বেলুচিস্তানের গওয়াদর বন্দরকে কেন্দ্র করে চীন-পাকিস্তান অর্থনৈতিক করিডোর (সিপিইসি) বাস্তবায়িত হচ্ছে।

এই প্রকল্পকে পাকিস্তান অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ মনে করে।

তবে বিভিন্ন সশস্ত্র গোষ্ঠী অতীতে সিপিইসি-সংশ্লিষ্ট স্থাপনা, নিরাপত্তা বাহিনী এবং বিদেশি নাগরিকদের ওপর হামলা চালিয়েছে।

ফলে বেলুচিস্তানে নিরাপত্তা আরও জোরদার করা হয়েছে।

আইএসপিআর জানিয়েছে, পাকিস্তানের নিরাপত্তা বাহিনী সন্ত্রাস নির্মূলে অভিযান অব্যাহত রাখবে।

বিবৃতিতে বলা হয়েছে, দেশের শান্তি ও স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে যেকোনো ধরনের সশস্ত্র হুমকি মোকাবিলায় বাহিনী প্রস্তুত রয়েছে।

সংঘাতপূর্ণ অঞ্চলের ঘটনায় তাৎক্ষণিকভাবে সব তথ্য স্বাধীনভাবে যাচাই করা কঠিন হয়ে পড়ে।

পাকিস্তান সেনাবাহিনী নিহতদের সন্ত্রাসী হিসেবে দাবি করলেও স্বাধীন পর্যবেক্ষক বা আন্তর্জাতিক সংস্থার মাধ্যমে এই পরিচয় তাৎক্ষণিকভাবে নিশ্চিত করা সম্ভব হয়নি।

সংবাদ প্রকাশের সময় বিভিন্ন সূত্রের তথ্য পরস্পর ভিন্ন হতে পারে।

বেলুচিস্তানে নিরাপত্তা অভিযান নিয়ে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠনগুলো অতীতে বিভিন্ন উদ্বেগ প্রকাশ করেছে।

তাদের মতে—

  • অভিযানে মানবাধিকার নিশ্চিত করা জরুরি।
  • বেসামরিক মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে।
  • আটক বা নিহত ব্যক্তিদের পরিচয় ও ঘটনার তদন্ত স্বচ্ছ হতে হবে।

অন্যদিকে পাকিস্তান সরকার বলে, সব অভিযান দেশের আইন অনুযায়ী পরিচালিত হয় এবং শুধুমাত্র সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোকেই লক্ষ্যবস্তু করা হয়।

বেলুচিস্তানের অস্থিতিশীলতা শুধু পাকিস্তানের জন্য নয়, পুরো অঞ্চলের নিরাপত্তার ওপরও প্রভাব ফেলে।

ইরান ও আফগানিস্তানের সীমান্তবর্তী অবস্থানের কারণে সীমান্ত নিরাপত্তা, চোরাচালান, অস্ত্র পাচার এবং জঙ্গি চলাচল নিয়ন্ত্রণ একটি বড় চ্যালেঞ্জ।

এ কারণে পাকিস্তান সীমান্ত নিরাপত্তাও জোরদার করেছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু সামরিক অভিযান দিয়ে দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতা অর্জন কঠিন।

প্রয়োজন—

  • রাজনৈতিক সংলাপ
  • অর্থনৈতিক উন্নয়ন
  • স্থানীয় জনগণের অংশগ্রহণ
  • শিক্ষা ও কর্মসংস্থান বৃদ্ধি
  • নিরাপত্তা ও মানবাধিকার রক্ষার মধ্যে ভারসাম্য

এসব বিষয় সমন্বিতভাবে বাস্তবায়ন করা গেলে দীর্ঘমেয়াদে সংঘাত কমানো সম্ভব হতে পারে।

বেলুচিস্তানের খারান ও মাস্তুং জেলায় পাকিস্তান নিরাপত্তা বাহিনীর সাম্প্রতিক অভিযানে আটজন নিহত হওয়ার ঘটনাকে দেশটির সেনাবাহিনী সন্ত্রাসবিরোধী অভিযানের সফলতা হিসেবে তুলে ধরেছে। আইএসপিআরের দাবি অনুযায়ী, নিহতদের কাছ থেকে অস্ত্র, গোলাবারুদ, আইইডি এবং অন্যান্য সরঞ্জাম উদ্ধার করা হয়েছে। তবে সংঘাতপূর্ণ অঞ্চলের এ ধরনের ঘটনায় স্বাধীনভাবে সব দাবি তাৎক্ষণিকভাবে যাচাই করা সবসময় সম্ভব হয় না।

বেলুচিস্তানের দীর্ঘস্থায়ী নিরাপত্তা সংকট, বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলন, সন্ত্রাসবিরোধী অভিযান এবং উন্নয়ন-সংক্রান্ত বিতর্ক এখনো পাকিস্তানের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ। তাই নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদারের পাশাপাশি রাজনৈতিক সংলাপ, অর্থনৈতিক অন্তর্ভুক্তি এবং মানবাধিকার নিশ্চিত করার মতো উদ্যোগও দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতার জন্য গুরুত্বপূর্ণ বলে বিশ্লেষকরা মনে করেন।

জনপ্রিয় সংবাদ

বেলুচিস্তানে পৃথক সেনা অভিযানে নিহত ৮

Update Time : ০৫:৩৮:০৫ অপরাহ্ন, শনিবার, ২৭ জুন ২০২৬

পাকিস্তানের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলীয় প্রদেশ বেলুচিস্তানে নিরাপত্তা বাহিনীর দুটি পৃথক গোয়েন্দাভিত্তিক অভিযানে আটজন সশস্ত্র ব্যক্তি নিহত হয়েছে বলে জানিয়েছে দেশটির সেনাবাহিনী। পাকিস্তান সেনাবাহিনীর আন্তঃবাহিনী জনসংযোগ পরিদপ্তর (আইএসপিআর) জানায়, ২৫ ও ২৬ জুন পরিচালিত এই অভিযানে নিরাপত্তা বাহিনী খারান ও মাস্তুং জেলায় সন্ত্রাসী উপস্থিতির ভিত্তিতে অভিযান চালায়। অভিযানের সময় নিরাপত্তা বাহিনীর সঙ্গে গোলাগুলিতে আটজন নিহত হয়। ঘটনাস্থল থেকে অস্ত্র, গোলাবারুদ, হাতে তৈরি বিস্ফোরক (আইইডি) এবং মোটরসাইকেল উদ্ধার করা হয়েছে বলেও দাবি করা হয়েছে।

এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে আবারও আলোচনায় এসেছে বেলুচিস্তানের দীর্ঘদিনের নিরাপত্তা সংকট, বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলন এবং পাকিস্তানের সন্ত্রাসবিরোধী অভিযান। যদিও পাকিস্তান সরকার নিহতদের “সন্ত্রাসী” হিসেবে উল্লেখ করেছে, তবে স্বাধীনভাবে এই দাবির সত্যতা তাৎক্ষণিকভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি। এ ধরনের ঘটনার ক্ষেত্রে বিভিন্ন পক্ষের বক্তব্যে ভিন্নতা থাকতে পারে।

আইএসপিআরের প্রকাশিত বিবৃতিতে বলা হয়েছে, গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে নিরাপত্তা বাহিনী দুটি পৃথক স্থানে অভিযান পরিচালনা করে। প্রথম অভিযানটি চালানো হয় খারান জেলায়, যেখানে নিরাপত্তা বাহিনী সন্দেহভাজন সশস্ত্র গোষ্ঠীর সদস্যদের অবস্থান শনাক্ত করে। পরবর্তীতে সেখানে অভিযান পরিচালনা করলে উভয় পক্ষের মধ্যে গোলাগুলি হয় এবং কয়েকজন নিহত হয়।

দ্বিতীয় অভিযানটি মাস্তুং জেলায় পরিচালিত হয়। সেনাবাহিনীর ভাষ্যমতে, সেখানে অবস্থানরত সশস্ত্র ব্যক্তিরাও নিরাপত্তা বাহিনীর ওপর গুলি চালায়। পাল্টা জবাবে আটজন নিহত হয়।

আইএসপিআর জানায়, অভিযান শেষে এলাকায় তল্লাশি চালিয়ে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ অস্ত্র, গোলাবারুদ, আইইডি তৈরির সরঞ্জাম এবং মোটরসাইকেল উদ্ধার করা হয়েছে। এসব সামগ্রী ভবিষ্যতে হামলার উদ্দেশ্যে ব্যবহার করা হতে পারত বলে দাবি করা হয়েছে।

পাকিস্তানের নিরাপত্তা বাহিনী প্রায়ই গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে বেলুচিস্তানসহ বিভিন্ন অঞ্চলে অভিযান পরিচালনা করে। তাদের দাবি, এসব অভিযানের উদ্দেশ্য হলো সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর ঘাঁটি ধ্বংস করা এবং ভবিষ্যৎ হামলার পরিকল্পনা নস্যাৎ করা।

আরও পড়ুন  ইরানি জাহাজ জব্দ করার প্রস্তুতিতে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনী

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে পাকিস্তানে সন্ত্রাসী হামলার সংখ্যা বৃদ্ধি পাওয়ার পর নিরাপত্তা বাহিনী আরও সক্রিয় হয়েছে। বিশেষ করে বেলুচিস্তান এবং খাইবার পাখতুনখোয়ায় নিয়মিত অভিযান চালানো হচ্ছে।

বেলুচিস্তান পাকিস্তানের সবচেয়ে বড় প্রদেশ হলেও জনসংখ্যার দিক থেকে তুলনামূলকভাবে কম। প্রাকৃতিক গ্যাস, তামা, সোনা ও অন্যান্য খনিজ সম্পদে সমৃদ্ধ এই অঞ্চল বহু বছর ধরেই নিরাপত্তা সংকটে রয়েছে।

এ অঞ্চলে বিভিন্ন বিচ্ছিন্নতাবাদী সংগঠন সক্রিয়। এসব সংগঠন দীর্ঘদিন ধরে অধিক স্বায়ত্তশাসন কিংবা স্বাধীনতার দাবি জানিয়ে আসছে। পাকিস্তান সরকার তাদের সশস্ত্র বিদ্রোহী বা সন্ত্রাসী হিসেবে বিবেচনা করে এবং নিয়মিত সামরিক অভিযান পরিচালনা করে।

একই সঙ্গে কিছু জঙ্গিগোষ্ঠীও বেলুচিস্তানে সক্রিয় রয়েছে, যারা নিরাপত্তা বাহিনী, সরকারি স্থাপনা এবং অবকাঠামোকে লক্ষ্য করে হামলা চালিয়ে থাকে।

খারান জেলা বেলুচিস্তানের পশ্চিম অংশে অবস্থিত এবং এটি ইরানের সীমান্তের কাছাকাছি। বিশাল মরুভূমি ও দুর্গম পাহাড়ি এলাকা হওয়ায় দীর্ঘদিন ধরেই এটি নিরাপত্তা বাহিনীর জন্য একটি চ্যালেঞ্জপূর্ণ এলাকা হিসেবে পরিচিত।

অনেক সময় নিরাপত্তা বাহিনীর দাবি অনুযায়ী, সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলো এসব দুর্গম এলাকায় আশ্রয় নেয় এবং সেখানে প্রশিক্ষণ বা পরিকল্পনা পরিচালনা করে।

এই কারণেই খারানে নিয়মিত গোয়েন্দাভিত্তিক অভিযান পরিচালিত হয়।

মাস্তুং জেলা বেলুচিস্তানের অন্যতম সংবেদনশীল এলাকা। অতীতে এখানে বহু আত্মঘাতী হামলা, বোমা বিস্ফোরণ এবং নিরাপত্তা বাহিনীর ওপর হামলার ঘটনা ঘটেছে।

প্রদেশের রাজধানী কোয়েটার সঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ সড়ক যোগাযোগ থাকার কারণে মাস্তুং কৌশলগতভাবেও গুরুত্বপূর্ণ।

নিরাপত্তা বাহিনীর দাবি, বিভিন্ন উগ্রপন্থী গোষ্ঠী এই এলাকাকে ব্যবহার করে চলাচল ও হামলার পরিকল্পনা করে থাকে।

আইএসপিআরের বিবৃতিতে বলা হয়েছে, নিহতদের কাছ থেকে উদ্ধার হয়েছে—

  • আধুনিক আগ্নেয়াস্ত্র
  • বিপুল পরিমাণ গোলাবারুদ
  • হাতে তৈরি বিস্ফোরক (IED)
  • বিস্ফোরক তৈরির সরঞ্জাম
  • মোটরসাইকেল

নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মতে, মোটরসাইকেল ব্যবহার করে দ্রুত স্থান পরিবর্তন এবং ছোট আকারের হামলা চালানো অনেক সশস্ত্র গোষ্ঠীর পরিচিত কৌশল।

আরও পড়ুন  ইন্দোনেশিয়ায় হেলিকপ্টার বিধ্বস্ত, ৮ আরোহীর মর্মান্তিক মৃত্যু

সাম্প্রতিক সময়ে পাকিস্তান সেনাবাহিনী প্রচলিত বড় আকারের সামরিক অভিযানের পাশাপাশি গোয়েন্দাভিত্তিক ছোট ও লক্ষ্যভিত্তিক অভিযানকে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে।

এই ধরনের অভিযানের বৈশিষ্ট্য হলো—

  • নির্দিষ্ট তথ্যের ভিত্তিতে পরিচালনা
  • সীমিত সময়ে অভিযান সম্পন্ন করা
  • বেসামরিক ক্ষয়ক্ষতি কমানোর চেষ্টা
  • নির্দিষ্ট লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানা

নিরাপত্তা বাহিনীর দাবি, এতে সন্ত্রাসী নেটওয়ার্ক দ্রুত দুর্বল করা সম্ভব হয়।

গত কয়েক বছরে পাকিস্তানে নিরাপত্তা বাহিনীর ওপর হামলা বৃদ্ধি পেয়েছে। বিশেষ করে সীমান্তবর্তী এলাকাগুলোতে সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর কার্যক্রম নতুন করে মাথাচাড়া দিয়েছে।

বেলুচিস্তান ছাড়াও খাইবার পাখতুনখোয়া প্রদেশেও প্রায়ই সংঘর্ষ, বিস্ফোরণ এবং নিরাপত্তা অভিযান পরিচালিত হচ্ছে।

এ অবস্থায় পাকিস্তান সরকার সন্ত্রাসবিরোধী অভিযানে আরও জোর দিয়েছে।

বেলুচিস্তানের সংঘাতের পেছনে রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক এবং সামাজিক নানা কারণ রয়েছে।

বিভিন্ন বেলুচ জাতীয়তাবাদী সংগঠন অভিযোগ করে, প্রদেশের বিপুল প্রাকৃতিক সম্পদের সুফল স্থানীয় জনগণ পায় না। তারা আরও অভিযোগ করে যে উন্নয়ন প্রকল্পে স্থানীয়দের অংশগ্রহণ সীমিত।

অন্যদিকে পাকিস্তান সরকার বলছে, তারা উন্নয়ন, অবকাঠামো নির্মাণ এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টির মাধ্যমে বেলুচিস্তানের উন্নয়নে কাজ করছে।

বেলুচিস্তানের গওয়াদর বন্দরকে কেন্দ্র করে চীন-পাকিস্তান অর্থনৈতিক করিডোর (সিপিইসি) বাস্তবায়িত হচ্ছে।

এই প্রকল্পকে পাকিস্তান অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ মনে করে।

তবে বিভিন্ন সশস্ত্র গোষ্ঠী অতীতে সিপিইসি-সংশ্লিষ্ট স্থাপনা, নিরাপত্তা বাহিনী এবং বিদেশি নাগরিকদের ওপর হামলা চালিয়েছে।

ফলে বেলুচিস্তানে নিরাপত্তা আরও জোরদার করা হয়েছে।

আইএসপিআর জানিয়েছে, পাকিস্তানের নিরাপত্তা বাহিনী সন্ত্রাস নির্মূলে অভিযান অব্যাহত রাখবে।

বিবৃতিতে বলা হয়েছে, দেশের শান্তি ও স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে যেকোনো ধরনের সশস্ত্র হুমকি মোকাবিলায় বাহিনী প্রস্তুত রয়েছে।

সংঘাতপূর্ণ অঞ্চলের ঘটনায় তাৎক্ষণিকভাবে সব তথ্য স্বাধীনভাবে যাচাই করা কঠিন হয়ে পড়ে।

পাকিস্তান সেনাবাহিনী নিহতদের সন্ত্রাসী হিসেবে দাবি করলেও স্বাধীন পর্যবেক্ষক বা আন্তর্জাতিক সংস্থার মাধ্যমে এই পরিচয় তাৎক্ষণিকভাবে নিশ্চিত করা সম্ভব হয়নি।

আরও পড়ুন  কবর থেকে বাবার লাশ সরাতে বাধ্য ফিলিস্তিনি পরিবার

সংবাদ প্রকাশের সময় বিভিন্ন সূত্রের তথ্য পরস্পর ভিন্ন হতে পারে।

বেলুচিস্তানে নিরাপত্তা অভিযান নিয়ে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠনগুলো অতীতে বিভিন্ন উদ্বেগ প্রকাশ করেছে।

তাদের মতে—

  • অভিযানে মানবাধিকার নিশ্চিত করা জরুরি।
  • বেসামরিক মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে।
  • আটক বা নিহত ব্যক্তিদের পরিচয় ও ঘটনার তদন্ত স্বচ্ছ হতে হবে।

অন্যদিকে পাকিস্তান সরকার বলে, সব অভিযান দেশের আইন অনুযায়ী পরিচালিত হয় এবং শুধুমাত্র সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোকেই লক্ষ্যবস্তু করা হয়।

বেলুচিস্তানের অস্থিতিশীলতা শুধু পাকিস্তানের জন্য নয়, পুরো অঞ্চলের নিরাপত্তার ওপরও প্রভাব ফেলে।

ইরান ও আফগানিস্তানের সীমান্তবর্তী অবস্থানের কারণে সীমান্ত নিরাপত্তা, চোরাচালান, অস্ত্র পাচার এবং জঙ্গি চলাচল নিয়ন্ত্রণ একটি বড় চ্যালেঞ্জ।

এ কারণে পাকিস্তান সীমান্ত নিরাপত্তাও জোরদার করেছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু সামরিক অভিযান দিয়ে দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতা অর্জন কঠিন।

প্রয়োজন—

  • রাজনৈতিক সংলাপ
  • অর্থনৈতিক উন্নয়ন
  • স্থানীয় জনগণের অংশগ্রহণ
  • শিক্ষা ও কর্মসংস্থান বৃদ্ধি
  • নিরাপত্তা ও মানবাধিকার রক্ষার মধ্যে ভারসাম্য

এসব বিষয় সমন্বিতভাবে বাস্তবায়ন করা গেলে দীর্ঘমেয়াদে সংঘাত কমানো সম্ভব হতে পারে।

বেলুচিস্তানের খারান ও মাস্তুং জেলায় পাকিস্তান নিরাপত্তা বাহিনীর সাম্প্রতিক অভিযানে আটজন নিহত হওয়ার ঘটনাকে দেশটির সেনাবাহিনী সন্ত্রাসবিরোধী অভিযানের সফলতা হিসেবে তুলে ধরেছে। আইএসপিআরের দাবি অনুযায়ী, নিহতদের কাছ থেকে অস্ত্র, গোলাবারুদ, আইইডি এবং অন্যান্য সরঞ্জাম উদ্ধার করা হয়েছে। তবে সংঘাতপূর্ণ অঞ্চলের এ ধরনের ঘটনায় স্বাধীনভাবে সব দাবি তাৎক্ষণিকভাবে যাচাই করা সবসময় সম্ভব হয় না।

বেলুচিস্তানের দীর্ঘস্থায়ী নিরাপত্তা সংকট, বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলন, সন্ত্রাসবিরোধী অভিযান এবং উন্নয়ন-সংক্রান্ত বিতর্ক এখনো পাকিস্তানের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ। তাই নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদারের পাশাপাশি রাজনৈতিক সংলাপ, অর্থনৈতিক অন্তর্ভুক্তি এবং মানবাধিকার নিশ্চিত করার মতো উদ্যোগও দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতার জন্য গুরুত্বপূর্ণ বলে বিশ্লেষকরা মনে করেন।